ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এই মাসের দশম দিনকে বলা হয় পবিত্র আশুরা। ৬১ হিজরির ১০ মহররম, শুক্রবার অপরাহ্নে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়।
Advertisement
ওই মর্মান্তিক ঘটনায় এজিদের শাসনামলে কুফার গভর্নর ওবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনীর হাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.) ও তার সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন।
কারবালার ঘটনার পর ইবনে জিয়াদের বাহিনীর সদস্য শিমর ইবনে জিলজুশান নিজ হাতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র দেহ থেকে শির মোবারক বিচ্ছিন্ন করেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর ইমাম পরিবারের নারী ও শিশুদের সঙ্গে শির মোবারক কুফায় ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়।
ইবনে জিয়াদ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারকসহ আহলে বাইতের সদস্যদের দামেস্কে এজিদের দরবারে পাঠান। এরপর আহলে বাইতের নারী ও শিশুদের মদিনা মুনাওয়ারায় পাঠানো হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, শির মোবারক দামেস্কে সংরক্ষিত থাকার পর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়।
Advertisement
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজির বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক ফিলিস্তিনের আসকালান অঞ্চল থেকে ৫৪৮ হিজরির ৮ জমাদিউস সানি উত্তোলন করে একটি সুরক্ষিত বাক্সে করে মিশরের কায়রোর উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হয়। দুই দিন পর তা মিশরে পৌঁছালে তৎকালীন শাসক আমির সাইফ তা গ্রহণ করেন।
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক কায়রোতে পৌঁছানোর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য মানুষ তা দেখার জন্য সমবেত হন। পরবর্তীতে ৫৪৮ হিজরির ১০ জমাদিউস সানিতে কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদের নিকটবর্তী স্থানে তা পুনরায় সমাহিত করা হয়। সেই স্থানকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে নির্মিত হয় বিখ্যাত সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ, যা আজ মিশরের জাতীয় মসজিদ ও মুসলমানদের কাছে অন্যতম সম্মানিত ধর্মীয় স্থাপনা।
আরেকটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, এজিদের নির্দেশে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক গোলাপজল দিয়ে ধৌত করা হয় এবং কাপড়ে আবৃত করা হয়। পরবর্তীতে আসকালান থেকে আগত একদল ব্যক্তি তা দাফনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ফিলিস্তিনের আসকালান অঞ্চলে দাফন করেন।
১০৯৬ থেকে ১২৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ক্রুসেডারদের মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসনের সময় আশঙ্কা তৈরি হয় যে, তারা আসকালানে অবস্থিত পবিত্র নিদর্শনটি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ফাতেমি শাসকেরা শির মোবারক মিশরে নিয়ে আসেন এবং কায়রোতে আল-আজহার মসজিদের পাশে পুনঃসমাহিত করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
Advertisement
আজ সেই স্থানই বিশ্বজুড়ে পরিচিত সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ নামে। কারবালার প্রান্তর থেকে কায়রো পর্যন্ত এই দীর্ঘ ইতিহাস মুসলিম ঐতিহ্য, আবেগ ও স্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তথ্য সূত্র: তাসাউফের শায়খ জাকিউদ্দিন ইবরাহীমের “رأس الإمام الحسين بمشهده بالقاهرة تحقيقا مؤكدا حاسما” এবং মিশরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ড. আলী জুমার “البيان القويم” গ্রন্থ।
এমআরএম