প্রবাস

যে কারণে সুইডেনে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসই ‘হিটওয়েভ’ হিসেবে ধরা হয়

নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, সুইডেন

Advertisement

পশ্চিম ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহের পর এবার সুইডেনেও বাড়ছে তাপমাত্রা। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সুইডিশ মেটিওরোলজিক্যাল অ্যান্ড হাইড্রোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এসএমএইচআই)।

তবে সুইডেনে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস টানা পাঁচ দিন থাকলেই সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হিটওয়েভ’ বা তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বুধবার (২৫ জুন) দেশটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মালিলা এলাকায় ২৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এসএমএইচআই-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে দক্ষিণ সুইডেনের অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ওপরে উঠতে পারে। কোথাও কোথাও ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোরও আশঙ্কা রয়েছে।

Advertisement

সুইডিশ মেটিওরোলজিক্যাল অ্যান্ড হাইড্রোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এসএমএইচআই)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, পরপর পাঁচ দিন দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি থাকলে সেটিকে হিটওয়েভ বলা হয়।

কারণ, সুইডেনের আবহাওয়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই শীতল থাকে এবং গ্রীষ্মেও দীর্ঘ সময় ধরে এমন তাপমাত্রা খুব একটা দেখা যায় না।

এর বিপরীতে, ভারতের মতো উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে সমতল অঞ্চলে সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পাহাড়ি এলাকায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা হলে হিটওয়েভ ঘোষণা করা হয়। যুক্তরাজ্যেও অঞ্চলভেদে তাপপ্রবাহের সতর্কতার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, তাপপ্রবাহের সংজ্ঞা নির্ভর করে স্থানীয় জলবায়ু ও মানুষের তাপমাত্রা সহনশীলতার ওপর।

কেন ২৫ ডিগ্রিতেই কষ্ট বাড়ে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইডেনের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে ঠান্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। তাই দেশটির অধিকাংশ বাড়ি, অফিস ও গণপরিবহন শীত ধরে রাখার উপযোগী করে নির্মিত। আবাসিক ভবনগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে কম।

Advertisement

ফলে কয়েকদিন ধরে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা থাকলেই ঘরের ভেতরে অস্বস্তি বাড়ে এবং হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হিট এক্সহস্টশনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা।

এসএমএইচআই-এর আবহাওয়াবিদ হেনরিক রেইমার বলেন, “সতর্কতার মূল কারণ শুধু গরম নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে গরম আবহাওয়া স্থায়ী হওয়া। তখন এটি শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।”

এদিকে এসএমএইচআই গোটাল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ভার্মল্যান্ডের কিছু অংশের জন্য ইয়েলো হিট ওয়ার্নিং জারি করেছে, যা আজ বৃহস্পতিবার থেকে আগামী রোববার পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এসব এলাকায় দিনের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে বা তারও বেশি থাকতে পারে। পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এ সময়টাতে বাসিন্দাদের পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে কম বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ক্যাটারিনা ভালস্ট্রোম।

তাপপ্রবাহে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কয়েকদিন বেশি গরম থাকলেই অতিরিক্ত মৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করে। এমনকি স্বল্পমাত্রার তাপপ্রবাহেও প্রত্যাশিত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি মৃত্যু ঘটতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহে এই হার ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝারি মাত্রার তাপপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে বলে এগুলো সম্মিলিতভাবে চরম তাপপ্রবাহের চেয়েও বেশি প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

এ কারণে সুইডেনের বিভিন্ন পৌরসভা এরই মধ্যে মৌসুমি তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় তাদের পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে। স্কোভদে শহরের প্রবীণ সেবাকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পানি, শীতলীকরণ সরঞ্জাম এবং কর্মীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সুইডেনে কীভাবে সতর্কতা দেওয়া হয়?

সুইডেনে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য হিট অ্যাডভাইজরি এবং হিট ওয়ার্নিং জারি করে সুইডিশ মেটিওরোলজিক্যাল অ্যান্ড হাইড্রোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (এসএমএইচআই)। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকলে স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের জন্য বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়। আর তাপপ্রবাহ বড় পরিসরে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে হলে সাধারণ জনগণের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়।

এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চল তুলনামূলকভাবে শীতল থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। সেখানে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

জলবায়ু গবেষকদের মতে, প্রতিটি তাপপ্রবাহ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে না হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এমন ঘটনা আরও ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

এসএমএইচআই-এর জলবায়ু গবেষক টরবেন কোয়েনিগক বলেন, ‘বরফ ও তুষার দ্রুত গলে যাওয়ায় উত্তর সুইডেনে উষ্ণতা আরও দ্রুত বাড়ছে। তুষার কমে গেলে সূর্যের তাপ বেশি শোষিত হয়, ফলে উষ্ণায়নের গতি আরও বেড়ে যায়।’

বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে সুইডেনের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সঙ্গে বাড়বে দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভারী বৃষ্টিপাত এবং বন্যার ঝুঁকিও।

২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিশ্বের অনেক দেশে স্বাভাবিক মনে হলেও সুইডেনের মতো শীতপ্রধান দেশে এটি শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।

এমআরএম