দেশজুড়ে

এক খামারের দুর্গন্ধে নাজেহাল পুরো গ্রামের মানুষ

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে একটি লেয়ার মুরগির খামারের দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। খামারে দিনের পর দিন মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে উৎকট দুর্গন্ধ। মাছির অত্যাচারে স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Advertisement

গ্রামবাসীর অভিযোগ, গত তিন মাস ধরে খামারটির কারণে পরিবেশ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। অভিযোগের পর প্রশাসনের তদন্তেও এর সত্যতা মিলেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরীপুর গ্রামে প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষের বসবাস। খামারটির মালিক স্বপন নামের এক ব্যক্তি। গত তিন মাস ধরে খামার থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। মাছির উপদ্রবে ঘরে খাবার রাখা কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান বাসিন্দারা।

গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, তরকারি রান্না করে রাখতে পারি না। খাবার পরিবেশন করলেই ভাতের প্লেট ও তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না। মাছির কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

Advertisement

তিনি জানান, খামারটিতে আগে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হতো। তখন দুর্গন্ধ থাকলেও বর্তমানের মতো মাছির উপদ্রব ছিল না। এখন ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়িতে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত প্রতিকার না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

কয়েক দিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া গৃহিণী লিপি খাতুন বলেন, শিশুর শরীর ও মুখে মাছি বসে থাকে। সবসময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে খাবার রাখলেই মাছি ভিড় করে। নবজাতককে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাছির অত্যাচারে গত ছয় মাস ধরে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। জামাইকে খেতে দিলে খাবারের ওপর মাছি বসে। ঘেন্না ও অস্বস্তির কারণে তিনিও এখন বাড়িতে আসেন না।

তিনি আরও বলেন, গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া ব্যাহত হচ্ছে। কখনো কখনো খাবারের সঙ্গে মাছি মুখে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

Advertisement

গ্রামবাসীরা জানান, প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খামারে সৃষ্ট মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। এতে জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুকেও ঠিকমতো খাবার খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় পরিবেশ দূষণের বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। খামারটির কার্যক্রম স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন গোদাগাড়ীর ইউএনও।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। ইতোমধ্যে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে খামার মালিক স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গ্রামবাসীর দাবি, দ্রুত খামারের বর্জ্য অপসারণ, মাছি ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এলাকায় রোগবালাই ছড়িয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

মনির হোসেন মাহিন/কেএইচকে/এএসএম