কথায় বলে, ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি।’ এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক এটা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কোরিয়ানরা মুখোমুখি হরো দক্ষিণ আফ্রিকার। যে দলটি এর আগে কখনোই বিশ্বকাপের নকআউটে খেলতে পারেনি। এবার নিয়ে তারা অংশই নিচ্ছে চতুর্থবার। অথচ, দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ সালের সেমিফাইনালিস্ট এবং এবার নিয়ে বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ ১২তম বার।
Advertisement
সেই দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ১-০ গোলে হেরে গেলো দক্ষিণ কোরিয়া। এই পরাজয়ের ফলে এবারের বিশ্বকাপ থেকেই বিদায়ের পথে এশিয়ান দেশটি। অথচ ধারে ও ভারে- দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ানরা। ফিফা র্যাংকিংয়ে কোরিয়ার অবস্থান ২৫তম আর দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান ৬০তম।
তবুও, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে কেন হেরে গেলো দক্ষিণ কোরিয়া? এর পেছনে মূলত রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ হং মিয়ুং বো’র একটি অতি চালাকি। দক্ষিণ কোরিয়ার ভাগ্য নিয়ে এক ধরনের ‘জুয়া’ খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই অতি চালাকি বা জুয়া খেলতে গিয়েই বড় ধরাটা খেলেন তিনি। রীতিমত ম্যাচ হেরে এখন গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের মুখোমুখি তারা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ ‘এ’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অধিনায়ক ও দলের সবচেয়ে বড় তারকা সন হিউং-মিনকে শুরুর একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে সেই সিদ্ধান্তই এখন সমালোচনার ঝড় তুলেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়।
Advertisement
বুধবারের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় দক্ষিণ কোরিয়া। এই জয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপের তলানি থেকে উঠে দ্বিতীয় স্থানে থেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়াকে এখন অপেক্ষা করতে হবে গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোর ফলাফলের জন্য। সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ ষোলোয় ওঠার আশা এখনও বেঁচে থাকলেও পরিস্থিতি আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
ম্যাচ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল দেশটির সেরা তারকা সন হিউং মিনের বেঞ্চে থাকা। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এটি ছিল প্রথমবার, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার এই তারকা ফরোয়ার্ড গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা পাননি। কোচ হংয়ের এই সিদ্ধান্ত অনেককেই বিস্মিত করেছিল। তবে ম্যাচ শেষে তা আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে এসে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েন দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ। স্থানীয় গণমাধ্যম ম্যাচের ফলকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং দলের পারফরম্যান্সকে ‘হতাশাজনক’ বলে আখ্যা দেয়। শুরুর একাদশে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘ব্যর্থতা’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে উঠে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস নকআউটে ব্রাজিলের খেলা পড়বে কার বিপক্ষে? ব্রাজিলের কাছে হেরে হতাশায় আগেই বাড়ি যাওয়ার কথা বলছেন স্কটিশ কোচসমালোচনার জবাবে হং স্বীকার করেন, ফলাফল জানার সুযোগ থাকলে হয়তো তিনি অন্য সিদ্ধান্ত নিতেন, ‘এই ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি এবং মাঠে আমরা কিভাবে খেলব, তা নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি,’ বলেন সাবেক এই অধিনায়ক।
Advertisement
‘অবশ্যই যদি আগে থেকে ফলাফল জানা থাকত, তাহলে হয়তো আমি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতাম। আমার একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যখন এমন খারাপ ফল আসে, তখন সবারই নিজস্ব মতামত থাকে। শেষ পর্যন্ত দায়টা কোচেরই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আর ফলাফলের দায়ও আমার।’
নিজের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কি না- এমন প্রশ্নে আরও স্পষ্ট জবাব দেন তিনি। ‘হয়তো আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সেটাই খারাপ ফলাফলের কারণ। এর বেশি কিছু নয়, এর কমও নয়,’ বলেন হং।
ম্যাচে সনকে শুরু থেকে না খেলানোর কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি। তার পরিকল্পনা ছিল, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা ক্লান্ত হয়ে পড়লে দ্বিতীয়ার্ধে সনকে নামিয়ে তার গতি ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো।
হং বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, প্রতিপক্ষের শক্তি কমে গেলে সন বেশি কার্যকর হবে। যখন রক্ষণভাগের মাঝখানে বেশি জায়গা তৈরি হবে, তখনই সে তার সেরাটা দিতে পারবে। তাই আমরা চেয়েছিলাম প্রতিপক্ষ কিছুটা দুর্বল হওয়ার পর তাকে মাঠে নামাতে।’
তবে অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয় ছিল, দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সনকে নামানো হয়। কারণ বিরতির পর তখন দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়রাও নতুন করে শক্তি ফিরে পেয়েছিল। ফলে কোচের পরিকল্পনা বাস্তবে খুব একটা কার্যকর হয়নি।
হং ম্যাচটিকে দক্ষিণ কোরিয়ার এবারের বিশ্বকাপে ‘সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তার অধীনে দলটি আক্রমণে ধার হারিয়েছে, মাঝমাঠে ছন্দ খুঁজে পায়নি এবং পুরো ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল ইতিহাসে হং মিয়ুং-বো একটি কিংবদন্তি নাম। ২০০২ বিশ্বকাপে দেশের হয়ে সেমিফাইনালে ওঠা দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। কিন্তু কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে তার অতীত খুব সুখকর নয়। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপেও তার অধীনে দক্ষিণ কোরিয়া একটি ম্যাচও জিততে পারেনি, যা ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে দেশটির সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবারও সেই দুঃস্বপ্ন যেন ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সন হিউং-মিনকে বেঞ্চে রেখে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্তটি সফল হলে হং হয়তো কৌশলী হিসেবে প্রশংসা পেতেন। কিন্তু ফল উল্টো হওয়ায় সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন দক্ষিণ কোরিয়ার ভাগ্য নির্ভর করছে অন্য ম্যাচের ফলাফলের ওপর। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এই হার এবং সনকে নিয়ে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের এই অধ্যায়ে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
আইএইচএস/