বিনোদন

তখন দেড় হাজার পেতাম, এক হাজার দিয়ে শুরু করেছি

খ্যাতিমান গীতিকার মিল্টন খন্দকার। সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও সমাদর পেয়েছেন তিনি। তার গান গেয়ে পরিচিতি ও খ্যাতি পেয়েছেন দেশের অনেক শিল্পী। আজ (২৫ জুন) বৃহস্পতিবার এই সংগীতব্যক্তিত্বের জন্মদিন। এ উপলক্ষে জাগো নিউজের সঙ্গে জীবনের ছোট ছোট অনেক ঘটনা ভাগাভাগি করেছেন মিল্টন খন্দকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান মিথুন।

Advertisement

জাগো নিউজ: জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?মিল্টন খন্দকার: ধন্যবাদ। ভালো-মন্দ মিলিয়েই আছি। দিন কেটে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ: জন্মদিন কীভাবে কাটাচ্ছেন?মিল্টন খন্দকার: শরীরটা বেশ কিছুদিন ভালো যাচ্ছে না। তাই জন্মদিন উপলক্ষে কোনো আয়োজন করিনি। ঘরোয়া পরিবেশে দিনটা কাটাবো। আমাকে যারা পছন্দর করেন, তাদের কাছে দোয়া চাই, যেন জীবনের বাকি দিনগুলো সুন্দরভাবে পার করতে পারি।

জাগো নিউজ: কত বছরে পা রাখলেন?মিল্টন খন্দকার: একাডেমিক সার্টিফিকেট অনুসারে ৫৯ বছরে। ভালোয় ভালোয় একটা জীবন পার করে দিলাম (হাসলেন)।

Advertisement

দেশবরেণ্য গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: আপনি একজন খ্যাতিমান গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক। কোন পরিচয়টা আপনাকে বেশি আনন্দ দেয়? মিল্টন খন্দকার: গীতিকার পরিচয় দিতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমি অবশ্যই গীতিকবি। অবশ্যই গীতিকবি।

জাগো নিউজ: আপনি কি গান লেখা দিয়েই শুরু করেছিলেন? নাকি গাইতেনও?মিল্টন খন্দকার: গান গাইবো বলেই তো এসেছিলাম। ঢাকা মিউজিক কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮৪ সালে, গান গাইবো বলে। মিউজিক কলেজে এসে প্রথম যে জিনিসটি অনুভব করলাম, যে আমার কণ্ঠস্বর গান করার উপযোগী নয়। কিন্তু গানকে তো প্রবলভাবে ভালোবাসি। চিন্তা করলাম, ঠিক আছে, গাইতে না পারি, গান লিখতে তো পারি। যখন গান লিখতে শুরু করলাম। তখন এর পেছনে, ওর পেছনে, ওর বাড়িতে, ওর বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে, ঘুরতে ঘুরতে স্যান্ডেল ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু গান হচ্ছিল না। শেষে চিন্তা করলাম, আরে আমি তো একটু একটু সুরও করতে পারি। হারমোনিয়াম যেহেতু বাজাতে জানি, দেখি তো নিজের গান নিজেই সুর করি। নিজের গান নিজে সুর করা শুরু করলাম। আমাদের একজন শিল্পী আছেন, হাসান চৌধুরী, তার সঙ্গে দেখা হলো। তাকে নিয়ে অ্যালবাম করলাম। অ্যালবামটা করার পর আমাকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। গীতিকার হিসেবে আমি ততদিনে সবার কাছে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে দিয়েছি। সেই শুরু...।

জাগো নিউজ: প্রথম যে গানটা লিখেছিলেন, সেটার গল্পটা মনে পড়ে? কীভাবে রেকর্ড করেছিলেন সেটা? মিল্টন খন্দকার: সেই গল্পটা একটু অন্যরকম। হাসানকে (হাসান চৌধুরী) তো বোঝাতে হয়েছিল যে, আমি গান লিখতে পারি, সুর করতে পারি। হাসান ভাই খুব একটা বিশ্বাস করছিলেন না।

Advertisement

জাগো নিউজ: এটা কত সালের ঘটনা? মিল্টন খন্দকার: ১৯৮৭-৮৮’র দিকের কথা। আমরা হাসান ভাইয়ের বাসায় বসতাম। আমি একটা গান বানালাম, হাসান ভাই বিশ্বাস করলেন না যে, এটা আমার বানানো। হাসান ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, কেমন লাগছে আপনার কাছে? হাসান ভাইয়ের ওয়াইফ বললেন সুন্দর তো, সুন্দর লাগছে! কিন্তু হাসান ভাই কিছু বলছেন না। কিছুক্ষণ পর বললেন, আরেকটা বানান তো…। আরেকটা বানাইলাম, ওখানে বসেই। সেটাও পছন্দ হলো হাসান ভাইয়ের। তখন তিনি বুঝলেন যে, আমিই বানিয়েছি গানটা। তিনি আর আমাকে ছাড়লেন না। বললেন, ‘শুরু করেন আপনি।’ ওই সময়েই প্রথম গান করেছিলাম ‘সেই তুমি সেই আমি /নেই তো আগের মতো /মাঝে কিছু কেটেছে বছর/ সুখ-দুঃখের কিছু প্রহর /দুজনের ভালোবাসা নিয়তির কাছে হয়ে গত।’

জাগো নিউজ: এখনো মুখস্ত গানটা!মিল্টন খন্দকার: জ্বি, এখনো মুখস্ত। জীবনের প্রথম গান! তো হাসান ভাই গাইলেনও অসাধারণ। হাসান ভাইয়ের কণ্ঠে যখন গানটা তুলে দিলাম, তিনি আমার চেয়ে আরও সুন্দর করে আমাকে গানটা শুনিয়ে দিলেন। এই যে গানের ভেতরে ঢুকলাম, এখনও চলছে, লিখছি।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খানের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: ওটা অ্যালবামের গান ছিলো?মিল্টন খন্দকার: হ্যাঁ, অ্যালবামের গান। ওটাই আমার জীবনের প্রথম অ্যালবাম। হাসান চৌধুরীর জীবনেরও প্রথম অ্যালবাম।

জাগো নিউজ: অ্যালবামটির নাম মনে আছে?মিল্টন খন্দকার: এটার নাম ছিল ‘সেই তুমি’। ‘বেতার জগৎ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়েছিল।

জাগো নিউজ: আপনি অ্যালবাম ও সিনেমার গান, এই দুই মাধ্যমেই শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করেছেন। কোন মাধ্যমে গান প্রকাশ আপনাকে বেশি আনন্দ দিতো? মিল্টন খন্দকার: আমার জন্ম গীতিকার হিসেবে, অ্যালবামের মধ্যদিয়ে। অ্যালবামের সুবিধাটা হচ্ছে কি, আমি আমার মনের কথাটা বলতে পারছি, মানে যা আমি বলতে চাই। আর সিনেমা চ্যালেঞ্জিং। অন্যের গল্পের সাথে আমাকে মেলাচ্ছি। অন্য নায়কের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে আমি আমার কলমে উপস্থাপন করছি তার ভাষায়, তার জবানিতে। দুটোই ইন্টারেস্টিং, দুটোই চ্যালেঞ্জিং। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, যিনি গান লিখতে পারেন, তাকে সবখানেই সব শাখাতেই সমান পারদর্শীতা দেখাতে হবে, বিশেষ করে একজন গীতিকবির। তো সেক্ষেত্রে আমি সফল বলব নিজেকে। তবে গান নিজে লিখছি যেটা, সেটাকে আমি আসলে বেশি গুরুত্ব দেই। আমি আমার মনের চাওয়া- পাওয়াকে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারি। চলচ্চিত্রে সেটা হয় না।

জাগো নিউজ: অনেকে বলেন একজন গীতিকারকে জনপ্রিয় বা বিপুল সংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে সিনেমার গান লেখার কোনো বিকল্প নেই। আপনার কী মত?মিল্টন খন্দকার: আমি তো ভাই সিনেমার গান দিয়ে গীতিকার হইনি, আমি ক্যাসেটের গান দিয়ে, অ্যালবামের গান দিয়ে গীতিকার হয়েছি। পরে নব্বই সনের দিকে সিনেমার গানে আসি। শুধু সিনেমার গান লিখলেই তো গীতিকার হওয়া যায় না। আমি তো ভাই সিনেমার গানও লিখেছি, আবার ক্যাসেটের, মানে অ্যালবামের গানও লিখেছি। আমি গান লেখা শুরু করেছি ৮৮ সালের দিকে। পরে নব্বই সনের দিকে চলচ্চিত্রে ডাক পড়ে। ডাক তখনই পেয়েছি, যখন সবাই জেনে গেছে যে, আমি গান লিখি। সবাই বুঝে গেছে যে, আমি গীতিকার, আমাকে দিয়ে লেখালে ‘হবে’। সেই সময় আমাকে সবাই ডেকেছে। সুতরাং বলবো, আমি আমার মতো করেই তৈরি হয়েছিলাম। আমি গীতিকার হিসেবে তৈরি হয়েই ছিলাম। এক এক জন এক এক রকম করে হয়। আমি এতে কোনো গরিমা দেখি না। কাউকে তুচ্ছ করার ব্যাপারও দেখি না। তবে চলচ্চিত্র তখন বিশাল একটি ব্যাপার ছিল। সারা বাংলাদেশে চলচ্চিত্র ছাড়া তো বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আর মানুষ সিনেমা দেখতে পছন্দ করে, গান শুনতে পছন্দ করে, প্রিয় নায়ক-নায়িকাকে তাদের সুখ-দুঃখকে দেখতে চায়, আমাদের গানের বাণীতে তো সেই গানগুলো জনপ্রিয় হয় বেশি তাড়াতাড়ি। সেই কারণে বিশাল একটা ভূমিকা রাখে এই চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রে গানের স্থায়িত্বও বেশি।

সুরকার ও সংগীত পরিচালক ফোয়াদ নাসের বাবুর সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: চলচ্চিত্রে গান লেখার সুযোগ পাওয়া একটা বড় ব্যাপার বলে অনেকে মনে করে। সেই সুযোগটা আপনার কাছে ঠিক কীভাবে এসেছিল?মিল্টন খন্দকার: সেসময় কেউ একজন আমাকে বলেছিল, মিল্টন তোমাকে আলম খান (সংগীত পরিচালক ও সুরকার) সাহেব খুঁজছেন। এরপর আমার আশপাশের সবাই বলছিল যে, আলম ভাই তোকে খুঁজছে। তুই কই থাকিস! আলম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ কর। যা হোক, আমি একদিন আলম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম।

জাগো নিউজ: এটা কত সালের কথা? মিল্টন খন্দকার: এটা ৯০ সালের ঘটনা। ৯০ সালের শুরুর দিকের। ৯০ সালে ওই যে যখন ‘রংচটা জিন্সের প্যান্ট পরা’ গানটি হিট (ডলি সায়ন্তনীর গাওয়া)। এই গান শোনার পর লোকে চিনতে পারল আমাকে। তখন চলচ্চিত্র থেকে ডাক আসলো। আমি বুঝতে পারলাম যে, আলম ভাই আসলে খুঁজেছেন, নায়ক-প্রযোজক-পরিচালক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার কারণে। সোহেল রানা নায়ক রুবেলের ভাই। তিনি আলম ভাইকে বলেছেন, এই ছেলেটি ভালো লিখছে। আপনি সন্ধান নেন। ওকে দিয়ে আমার ছবিতে গান লেখাবো। তো আলম ভাইও সঙ্গে সঙ্গে আমাকে খোঁজ করে নিয়েছেন। আমি আলম ভাইয়ের কাছে গিয়ে হাজির। দুজন মানুষের কাছেই আমি ঋনী। আমাকে যিনি সুযোগ দিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন মাসুদ পারভেজ। আর যিনি আমাকে ঘষে মেজে গীতিকার হিসেবে তৈরি করেছেন তিনি আলম খান।

জাগো নিউজ: আলম খানের কাছে যাওয়ার আগে তিনি কি আপনার গান শুনেছেন?মিল্টন খন্দকার: শুনেছিলেন, আমার লেখা, ওই যে ডলি সায়ন্তনীর অ্যালবামটা।

প্লেব্যাক সম্রাট খ্যাত প্রয়াত সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: কোন গানটা দিয়ে শুরু করেছিলেন সিনেমায় গান লেখা?মিল্টন খন্দকার: সিনেমার নাম ছিল ‘ঘেরাও’। সিনেমায় মেয়েকণ্ঠের যতগুলো গান ছিল, সব ডলি গেয়েছিল। এ সিনেমার সবগুলো গান আমি লিখেছি।

জাগো নিউজ: সিনেমার কথা যেহেতু এলো, আপনি তো অভিনয়ও করেছিলেন?মিল্টন খন্দকার: বেসিক্‌লি ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরে ভেতরে অভিনেতা হওয়ার খুব শখ। আমি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ছবি দেখতাম। রেডিওতে নাটক শুনতাম। তারপরে বাংলাদেশের ছবি তো দেখতামই। গ্রুপ থিয়েটারের সাথে জড়িত ছিলাম। আমার স্বপ্ন ছিল আমি বড় অভিনেতা হবো বাংলাদেশের। কিন্তু যত বয়স বাড়ছে, তত অনুভব করছি যে, যে দেশে গোলাম মোস্তফা, খলিলুল্লাহ খান, এটিএম শামসুজ্জামানরা অভিনয় করেন, সেই দেশে মিল্টন খন্দকারকে দিয়ে অভিনয় সম্ভব না। তাও আমি লেগে ছিলাম। পরে যখন গানের কাজ শুরু করলাম, একটা অ্যালবাম হিট হয়ে গেল, যখন বুঝে ফেললাম যে, গানটা আল্লাহ আমাকে একটা সুযোগ হিসেবে দিয়েছেন। আল্লাহর এই সুযোগ আমি অবহেলা করতে চাইলাম না। আমি এটাই আমার পাথেও মনে করে, শুকরানা আদায় করে গানেই থাকলাম। অভিনয়ে আর গেলাম না। তবে ছবির গান করতে গিয়ে কিছু কিছু পরিচালকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাদের কাছে আবদার করেছি। তারা আমার সেই আবদার রেখেছেন। মাঝখানে আমি কিছু ছবিতে অভিনয়ও করেছি।

জাগো নিউজ: সিনেমাগুলোর নাম মনে আছে? মিল্টন খন্দকার: এজে মিন্টু সাহেবের ‘বাপের টাকা’। সোহানুর রহমান সোহান সাহেবের একটা ছবিতে অভিনয় করেছি, তাও কি! ভিক্ষুক চরিত্রে! আবার শহীদুল ইসলাম খোকন সাহেবের ‘পালাবি কোথায়’ সিনেমায়। এ সিনেমার ফার্স্ট সিকোয়েন্সে আমি আছি। দৃশ্যটা ছিল যে, সুবর্ণা মুস্তাফাকে দেখতে আসছে পাত্রপক্ষ, আমি সেই পাত্র। এ রকম একটা সিকোয়েন্স ছিল আরকি। তারপর এক ছবিতে আমি আইজি হয়েছি। পুলিশের এ রকম নানান রকম চরিত্র করেছি, নেতা সেজেছি।

জাগো নিউজ: তাহলে গান লেখাকেই শুরু থেকেই পেশা হিসেবে নিতে পেরেছেন?মিল্টন খন্দকার: পেশা হিসেবে ঠিক নিইনি। আপনারা তো জানেন যে, আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটা ছোট চাকরি করি। এই চাকরিটা আমাকে বিরাট একটা সাপোর্ট দিয়েছে। আমার বেঁচে থাকার জন্য, মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্যে, সংসারব্যয় নির্বাহ করার জন্য চাকরিটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। পেশা হিসেবে পরবর্তীতে না চাইতেও গানের কাজ নেশার থেকেও বেশি পেশা হয়ে গেছে।

মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: বিটিভিতে চাকরি না করলে কি আপনি গান লিখেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন?মিল্টন খন্দকার: তাহলে আমি পূর্ণোদ্দমে গানেই থাকতাম। আমি এখনো তাই। আমার ওই কর্মের পাশাপাশি সময়টুকু আমি পেশাদার গীতিকবির মতোই গান লিখি।

জাগো নিউজ: অনেক গীতিকারদের থেকে শোনা যায় যে তারা উপযুক্ত সম্মানী ও মর্যাদা পান না। আপনার পর্যবেক্ষণ কী? মিল্টন খন্দকার: এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত। যারা বলেছেন তাদের সাথে একমত। এবং আমি নিজেই ভুক্তভোগী।

জাগো নিউজ: যেমন…মিল্টন খন্দকার: বাইরের কথা বাদ দিই, এগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা তো করে সরকার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করবে, তথ্য মন্ত্রণালয় করবে। রেডিওতে একজন নবীন গীতিকার যদি গান লেখেন, তাকে যে সম্মানী দেওয়া হয় তা খুবই কম। আমি মনে করি এটা কোনোদিন সম্মানী হতে পারে না। গীতিকারদের নিয়ে যে অবহেলা আমাদের দেশে হয়, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় বলে আমার মনে হয় না। আমরা গীতিকাররা খুবই অবহেলিত।

জাগো নিউজ: এটা তো বললেন রেডিও, টেলিভিশনের কথা। এগুলোর বাইরে যে কাজগুলো হয়, সেখানে?মিল্টন খন্দকার: আমাদের যে অডিও মার্কেট, এখানকার বাণিজ্যিক হিসেবটা খুব সোজা। মানে, যার গান চলবে, সেই গীতিকারের কদর বেশি, সে হয়তো অপেক্ষাকৃত একটু ভালো সম্মানী পায়। তাছাড়া সব ওভার-অল একই ঘটনা ঘুরে ফিরে।

জাগো নিউজ: সিনেমায়?মিল্টন খন্দকার: সিনেমার গান লেখার ক্ষেত্রে ওরা কম দিক আর বেশি দিক, দেবে। আমি পেয়েছি। সুতরাং আমি মিথ্যাচার করতে পারবো না।

মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: সেটা কি খুব সম্মানজনক? মিল্টন খন্দকার: আমার সময় আমি যখন শুরু করি, তখন গান প্রতি দেড় হাজার টাকা পেতাম। এক হাজার দিয়ে শুরু করেছিলাম। তবে আস্তে আস্তে পাঁচ হাজার-ছয় হাজার… এ রকম বাড়তে শুরু করলো। এখন তো আরও বেড়েছে। কিন্তু তাদের জন্য, যারা নিয়মিত লেখে, যাদের নাম আছে, যাদের ভ্যালু আছে, তাদের দিয়ে লেখানো হয়। তাদের একটু আলাদা করে। এখনকার গীতিকবিরা আমাদের সময়ের চাইতে বেশি টাকা পাচ্ছেন। দ্বিগুণ টাকা বলতে পারি… তার চেয়েও বেশি টাকা নিয়ে আসছে। এটা খুব একটা ভালো দিক, গুড সাইন আরকি।

জাগো নিউজ: বেতার এবং টেলিভিশনের যে নগণ্য সম্মানীর কথা বললেন, সরকারের কাছে বললেই তো এর সমাধান হয়ে যায়…মিল্টন খন্দকার: আমরা বলিনি এমন নয়। সম্মিলিতভাবেও চেষ্টা করেছি, সবকিছুই করেছি। তবে শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। হবে, করবো, অপেক্ষা করেন, আসেন বসি, এ রকম। আমরা সবই করেছি। কিন্তু ‘যে লাউ সেই কদু’ অবস্থা। গত কয়েকদিন আগে নতুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে একটা অনুষ্ঠানে ছিলাম। তিনি সুন্দরভাবে বললেন, দেশের সংস্কৃতিকে আবার পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নানান রকম প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। আশা করছি, আমি খুব আশাবাদী, খুবই আশাবাদী একজন মানুষ, আমাদের সম্ভবত ভালো সময় আসছে।

জাগো নিউজ: বেতার এবং টেলিভিশনের গীতিকার হওয়া একজন গীতিকারের জন্য স্বপ্নের ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়া সম্মানেরও ব্যাপার। বেতার-টেলিভিশনে আপনার যুক্ত হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।মিল্টন খন্দকার: আমি যখন গান শুরু করি, তখন রেডিওতেও লিখিনি, টেলিভিশনেও লিখিনি। আমি লিখেছি অডিওর জন্য। অডিও মার্কেটে আমাদের সময়ের গান পাটুয়াটুলি-কেন্দ্রিক ব্যাপার ছিল। তো ওখানে জনপ্রিয়, ওখানেই হিট, ওখানে দুটো পয়সার মুখ দেখছি। সেই কারণে রেডিও-টেলিভিশনের প্রতি আমাদের অতটা ঝোঁক ছিল না। আমার অন্তত ছিল না। একদিন এই অডিও কোম্পানির একটা কাজ করতে করতেই রেডিওর এক কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি অবসরে শখের বশে মিউজিক করেন। মিউজিক ভালোবাসতেন। তিনি সাউন্ড রেকর্ডিংয়ের কাজ ভালোবাসতেন। তিনি একদিন বললেন মিল্টন রেডিওতে কেন আপনি তালিকাভুক্ত হননাই?

জাগো নিউজ: এটি কত সালের দিকে?মিল্টন খন্দকার: এটা নয় সালের কথা, ২০০৮-৯। তখন আমি বললাম যে, রেডিও-টেলিভিশনে আসলে যাওয়া হয় নাই। অল্প বয়সী ছিলাম তো, বুদ্ধি-টুদ্ধি কম ছিল। পাকনা-পাকনা কথা বলতাম। বলতাম যে, রেডিও যে পেমেন্ট দেয় তাতে তো আমার যাওয়া-আসার খরচ হয় না। এজন্য আমার কোনো আগ্রহ নাই। ওই ভদ্রলোকের নাম ছিল, নুরুজ্জামান। আমি তাকে খুবই সম্মান করি এবং আমি আমৃত্যু তাকে মনে রাখবো। তখন তিনি নিজে দরখাস্ত লিখে আমার সিগনেচার নিয়ে রেডিওতে জমা দেন। তিনি আমাকে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারে একটা ভূমিকা রাখেন। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ, সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ। এইভাবে আমি রেডিওতে তালিকাভুক্ত হয়েছি। আর টেলিভিশনে আমি চাকরি করি, তখন অল্প বয়স। তখন আমার সিনিয়র অফিসার যারা ছিলেন, তারা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তারা নিজেরাই দেখেছেন যে আমার গান সমানে চলচ্চিত্রে বাজছে, অডিও বাজারে বাজছে। তো আমি দরখাস্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও আমাকে তালিকাভুক্ত করে নেন।

জাগো নিউজ: একই সঙ্গে সুরকার ও সংগীত পরিচালক? মিল্টন খন্দকার: না, আগে গীতিকার হয়েছি, পরে সংগীত পরিচালক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছি। সংগীত পরিচালক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছি ২০০৯-১০-এর পরেই।

জাগো নিউজ: সিনেমায় আপনার হিট কোন কোন গানের কথা মনে পড়ে? মিল্টন খন্দকার: করোনা হওয়ার পর অনেক কিছু মনে থাকে না … যেমন আমার চলচ্চিত্রের প্রথম যে হিট গানটা, ছবির নাম ছিলো ‘বাসনা’, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। এই ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা সুচন্দা।

প্রয়াত সংগীতশিল্পী মনি কিশোরের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: কত সালে?মিল্টন খন্দকার: এইটা নব্বই পরবর্তী ঘটনা। ওই সময়ে ‘বাসনা’ ছবির একটা চরিত্রের জন্য গান লিখতে আমাকে ডাকা হলো। সেটা হচ্ছে, এটিএম শামসুজ্জামান এবং চম্পা। তারা দুজন ভিক্ষা করে গান গেয়ে টাকা উপার্জন করবেন। সেই গানটি ছিল এমন, ‘একটা টাকা দিয়ে যান, আমি গরীব ইনসান।’ গানটি ব্যাপক হিট হয়েছিল। টেলিভিশনের ‘ছায়াছন্দ’ নামের একটা অনুষ্ঠানে গানটি বার বার প্রচারিত হওয়ায় গানটি ৬৮ হাজার গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই শুরু, তারপরে ‘রংচটা জিন্সের প্যান্ট পরা’ একটা ছবিতে ব্যবহার হলো। সেটিও হিট। তারপরে আমি ‘পাথরে ফুল ফোটাবো শুধু ভালোবাসা দিয়ে’, ‘তোমরা কাউকে বলো না /এই তো প্রথম একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে’, তারপরে ‘এত ছোট জনম নিয়া জগতে আসিয়া /মেটে না মেটে না স্বাদ ভালোবাসিয়া’, তারপরে ‘আমি যে তোমার কে, কাছে এসে নাও জেনে নাও’। এ রকম বহু গান।

জাগো নিউজ: আপনার একটা গান আছে, খুব জনপ্রিয়। গানটি আপনার মনে পড়েনি, ‘আকাশেতে লক্ষ্য তারা চাঁদ কিন্তু একটারে।’ মিল্টন খন্দকার: হ্যাঁ, হ্যাঁ। এটি তো সুপার-ডুপার হিট। এখনো মানুষ শুনছে।

জাগো নিউজ: এই গানটি ঘিরে একটা ঘটনা আছে। এই গানটির জন্য আপনি কোনো সম্মানি পাননি। কী ঘটেছিল মনে পড়ে? মিল্টন খন্দকার: হ্যাঁ, এই গানটি নিয়ে একটি দুঃখজনক ঘটনা আছে। কিন্তু সেই দুঃখটা আর মনে রাখিনি। কেন মনে রাখিনি! গান লেখার পেমেন্টের সিস্টেম হচ্ছে, শিল্পী যখন গান গায়, তখন গান শেষে গীতিকারকে পেমেন্ট দেওয়া হয়। তো আমি যখন পেমেন্টের কথা বললাম তারা বললেন যে, সরি আমরা আজ যে বাজেট নিয়ে আসছিলাম তা ফুরিয়ে গেছে। আপনি ভাই কষ্ট করে একটু অপেক্ষা করেন। পরবর্তী গানে পেমেন্টেটা নেন। আর নইলে যদি দরকার থাকে তাহলে আমাদের অফিসে চলে আসেন। আমি অফিসেও গিয়েছিলাম কয়েকবার। প্রথমত যিনি আমাকে বলেছিলেন, তাকে সিটে পাওয়া যায় না। তারপরে দেখা হলে বলে আচ্ছা আজকে তো পারছি না ভাই, একটু কষ্ট করে আরেকদিন আসেন। এই রকম ঘটনা। শেষ পর্যন্ত আজ অবধি সেই টাকাটা আমি পাইনি। ছবির নাম ছিল ‘কুলি’। সিনেমাটিও সুপার-ডুপার হিট হয়েছিল। গানটি, সুপার-ডুপার হিট। একটা দুঃখ ছিল, এত বিখ্যাত একটা গান, কিন্তু সম্মানীটা পেলাম না। তবে যখন গানটা বিখ্যাত হয়ে গেল, যখন সবাই শুনছে এই গানটা আমি লিখেছি। সবাই অবাক হয়ে যায়। এবং খুব খুশি হয়, সবাই যে খুশি হয় ওটাকেই আমি মনে করেছি আমার সম্মানী।

জাগো নিউজ: গানের চরিত্র নির্মাণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা অনেক গীতিকাররা পারেন না। আমি বলতে চাচ্ছিলাম ‘অঞ্জনা’ সিরিজের ‘অঞ্জনা’ চরিত্রটির কথা। যা আপনাকে এবং মনির খানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ‘অঞ্জনা’ চরিত্রটি সৃষ্টির গল্পটা শুনতে চাই। ‘অঞ্জনা’ কি আপনার কল্পনা নাকি বাস্তবে এ রকম কেউ ছিলেন? মিল্টন খন্দকার: না… না, মনিরের সঙ্গে যখন ১২টা-১৪টা গান বানাই, তখন তো একজন প্রযোজক দরকার হতো। প্রকাশনা সংস্থা দরকার হতো। সেই প্রতিষ্ঠানে গেলে পরে সেই প্রতিষ্ঠানকে গান শোনাতে হতো। শিল্পী যেহেতু নতুন, আমি সেই ভদ্রলোককে ডেকে নিয়ে আসলাম। তাকে গান শোনালাম। মনিরকে দিয়ে গান শোনালাম। সবগুলোই শুনলো বসে বসে।

প্রয়াত সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: কত সালের ঘটনা এটা?মিল্টন খন্দকার: এটা হচ্ছে ৯২-৯৩ সালের দিকে। গান শোনানোর পর ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ‘গান তো পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যতগুলো গান শুনলাম একই গান শুনলাম। একটাই গান শুনলাম।’ শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাহলে কী করণীয়? তিনি বললেন, ‘আমরা তো ব্যবসায়ী, আমাদের একই রকমের গান চলে না। আপনি একটু চেঞ্জ-টেঞ্জ করে নিয়ে আসেন।’

জাগো নিউজ: তারপর?মিল্টন খন্দকার: পরে তিনি আবার ডাকলেন। বললেন, ‘আপনি একদিন স্টেডিয়ামে আসেন, আমার দোকান আছে, এখন এই সময় কী কী গান চলছে আপনাকে শোনাই, সেই গানগুলো শুনলে পরে আপনার একটা ধারণা হবে, ওখান থেকে আপনি একটা গান করবেন।’ আমি স্টেডিয়ামে গেলাম। মনে আছে দোকানের নাম ‘বেতার জগৎ’। সেই বেতার জগতের মালিক ছিলেন কচি ভাই। কচি ভাই আমাকে কিছু গান শোনালেন, তার ভেতরে হঠাৎ একটা গান কানে লাগলো, কলকাতার একটা গান, অঞ্জন দত্ত হচ্ছেন সেই গানের গায়ক। সেই অঞ্জন দত্ত গান গাইলেন ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’, এই প্যাটার্নটা আমার পছন্দ হলো। আমি শুধু এটুকুই ধারণ করেছি। তিনি (অঞ্জন দত্ত) ‘রঞ্জনা’কে নিয়ে গান করেছেন। আমি চিন্তা করলাম, তাহলে আমি অঞ্জন দত্তকেই ‘অঞ্জনা’ বানিয়ে দেবো। যেই ভাবা সেই কাজ। আমি তখন ওই গান বনিয়ে ফেলালাম ‘অঞ্জনা, হয়তো এ গান তুমি শুনছো না, নাকি শুনছো’, একটা প্যাটার্ন পেলাম। এভাবে প্যাটার্ন নিয়ে আরও কিছু গান বানিয়ে ফেলালাম। এর মধ্যে হলো কি, আবার ফকির আলমগীর ভাই একদিন রাস্তার মধ্যে ধরে একটা মৃদু থ্রেট দিলেন। বললেন, ‘তুই এটা কি করলি!’ তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমিও খুব ভক্ত তার, সম্মান করতাম তাকে। তিনি আরও বললেন, ‘এ গান তুই করবি না। বাংলাদেশে শুধু সখিনা গান থাকবে। এই গান আর করবি না।’ শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনিরকে (মনির খান) ফোন দিয়ে বললাম, তুমি কই? মনির বলে, আমি এই তো স্টেডিয়ামে। আমি বললাম তুমি আসো, আমরা সেকেন্ড অ্যালবামের জন্যে আরেকটা ‘অঞ্জনা’ গান বানাবো। তারপর দেখি যে মানুষ সেই ‘অঞ্জনা’ গানকেও গ্রহণ করছে। এই যে শুরু হলো, এখনো পর্যন্ত মানে ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৫ কত জনের সঙ্গে মনির খানের অঞ্জনা গান হয়েছে, তার হিসেব নেই। এখনো হচ্ছে। মাঝখানে ‘অঞ্জনা’ অনেকে লিখেছে। কিন্তু বেশিরভাগ আমি লিখেছি। যদি ৫০টা হয়ে থাকে তাহলে ৩০টা আমি লিখেছি। আর ২০টা গান হয়তো মাঝে অন্যরা লিখেছে। এবং অন্যেরা যারা লিখেছেন, সবাই খুব খ্যাতিমান। প্রত্যেকে গান ভালো লিখেছেন।

গীতিকার মনিরুজ্জামান মনিরের সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: কিন্তু বাহিরের মানুষ তো জানে ‘অঞ্জনা’ হয় আপনার প্রেমিকা, না হয় মনির খানের প্রেমিকা! সেটা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো? মিল্টন খন্দকার: মনির আমাকে বলে তার সংগীতের পিতা। এ কারণে কিছু কিছু বিষয়ে তার সাথে আমি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেতে চাই না, প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না। কোনো রকমের দূরত্ব তৈরি করতে চাই, না বিভেদ তৈরি করতে চাই না। মানুষ যেটা জানে, আমি বলি সেটাই সত্যি। আমি আর মুখ দিয়ে বলতে চাই না।

জাগো নিউজ: ‘গীতিকাব্য চর্চা কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এটার লক্ষ্য কী? মিল্টন খন্দকার: আমার ‘শেখা’, বেসিক্যালি গান যেভাবে লিখতে হয়, পদ্ধতিগতভাবে, সেটা আমি জানতাম না। সেটা আমার রপ্ত ছিল না। তারপর মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান (প্রখ্যাত গীতিকার) একদিন আমাকে বললেন, মিল্টন তুমি যে গান লেখো, সুন্দর লেখো, কিন্তু সামান্য একটু ভুলের জন্যে তোমার গানটা গান হয়ে উঠছে না। পদ্ধতিগতভাবে তোমাকে শিখতে হবে। তো তিনি একদিন হাতে-কলমে আমাকে শিখিয়ে দিলেন। শিখিয়ে দিলেন মানে পদ্ধতিটা জানিয়ে দিলেন যে এইভাবে লিখতে হয়। যখন শিখলাম জানলাম যে এইভাবে করতে হয় তারপর থেকে এখন পর্যন্ত আমার গানের জন্য যদি কোনো কিছু দরকার হয়, আমি রফিক ভাইয়ের শরণাপন্ন হই। আমি এখনো শিখি প্রতিনিয়ত। যদি মাঝরাতে আমি কোনো কারণে বিপদে পড়ে যাই, আমি তাকে ফোন দিয়ে তার কাছ থেকে সেটা শিখি। ওই যে শেখার ব্যাপারে চিন্তা করলাম যে, আমার মতো লোকই যদি না শিখে গান করি, তাহলে তো আমি সুযোগ পেয়েও যখন শিখিনাই, তখন অন্যরাও অনেকে নাও শিখতে পারে। সে কারণে আমি একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করলাম, যেন সবাই আমার এখানে আসবে। যে যতটুকু জানে সে জানবে, যে জানে না আমি যতটুকু জানি আমি তাকে জানাবো। একটা ভাবের আদান-প্রদান হবে। তাতে একটা ভালো কিছু তৈরি হবে একটা প্লাটফর্ম তৈরি হবে। সেই সাথে ভবিষ্যতের গীতিকবি এখান থেকে বের হয়ে আসবে। খুব সফল হয়েছি, তা বলবো না, কিন্তু অসফল যে হইনি, এটা আমি জোর গলায় বলতে পারি।

জাগো নিউজ: গান লেখার ক্ষেত্রে আপনি কাকে অনুসরণ করেন? মিল্টন খন্দকার: মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, গাজী মাজহাররুল আনোয়ার, মনিরুজ্জামান মনির প্রমুখ গীতিকবিদের আমি অনুসরণ করি।

জাগো নিউজ: ভালো গীতিকার হতে হলে কোন কোন বিষয়ে নজর দিতে হয়?মিল্টন খন্দকার: আসলে হতে চাইলেই তো আরও হওয়া যায় না। আমি মনে করি যে গীতিকার যিনি হবেন, গীতিকবি যিনি হবেন, তার আল্লাহপ্রদত্ত একটা মগজ থাকতে হবে। সেই মগজটাকে সুশৃঙ্খলভাবে যদি কাগজে লিপিবদ্ধ করা যায়, আর যোগ্য সুরকার যদি সেটাকে সুর তৈরি করেন, তাহলে গান ভালো হতে বাধ্য। গীতিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হতে বাধ্য।

শিল্পী হাসান চৌধুরীর সঙ্গে মিল্টন খন্দকার

জাগো নিউজ: বর্তমানে আমাদের দেশে কোন কোন গীতিকারের গান আপনার ভালো লাগে?মিল্টন খন্দকার: অনেকের গান ভালো লাগে। যেমন, আমাদের সময়ের কবির বকুল, তিনি অসাধারণ লেখেন। তার পরবর্তীতে এসে আমরা পেয়েছি দেলোয়ার আরজুদা শরফ, তিনি ভালো লেখেন, প্রদীপ সাহা আছেন। রাজেশও ভালো লেখেন, মাঝেমধ্যে খুবই ভালো লেখেন। আর এখন নতুনদের মধ্যে জীবন ভালো লিখছে (রবিউল ইসলাম জীবন)। ফিল্মে বেশ কয়েকজন লিখছে। ওদের সাথে আমার ওরকম যোগাযোগ নেই। তবে ওদের নাম জানি। ওদের গান শুনি। ওদের গান আমার ভালোও লাগে। এবং শুনে খুব খুশি হই।

জাগো নিউজ: আপনার কন্যারা কে কী করছেন? মিল্টন খন্দকার: আমার বড় মেয়ে শ্রেষ্ঠা খন্দকার, ছোট মেয়ে জারা। ওরা ওদের মায়ের সাথে ফ্রান্সে থাকে। আজ আমার মেয়ে ফোন দিয়েছিল, কথা হলো। প্রায় আট বছর আগে ওরা চলে গেছে ওখানে। ওখানে স্টাবলিশ তারা। এই তো আছি আমরা, ভালো আছি।

জাগো নিউজ: আপনি কি চাকরি থেকে অবসরে গেলে ওখানে চলে যাবেন? মিল্টন খন্দকার: আমার আসলে শারীরিক কন্ডিশন ভালো না। আমার মেরুদন্ডের একটা সমস্যা আছে, তীব্র। তো সেই কারণে বলছি, বিদেশের জীবনেও তো কোনো না কোনো কিছু করে খেতে হবে। কিন্তু সেই ক্যাপাসিটিই আমার নাই। তবে ওখানে ওদের দেখতে যাবো। মাঝে মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ করে আসবো। কিন্তু আমি বাংলাদেশেই থাকবো। কারণ আমি গান লিখতে চাই। আমি গান যেদিন লিখতে পারবো না। তেমন অনেক ছেলেমেয়েরা যারা স্বপ্নবাজ, যারা গান লিখতে আগ্রহী, কিন্তু গান লেখার কলাকৌশল জানে না। আমি সেটা জানানোর চেষ্টা করবো। এই আমার ইচ্ছে।

জাগো নিউজ: তাহলে গানের কারণে আসলে আপনি পরবাসে যেতে চাচ্ছেন না?মিল্টন খন্দকার: আমার ইচ্ছে করে না। আমার দেশ আমার কাছে অনেক বড়।

জাগো নিউজ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।মিল্টন খন্দকার: আপানাকেও ধন্যবাদ।

এমএমএফ/আরএমডি