দেশজুড়ে

‘গ্রেনেড বাবু’র দখলে ১৫ কোটি টাকার সরকারি জমি

• দল বদলে হয়েছেন চেয়ারম্যান• দখলে ১৫ কোটি টাকার সরকারি জমি• বরাদ্দের টাকায় করেছেন বিভিন্ন স্থাপনা

Advertisement

সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকান-পাট, হোটেল ও অফিস ঘর। শুধু তাই নয়, সরকারি ২৫ শতাংশের একটি পুকুরও দখল করা হয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি পার্ক, কুবুতরের খামার ও হোটেলের রান্নাঘর। এসব করা হয়েছে হাট বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের ছয় লাখ টাকা দিয়ে। পুকুরের বাকি অংশে নির্মাণ করা হয়েছে নামমাত্র গাইড ওয়াল।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে তিনি সবার কাছে ‘গ্রেনেড বাবু’ নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে দলীয় প্রতীক নিয়ে চেয়ারমান নির্বাচিত হয়েছেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরও থামেনি তার অবৈধ কর্মকাণ্ড। বেদখল হওয়া সরকারি জমি উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরবতা পালন করায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রধান বাজারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ৬৭ দাগে মোট জমি রয়েছে দুই একর ৬৩ শতাংশ। এরমধ্যে সড়কের পাশে ১৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ পুকুর দখল করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। যার বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকারও বেশি। এ জমিগুলো পর্যায়েক্রমে রাতের আঁধারে দখলে নিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন ‘গ্রেনেড বাবু’।

Advertisement

‘সড়কের পাশে ১৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ পুকুর দখল করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। যার বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকারও বেশি। এ জমিগুলো পর্যায়েক্রমে রাতের আঁধারে দখলে নিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তিনি’

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার প্রধান সড়ক ঘেঁষে থানার পাশে কিশোরগঞ্জ গরুর হাট। এ হাটে ব্যক্তি মালিকাধীন জায়গা ছাড়াও সরকারি খাস জমি রয়েছে। এখানে গরুর হাট বাদেও আগে থেকেই রয়েছে ছোট দোকান-পাট, মাংস বিক্রির দোকান এবং নানান স্থাপনা। প্রধান রাস্তার পাশে অবৈধভাবে দখলে নেওয়া ১৫ শতাংশ সরকারি জায়গায় দুটি দোকান ও হোটেল দিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তিনি ভাড়া দিয়েছেন। এ থেকে তার মাসিক আয় ৫০-৬০ হাজার টাকা। গরুর হাটের ঠিক পূর্ব পাশে ২৫ শতাংশের সরকারি পুকুর দখল করে অর্ধেকের বেশি ভরাট করেছেন তিনি। ভরাট করা অংশে নির্মাণ করেছেন মিনি পার্ক, কবুতরের খামার ও তার নিজস্ব একটি অফিস (বৈঠক খানা)।

আরও পড়ুন ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বগুড়া সিটি ৭ বছর ধরে বন্ধ চোখের অস্ত্রোপচার, নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাট বাজার উন্নয়ন প্রকল্পে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ‘কিশোরগঞ্জ হাট-বাজার সংলগ্ন গরুহাটির পাশে পুকুর পাড়ে ও গরুর হাটির বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাটকরণ’ ও ‘কিশোরগঞ্জ হাট বাজার সংলগ্ন পুকুর পাড়ে দক্ষিণ পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ’ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘কিশোরগঞ্জ হাটবাজার সংলগ্ন গরুহাটিতে মাটি ভরাট ও গরুরহাটি সংলগ্ন পুকুর পাড়ে প্যালাসাইডিংয়ের পাশে মাটি ভরাট’ নামে তিনটি প্রকল্পে মোট পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে মিনি পার্ক, হোটেলের রান্নাঘর, অফিস ঘর ও কবুতর খামার করেছেন এই ইউপি চেয়ারম্যান।

স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি জমি দখলে নিয়ে এসব স্থাপনা করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কেউ বাধা দিতে এলে তার দলীয় লোকজন দিতেন হুমকি-ধমকি। ফলে এসব জমি এতদিন উদ্ধার করা যায়নি। অবৈধ দখলের কারণে সরকার প্রতি বছর কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

Advertisement

‘গরুর হাটের পাশে বাজার এলাকা ও আশপাশের পানি ড্রেনের মাধ্যমে ওই সরকারি পুকুরটিতে গিয়ে পড়তো। এতে জলাবদ্ধতা হতো না কখনো। পরে ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেনেড বাবু পুকুরটি দখলে নেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এখন বাজার ও হাটে জলাবদ্ধতা ব্যবসায়ীদের নিত্যদিনের সঙ্গী’

কিশোরগঞ্জ দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘গরুর হাটের পাশে বাজার এলাকা ও আশপাশের পানি ড্রেনের মাধ্যমে ওই সরকারি পুকুরটিতে গিয়ে পড়তো। এতে জলাবদ্ধতা হতো না কখনো। পরে ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেনেড বাবু ওই পুকুরটি দখলে নেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এখন বাজার ও হাটে জলাবদ্ধতা ব্যবসায়ীদের নিত্যদিনের সঙ্গী।’

আরও পড়ুন সময়ের আগেই বাজারে ‘নাক ফজলি’, ঠকছেন ক্রেতারা রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশই সমকামী

দীর্ঘদিন ধরেই কিশোরগঞ্জ বাজারে ব্যবসা করেন তানভিরুল ইসলাম। তিনি জানান, গ্রেনেড বাবুুর ‘বন্ধু হোটেল’ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আধুনিক সাজ সজ্জায় সজ্জিত। ভজনপ্রিয় মানুষেরা মানুষেরা দূর-দূরান্ত থেকে এ হোটেলে খেতে আসেন। হোটেলের পেছনে বসা ও বিশ্রামের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। শুনেছি হোটেলটি সরকারি জায়গায় করা।

সরকারি পুকুর ও জমি দখলের বিষয়টি স্বীকার করেন ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, সরকার চাইলে তিনি দখল করা জায়গা ছেড়ে দেবেন।।

‘গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি জমি ও পুকুর দখলের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে’

সরকারি প্রকল্পের টাকায় ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণের জবাবে তিনি বলেন, পুকুর পাড় ভেঙে পড়েছিল। প্রকল্পের ওই টাকা দিয়ে তিনি গাইড ওয়াল দিয়েছেন।

আরও পড়ুন তিস্তা সেচ ক্যানেল / ১৪০০ কোটি টাকার ‘অপরিকল্পিত’ প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম

জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, ‘গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি জমি ও পুকুর দখলের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে।’

সরকারি অর্থ ব্যয়ে পুকুর পাড়ে মাটি ভরাট, গাইডওয়াল নির্মাণের নামে পুকুর ও সরকারি জমিতে পার্ক নির্মাণ, কবুতরের খামার, হোটেলের রান্নাঘর ও বৈঠকখানা নির্মাণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হলে তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পেলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় যে ব্যবস্থা নিতে বলবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসআর/এমএস