আন্তর্জাতিক

হরমুজে আটকা জাহাজ বেরোতে পারছে না এখনই, বাধা কোটি কোটি ঝিনুক!

কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল করার পথে এখন নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামুদ্রিক শ্যাওলা ও ঝিনুক।

Advertisement

পারস্য উপসাগরে চার মাস ধরে শত শত তেলের ট্যাংকার নোঙর করে আছে। উষ্ণ সমুদ্রের পানির কারণে এসব জাহাজের তলায় বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবাল, ঝিনুক ও শামুক জমেছে। সামুদ্রিক পরিভাষায় একে ‘বায়োফাউলিং’ বলা হয়। এই জঞ্জাল পরিষ্কার না করা পর্যন্ত বিশাল আকৃতির তেলবাহী জাহাজগুলো চলতে পারবে না।

কঠিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান

ফ্লোরিডার পেশাদার জাহাজ পরিচ্ছন্নতাকর্মী ডেরেক হ্যাম বলেন, চার মাস অনেক লম্বা সময়। জাহাজের নিচে ক্ষতিকর জঞ্জাল জমার জন্য এটি যথেষ্ট। জাহাজগুলোকে চলাচলের উপযোগী করতে এখন বিশাল ডুবুরি দল নামাতে হচ্ছে। এদের বলা হয় ‘বটম ক্লিনার’ বা জাহাজের তলা পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ‘শান্তিচুক্তি’: অবশেষে খুলছে হরমুজ প্রণালি

একটি তেলবাহী সুপারট্যাংকার সাধারণত এক হাজার ফুটের বেশি লম্বা এবং ১৫০ ফুট চওড়া হয়। সেই হিসাবে প্রতিটি জাহাজের নিচে প্রায় দেড় লাখ বর্গফুট এলাকা পরিষ্কার করতে হবে। এর জন্য পাঁচ থেকে ছয়জন ডুবুরির একটি দলকে প্রতিটি জাহাজের পেছনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে।

Advertisement

বর্তমানে প্রায় ৬০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়ে আছে। ফলে পরিচ্ছন্নতার এই কাজ যেমন বিশাল, তেমনি সময়সাপেক্ষ।

রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ ও বাড়তি খরচ

জাহাজের তলা পরিষ্কারের কাজ সহজ মনে হলেও এতে অনেক ঝুঁকি রয়েছে। স্ক্র্যাপার এবং হাইড্রোলিক প্রেশার ক্লিনার দিয়ে কাজ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন জাহাজের বিশেষ রং বা কোটিং নষ্ট না হয়। কোটিং ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমা জটিলতা এবং পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে জাহাজের প্রপেলার বা পাখা পরিষ্কার করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

আরও পড়ুন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে: বাঘের গালিবাফ

হঠাৎ করে ডুবুরিদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই সেবার খরচও আকাশচুম্বী হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বিমকোর কর্মকর্তা অ্যারন সোরেনসেন জানান, বর্তমানে প্রতিটি জাহাজের তলা পরিষ্কার করতে পাঁচ অংকের ডলার (হাজার হাজার ডলার) গুনতে হচ্ছে।

পরিষ্কার করা কেন জরুরি

বিপুল খরচ হলেও জাহাজ পরিষ্কার করা ছাড়া উপায় নেই। জাহাজের নিচে শ্যাওলা ও ঝিনুক জমলে পানির নিচে এর গতি কমে যায়। এতে জাহাজের জ্বালানি খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের ম্যারিন প্রধান নিল রবার্টস জানান, একটি জাহাজের মোট খরচের প্রায় ৫০ শতাংশই যায় জ্বালানিতে।

Advertisement

আরও পড়ুন হরমুজে ইরান টোল বসাবে না, যুক্তরাষ্ট্র বসাতে পারে: ট্রাম্প

এছাড়া সামুদ্রিক ক্ষুদ্র জীবগুলো জাহাজের কুলিং সিস্টেমে ঢুকে তা বিকল করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো জাহাজে ক্ষতিকর ভিনদেশি জলজ জীব বা শ্যাওলা থাকলে তা বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয় না। তাই বিমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও জাহাজ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে কড়া শর্ত দেয়।

তেল সরবরাহ সচল হতে দেরি

হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ রাতারাতি স্বাভাবিক হবে না। জাহাজ পরিষ্কার করার পরও অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। ইরান এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে, প্রণালি পার হতে কোম্পানিগুলোকে তাদের দেশে নিবন্ধন করতে হবে। এছাড়া সাগরে বিছানো মাইন অপসারণের কাজও বাকি আছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তি নিয়ে প্রতিদিন নতুন মোড় আসায় বিমা কোম্পানিগুলোর সবুজ সংকেত পেতেও সময় লাগছে। ফলে সামুদ্রিক এই ক্ষুদ্র জীবের কারণে তেলের বাজার সচল হতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: সিএনএনকেএএ/