ধর্ম

খিজির (আ.) কে? তিনি কি বেঁচে আছেন?

খিজির (আ.) কে?

খিজির হলেন আল্লাহ তাআলার সেই নেককার বান্দা, যার কথা আল্লাহ তাআলা কোরআনের সুরা কাহাফে উল্লেখ করেছেন যে, হজরত মুসা (আ.) তার সঙ্গী হয়েছিলেন এবং তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেছিলেন। খিজির (আ.) মুসার (আ.) কাছে শর্ত দিয়েছিলেন মুসা (আ.) যদি তার সহচর্য চান, তাহলে তার কোনো কাজের ব্যাপারে আপত্তি না করে যেন ধৈর্য ধারণ করেন এবং মুসা (আ.) তাতে রাজি হয়েছিলেন। তারপর মুসা (আ.) খিজিরের (আ.) সাথে পথ চললেন। পথিমধ্যে এক নদী পার হওয়ার সময় মুসা (আ.) যখন দেখলেন, খিজির (আ.) নদী পারপারের নৌকাটি ফুটো করে দিয়েছেন, তখন মুসা (আ.) বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, আপনি কি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য এটি ফুটো করলেন? খিজির (আ.) বললেন, আমি বলেছিলাম আপনি আমার কাজকর্ম দেখে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না।

Advertisement

মুসা (আ.) তার কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত বিস্মিত হচ্ছিলেন, শেষ পর্যন্ত খিজির (আ.) যখন এই ঘটনাগুলোর পেছনের কারণসমূহ ব্যাখ্যা করেন, তখন আলোচনার শেষে বলেন, ‘আমি তো নিজের ইচ্ছায় এসব করিনি।’ অর্থাৎ, আমি এগুলো নিজের সিদ্ধান্তে কিছুই করিনি, বরং মহান আল্লাহর নির্দেশেই করেছি।

খিজির (আ.) কি এখনও বেঁচে আছেন?

কিছু মানুষ খিজির (আ.) সম্পর্কে বলে থাকেন, তিনি মুসার (আ.) পর ঈসার (আ.) যুগ, পরবর্তীতে মুহাম্মাদের (সা.) যুগ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, এখনো জীবিত আছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন। তাকে কেন্দ্র করে নানা গল্প ও রূপকথা তৈরি করা হয়েছে—যেমন তিনি অমুকের সাথে দেখা করেছেন, অমুককে বিশেষ খিরকা (তাসাউফের পোশাক) পরিয়েছেন, অমুককে বাইয়াত দিয়েছেন ইত্যাদি। এগুলো পুরোপুরি ভিত্তিহীন মনগড়া কাহিনি।

খিজির (আ.) জীবিত আছেন এই দাবির পক্ষেও কোনো প্রমাণ নেই। বরং এর বিপরীতে কোরআন, সুন্নাহ, যুক্তি এবং উম্মতের মুহাক্কিক (গবেষক) আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) রয়েছে যে, খিজির (আ.) বেঁচে নেই।

Advertisement

এ বিষয়ে আমি ইবনুল কাইয়্যেমের (রহ.) ‘আল-মানারুল মুনিফ ফিস সাহিহ ওয়াদ দয়িফ’ কিতাব থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি। তিনি এই কিতাবে যেসব জাল বা মওজু হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়, সেগুলো চেনার কিছু নীতিমালা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম নীতি হলো, যেসব হাদিসে খিজিরের নাম এবং তার জীবিত থাকার কথা উল্লেখ আছে, সেগুলোর সবই মিথ্যা এবং তার জীবিত থাকার পক্ষে একটি হাদিসও সহিহ নয়। যেমন একটি জাল হাদিসে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে ছিলেন, তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। সাহাবিরা গিয়ে দেখলেন যে তিনি খিজির। আরেকটি জাল হাদিসে বলা হয়েছে, খিজির ও ইলিয়াস (আ.) প্রতি বছর দেখা করেন। অন্য একটিতে বলা হয়েছে, আরাফাতের ময়দানে জিবরাইল, মিকাইল ও খিজির একত্রিত হন। এগুলো সবই ভিত্তিহীন।

ইমাম ইব্রাহিম আল-হারবীকে খিজিরের দীর্ঘায়ু ও বেঁচে থাকার ধারণা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের মধ্যে এই ধারণাটি শয়তান ছাড়া আর কেউ ছড়ায়নি।’

ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল খিজির ও ইলিয়াস (আ.) কি জীবিত? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এটি কীভাবে সম্ভব? অথচ নবী (সা.) বলেছেন, আজকের দিনে পৃথিবীর বুকে যারা বেঁচে আছে, একশ বছর পর তাদের একজনও আর জীবিত থাকবে না। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

ইমাম বুখারী ছাড়া অন্য অনেক ইমামদেরও যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তারা কোরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দিয়েছেন: ‘আপনার পূর্বেও আমি কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি অমর হয়ে থাকবে? (সুরা আম্বিয়া: ৩৪) 

Advertisement

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে (র.) এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি খিজির জীবিত থাকতেন, তবে তার ওপর ফরজ হতো নবীজির (সা.) দরবারে উপস্থিত হওয়া, তার কাছ থেকে দ্বীন শেখা, তার সঙ্গে জিহাদ করা। বদরের যুদ্ধের দিন নবী (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি যদি এই ছোট দলটিকে ধ্বংস করে দেন, তবে জমিনে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।’ অথচ বদরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৩১৩ জন সাহাবির নাম, তাদের বাবার নাম ও গোত্র পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানা ছিল। খিজির যদি জীবিতই থাকতেন, তবে তখন তিনি কোথায় ছিলেন?

সুতরাং কোরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, খিজিরের জীবিত থাকার ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

কোরআন মাজিদ বলছে, ‘আপনার পূর্বেও আমি কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি অমর হয়ে থাকবে?’ অতএব খিজির যদি মানুষ হয়ে থাকেন, তবে তিনি কখনোই অমর হতে পারেন না; কারণ কোরআন এবং সুন্নাহ তা অস্বীকার করে। তিনি যদি পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকতেন, তবে অবশ্যই নবীজির (সা.) কাছে আসতেন। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! মুসাও যদি আজ জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকত না।’ (মুসনাদে আহমদ) খিজির যদি নবীও হয়ে থাকেন, তবে তিনি মুসার (আ.) চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন; আর যদি ওলী হয়ে থাকেন, তবে তিনি আবু বকরের (রা.) চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন।

এ ছাড়া কিছু মানুষের ধারণা অনুযায়ী এত দীর্ঘ সময় ধরে জঙ্গল, মরুভূমি আর পাহাড়ে তার বেঁচে থাকার কী কারণ বা রহস্য থাকতে পারে? এর পেছনে কী ফায়দা আছে? এর পেছনে শরীয়তসম্মত বা যৌক্তিক কোনো উপকারিতাই নেই। আসলে মানুষ সবসময়ই অলৌকিক, অদ্ভুত বিষয় এবং কাল্পনিক কাহিনির প্রতি দুর্বল থাকে। তারা নিজেদের কল্পনা দিয়ে এগুলো সাজায় এবং পরে তার ওপর একটি ধর্মীয় প্রলেপ দেয়। কিছু সরলমনা মানুষের মধ্যে এই বিষয়গুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা এগুলোকে দ্বীনের অংশ মনে করে। অথচ দ্বীনের সাথে এর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।

খিজির (আ.) কি নবী ছিলেন নাকি ওলী?

এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সুরা কাহাফের যে আয়াতটি আমরা তিলাওয়াত করেছি, তা থেকে এটিই স্পষ্ট ও প্রমানিত হয় যে তিনি নবী ছিলেন। আয়াতটি হলো: ‘আর আমি তো নিজের ইচ্ছায় এসব করিনি।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে তিনি যা কিছু করেছেন, তা নিজের মন থেকে করেননি, বরং আল্লাহর নির্দেশ ও ওহি পেয়েই করেছেন। সুতরাং বিশুদ্ধতম মত হলো, তিনি কেবল একজন ওলী ছিলেন না, বরং তিনি একজন নবীও ছিলেন।

সূত্র: আল-কারযাভী ডট নেট

ওএফএফ