দেশজুড়ে

‘চোখ বুজলেই মনে অয়, এই বুঝি নদী আইয়া ঘরডা টান দিয়া লইয়া গেল’

ঘুম ভাঙতেই কভরা আতঙ্ক নিয়ে নদীর পাড়ে ছুটে যান আব্দুল কাদির। প্রতিদিনের মতো সেদিনও দেখতে গিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে কতটুকু মাটি গিলে খেয়েছে নরসুন্দা। ফিরে এসে দেখেন, বসতঘরের পেছনের আরও কয়েক ফুট জমি নেই। কয়েক দিনের ব্যবধানে নদী এসে দাঁড়িয়েছে তার ঘরের একেবারে পাশে। এখন তিনি জানেন না, আগামী বর্ষার বৃষ্টিতে টিকে থাকবে কি না তার শেষ আশ্রয়টুকু।

Advertisement

এ শুধু আব্দুল কাদিরের গল্প নয়। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের শত শত পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা এটি। ভয়াল নরসুন্দা নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছপালা ও গ্রামীণ অবকাঠামো। নদীর করাল গ্রাসে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে পরিবারগুলো। বছরের পর বছর ধরে ভাঙনের শিকার হলেও এখনো মেলেনি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা।

আব্দুর কাদির জাগো নিউজকে বলেন, ‘নদী ভাঙনের লাইগা আমরা খুবই আতঙ্কের মইধ্যে দিন কাটাইতাছি। রোজ রোজ নরসুন্দা একটু একটু কইরা আমাগো শেষ সম্বলডাও গিল্যা খাইতাছে। সকালে ঘুম থেইকা উঠলেই আগে গিয়া দেখি, রাইতে আবার কতকানি ভাঙছে। কহন যে ঘর-বাড়ি, গাছগাছালি আর এই স্মৃতিভরা ভিটামাডা নদীর পেটে যাইবগা, এই চিন্তায় রাইতে চোখডাতে ঘুমও আইয়ে না। চোখ দুইডা বুজলেই মনে অয়, এই বুঝি নদী আইয়া ঘরডা টান দিয়া লইয়া গেল। জীবনভর কষ্ট কইরা, সব জমাইয়া বানানো বাড়িডা চোখের সামনেই হারাইয়া যাইতে দেখনের চাইতে বড় কষ্ট আর কিছু নাই।’

আরও পড়ুন বিপৎসীমার ওপরে পানি / বন্যা-নদীভাঙন আতঙ্কে তিস্তাপাড়ের মানুষ

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীভাঙনের ফলে ইতোমধ্যে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে অন্তত অর্ধশত পরিবার। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ভাঙনের বিরুদ্ধে আজও গড়ে ওঠেনি কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

Advertisement

‘প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় ভয় লাগে, ফিরে এসে দেখব কিনা আমাদের বাড়িটা আর নেই। রাতে পড়তে বসলে নদীর পাড় ভাঙার শব্দ পাই। তখন আর পড়াশোনায় মন বসে না। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাদের পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যাবে’

তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর ভাঙনের সময় সাময়িক কিছু তৎপরতা দেখা গেলেও নদীশাসন বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।

শান্ত জনপদে নরসুন্দার থাবা

স্থানীয়দের ভাষ্য, দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের সওদাগরপাড়া থেকে রাজঘাট পর্যন্ত নরসুন্দা নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পরিবার বসবাস করে। কৃষি, মাছ ধরা ও ছোটখাটো ব্যবসাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এই জনপদ।কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নদীর ভাঙন তাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় আতঙ্ক। নদীর পাড় ভাঙে, জমি হারায়, ঘরবাড়ি সরে যায়—আর মানুষ অপেক্ষা করে পরবর্তী বিপর্যয়ের।

স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে গ্রামের উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বহু পরিবার পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আবার ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

Advertisement

আরও পড়ুন নেত্রকোনায় কংস নদীভাঙন, আতঙ্কে ২০ গ্রামের মানুষ

গৃহবধূ রহিমা বেগমের কণ্ঠেও একই হাহাকার। তিনি বলেন, এ বাড়িতেই আমাদের জন্ম, এ বাড়িতেই সুখ-দুঃখের সংসার গড়েছি। আজ সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে। প্রতিদিন মনে হয়, আজ না হয় কাল আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও নদীতে চলে যাবে। তখন এ সন্তানদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?

‘এ বাড়িতেই আমাদের জন্ম, এ বাড়িতেই সুখ-দুঃখের সংসার গড়েছি। আজ সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে। প্রতিদিন মনে হয়, আজ না হয় কাল আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও নদীতে চলে যাবে। তখন এ সন্তানদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?’

কৃষক নুরুল ইসলাম হারিয়েছেন তার কয়েক একর কৃষিজমি। সেই জমির ফসল বিক্রি করেই চলত সংসার, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও আসত সেখান থেকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার কয়েক একর কৃষিজমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন জমিও নেই, আয়ও নেই। নিজের জমি থাকতেও আজ অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতে হচ্ছে। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?

বর্ষায় বাড়ে ভাঙনের তীব্রতা

চলতি বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের কারণে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পাড় ধসে পড়ছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বরুহা গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও চোখের পলকে মাটির বিশাল অংশ ধসে পড়ছে নদীতে।

আরও পড়ুন করতোয়া নদীর বাঁধে ধস, দুর্ভোগে ১০ হাজার মানুষ

নদীর একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা ঘরবাড়িগুলো এখন চরম ঝুঁকিতে। কোনো কোনো বাড়ির উঠান, রান্নাঘর কিংবা গবাদিপশুর ঘর ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপায় না দেখে অনেক পরিবার তাদের ঘরের টিন, কাঠ, দরজা-জানালা খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ পুরো বাড়ি ভেঙে অন্যত্র স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার অনেকেই অর্থাভাবে ঘর সরাতে না পেরে প্রতিদিন মৃত্যুভয় আর সর্বস্ব হারানোর আতঙ্ক নিয়ে দিন পার করছেন।

বিপন্ন শিক্ষা ও অর্থনীতি

নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে স্থানীয় কৃষিখাতে। যে জমিতে একসময় ধান, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল উৎপাদন হতো, আজ সেখানে বইছে নদীর স্রোত। ফলে কৃষকরা জমি হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, নরসুন্দার এ করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও। ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে উঠছে তাদের ভবিষ্যৎ।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিয়া আক্তার জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় ভয় লাগে, ফিরে এসে দেখব কিনা আমাদের বাড়িটা আর নেই। রাতে পড়তে বসলে নদীর পাড় ভাঙার শব্দ পাই। তখন আর পড়াশোনায় মন বসে না। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাদের পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন একপাশে ভারত সীমান্ত আরেক পাশে নদীভাঙন, মাঝখানে অসহায় গ্রামবাসী

একই গ্রামের কলেজপড়ুয়া রাশেদুল ইসলামের কণ্ঠে ক্ষোভ ও হতাশা। তিনি বলেন, যে বয়সে আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে প্রতিদিন নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমাদের অনেক সহপাঠীর ঘরবাড়ি নদীতে চলে যাওয়ায় তারা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা কোনো ত্রাণ চাই না, আমরা শুধু এ ভাঙন থেকে মুক্তি চাই।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নদীভাঙনের প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি বা জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারসহ অন্যত্র চলে যাচ্ছে, ফলে তাদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও পুরো এলাকাটি ক্ষতির মুখে পড়েছে।’

জনপ্রতিনিধিদের অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ

নদীভাঙন রোধে দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ ও হতাশা দানা বাঁধছে। এ বিষয়ে তাড়াইল উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়া আসাদ জাগো নিউজকে বলেন, নরসুন্দা নদীর এ অংশে প্রায় ১৫ বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর আগে নদীর অপর পাড়ে তৎকালীন এমপির উদ্যোগে প্রায় ৫ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে ব্লক ফেলা হয়েছিল, ফলে সেখানে ভাঙন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু বরুহা এলাকার এ অংশটি দিগদাইড় ও দামিহা ইউনিয়নের আওতাভুক্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন ৫ বছর ধরে জিওব্যাগের ওপর বসবাস, ঝড়-বৃষ্টিতে ভরসা অন্যের বাড়ি

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এমন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

যা বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে। নির্দেশনা পাওয়ার পর দ্রুত ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এসকে রাসেল/কেএইচকে/জেআইএম