২০২৬ বিশ্বকাপে নিয়মিত নজর রাখছেন লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। এই টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অব্যাহত আধিপত্য দেখে মুগ্ধ এই জার্মান কোচ। বয়সের ভার সত্ত্বেও দুই কিংবদন্তি যেভাবে বিশ্বকাপকে প্রভাবিত করে চলেছেন, তা ক্লপকে বিস্মিত করেছে।
Advertisement
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচিত দুই নাম মেসি ও রোনালদো। বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা আবারও নিজেদের ‘সর্বকালের সেরা’ মর্যাদার প্রমাণ দিচ্ছেন। বিশেষ করে রোনালদোর সমালোচনার জবাব দেওয়ার ধরন ক্লপকে মুগ্ধ করেছে।
টুর্নামেন্টের শুরুটা ভালো হয়নি পর্তুগিজ মহাতারকার। প্রথম ম্যাচে কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে তার নিষ্প্রভ পারফরম্যানের পর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে দুর্দান্তভাবে সমালোচকদের জবাব দেন রোনালদো। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়ে যান তিনি।
স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্লপ বলেন, ‘একজন সাধারণ দর্শক হিসেবেই বিষয়টি আমাকে আকৃষ্ট করে, কারণ গত ১০-১৫ বছরের সেরা খেলোয়াড় তারা। কিন্তু যেটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তা হলো- প্রথম ম্যাচের পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে যেভাবে সমালোচনা করা হয়েছিল, সেটা আমিও লক্ষ্য করেছি। এরপর তার এমন প্রত্যাবর্তন, ৪১ বছর বয়সে এত প্রাণবন্ত ও তীব্র পারফরম্যান্স- এটা দেখে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।’
Advertisement
তিনি আরও বলেন, ‘এ বয়সেও কোনো কিছু পরিকল্পনামতো না হলে সেটা তাকে এতটা নাড়া দেয়- এটাই অসাধারণ। আর তার প্রতিক্রিয়াটা আরও বেশি প্রশংসার দাবি রাখে।’
মেসির প্রশংসায়ও পঞ্চমুখ ছিলেন ক্লপ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যেভাবে খেলেছেন, তা তাকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে মেসির খেলার কার্যকরী ধরন ক্লপের নজর কেড়েছে।
জার্মান এই কোচ বলেন, ‘আমি লিওনেল মেসিকে সরাসরি খেলতে দেখেছি। খেলার সময় যখন দেখা যায় যে তিনি আট কিলোমিটার দৌড়েছেন, তখন মনে হয়- আমরা যেন দৌড়ের সেই আদর্শ দূরত্বটিই খুঁজে পেয়েছি। ওই আট কিলোমিটার দূরত্বই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ফলে ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্তে তিনি ঠিকঠাক জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারেন। তবে অবশ্যই, সবার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। একবার ভাবুন তো, যদি সবাই কেবল আট কিলোমিটারই দৌড়াত!’
ক্লপের মতে, অনেকের চোখে মেসিকে হাঁটতে দেখা গেলেও বাস্তবে তিনি তখন মাঠকে বিশ্লেষণ করেন। ক্লপ আরও বলেন, ‘তাকে দেখাটা সত্যিই অসাধারণ, প্রায় অবিশ্বাস্য। অনেকে বলবে, সে হাঁটছে। আমি বলব, সে পুরো মাঠ স্ক্যান করছে। বল অন্য কোথাও থাকলেও আমি বারবার তার দিকে তাকিয়েছি। দেখতে চেয়েছি সে কী করছে। আমার মনে হয়, সে দূরত্ব মাপছে। সে জানে কখন কোথায় থাকতে হবে- এখন আমি এখানে, এরপর ডান দিকে যাব, তারপর মাঝখানে অবস্থান নেব।’
Advertisement
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের উদাহরণ টেনে ক্লপ বলেন, ‘অনেকক্ষণ ম্যাচটা যেন তার ছিল না। কিন্তু এরপর সেই মুহূর্তগুলো এলো। প্রথম গোলটা সে করেছে কারণ সে গোল করতে পারে। দ্বিতীয় গোলটা করেছে কারণ সে চেয়েছে। এরপর একটি পেনাল্টিও মিস করেছে। না হলে দুই ম্যাচেই তার গোলসংখ্যা হতো ছয়। তখন মনে হতো, একটি বিশ্বকাপ জেতা যেন খুব সাধারণ ব্যাপার।’
এরপর সুইডিশ কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের একটি মন্তব্যও তুলে ধরেন ক্লপ। তিনি বলেন, ‘জ্লাতান বলেছিল, মেসির এক বিশ্বকাপে পাঁচ গোল আছে, আর তার নিজের দুই বিশ্বকাপ মিলিয়েও শূন্য। ব্যাপারটা এতটাই সহজ।’
এই প্রজন্মের ফুটবল উপভোগ করতে পারছেন বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন ক্লপ। একই সঙ্গে তিনি মাঠের পাশে ঘটা একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন। নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার সত্ত্বেও, সেই মুহূর্তটি এই জার্মান কোচের কাছে সত্যিই বিশেষ কিছু ছিল।
‘আমরা যে এই প্রজন্মকে দেখতে পারছি, সেটাই অসাধারণ। এটা বিশেষ কিছু। সাইডলাইনে যখন আমার সাথে মেসির দেখা হলো এবং সে সৌজন্য দেখিয়ে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের হিসেবে গণ্য করল, তখন এই ৫৯ বছর বয়সেও আমি উপলব্ধি করেছি এমন মুহূর্ত কতটা বিশেষ হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সাবেক খেলোয়াড় অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সঙ্গে দেখা করে কয়েকটা কথা বলতে পেরেও আমি খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু তারপর মেসি এল। আর সেটা সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন মাত্রার ব্যাপার হয়ে উঠল।’
বিশ্বকাপে শুধু মেসি-রোনালদো নন, জার্মান জাতীয় দলের পারফরম্যান্সও নজরে রাখছেন ক্লপ। বিশেষ করে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স করা ডেনিজ উনদাভ তাকে মুগ্ধ করেছে।
ক্লপ বলেন, ‘গোল করার প্রবৃত্তিই তাকে আলাদা করে। সে জানে কোথায় থাকতে হবে। তার টেকনিক অসাধারণ, ফিনিশিংও দুর্দান্ত। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে তার প্রথম গোলটি দেখলে সহজ মনে হয়, কারণ শেষ পর্যন্ত সে চার-পাঁচ মিটার দূর থেকে বল জালে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু টেকনিক্যালি এটা অসাধারণ ছিল।‘তবে জুলিয়ান নাগেলসমানের একাদশে উনদাভকে অবশ্যই রাখতে হবে- এমন দাবি করেননি ক্লপ।
‘তাকে একাদশে রাখতেই হবে, এমন নয়। এটা কোচের সিদ্ধান্ত, এবং আমি সেটা পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়েই বলছি। তাকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করারও প্রয়োজন নেই। ডেনিজ উনদাভ, ডেনিজ উনদাভই। আর তাকে দলে পেয়ে আমরা সবাই ভীষণ খুশি,’ বলেন ক্লপ।
আরএএইচইউএল/আইএইচএস/