এক সকালেই পৃথিবীটা থেমে গেল ১৮ বছরের জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের জন্য। সকালে কাজে বের হওয়ার সময়ও তিনি জানতেন না, কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে এসে তাকে দেখতে হবে মা আর তিন বোনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। যে ঘরে প্রতিদিন মায়ের ডাক, বোনদের হাসি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল, সেই ঘর এখন শুধু নীরবতা আর কান্নার সাক্ষী।
Advertisement
২০১৯ সালে বৃষ্টিভেজা একদিন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। হাড়ি-পাতিল ও সিলভার সামগ্রী ফেরি করে সংসার চালাতেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিল পরিবারটি। কিন্তু হাল ছাড়েননি মা শাহিনুর বেগম। তিন মেয়েকে আর একমাত্র ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন সংগ্রাম করেছেন। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়ালেখা থামতে দেননি। বড় দুই সন্তানও ছোটখাটো কাজ করে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
সব কষ্টের মধ্যেও পরিবারটি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে সেই স্বপ্ন রক্তে ভেসে গেল। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২১), মেজো বোন ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট বোন শিফা আক্তার (৯)। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত হন অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮)।
আরও পড়ুন লক্ষ্মীপুরের সেই ঘটনায় হামলাকারীসহ নিহত বেড়ে ৫লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি শিক্ষার্থী সিফাত এখন একেবারেই নিঃস্ব। বাবা নেই, মা নেই, নেই তিন বোন। চোখের সামনে পুরো পরিবার হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে সে।
Advertisement
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সিফাত শুধু একটি প্রশ্নই করে, ‘আমার মা, বোনদের কী অপরাধ? কোন অপরাধে তাদেরকে এভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি এখন কার জন্য বেঁচে থাকবো। দুনিয়াতে আমার কেউ নেই।
সিফাতের বন্ধু ওমর ফারুক রনি বলেন, সিফাতরা ভাই-বোন সবাই খুব মেধাবী। লেখাপড়ার প্রতি তাদের অনেক আগ্রহ ছিল। বাবা হাড়খাটুঁনি পরিশ্রম করতো, শেষ তো বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা গেছে। কুমিল্লায়ও তাদের আপন বলতে কেউ নেই। পরিবারটি এখন শেষ হয়ে গেছে।
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সিফাত আমাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ৮ হাজার টাকা বেতনে সে ৭-৮ মাস আগে যোগ দেয়। সকালে সে কাজে বাসা থেকে বের হয়। সবার সহযোগিতা নিয়ে লেখাপড়াসহ পরিবারটি ভালোভাবেই চলছিল। তার পরিবারের সদস্যদের এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক হাসপাতাল ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি প্রত্যক্ষদর্শী, ভাড়াটিয়াসহ আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন।
Advertisement
থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েকবছর ধরে শাহীনুর তার সন্তানদের নিয়ে দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীরপাড়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। ২০১৯ সালে তার স্বামী হকার মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে ৩ মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে শাহীনুর ওই বাসায় বসবাস করে আসছেন। সকালে তিন মেয়েসহ শাহীনুরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘাতক অন্ততকে গণপিটুনি দেয়।
আরও পড়ুন লক্ষ্মীপুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যাবাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক জানান, ঘাতক অন্তর তার স্ত্রীসহ প্রায় দেড় বছর ঘটনাস্থলে বাসা ভাড়া থাকতেন। প্রায় ৭-৮ মাস আগে সে বাসা ছেড়ে চলে যায়। হয়তো পূর্ব পরিচিত হওয়ায় সকালে অন্তর এ বাসায় আসে। এরপর সে ঘটনাটি ঘটায়। রাণী নামে এক প্রতিবেশী অন্তরকে ওই বাসায় দেখে এখানে আসার কারণ জানতে চায়, তখন অন্তর বলে সে পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছে। রাণী এটা বিশ্বাস না করে কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেয়। তিনি পদক্ষেপটি না নিলে ঘটনাটি হয়তো উদ্ঘাটন হতো না।
কাজল কায়েস/কেএইচকে/জেআইএম