দেশজুড়ে

প্রযুক্তির অভাবে বছরজুড়ে মিলছে না তরমুজ

দেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা এবং বরগুনা এলাকায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ উৎপাদন হয় রসালো ফল তরমুজ। মৌসুমে বাজারে তরমুজের সরবরাহ থাকে প্রচুর। সরবরাহ বেশি থাকায় অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না। অথচ বছরের বেশিরভাগ সময় জনপ্রিয় এই ফলটি বাজারে পাওয়া যায় না।

Advertisement

এবার বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি ফলন হয়েছে তরমুজের। বিভাগে ফল উৎপাদনের দিক দিয়ে একক আধিপত্য রয়েছে এই ফলের। বিভাগটির ছয় জেলায় মোট ৫২ হাজার ৬৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫ টন, যা বিভাগের সর্বোচ্চ ফল উৎপাদন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৃষি উৎপাদন সংক্রান্ত বিভাগভিত্তিক উপাত্তে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং তরমুজভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে সারাবছর তরমুজের স্বাদ উপভোগ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকরাও পাবেন বাড়তি আয়।

‘তরমুজে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি পানি থাকে। ফলে ফলটি দ্রুত নরম হয়ে যায় এবং স্বাদ ও গুণগত মান কমতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পূর্ণ তরমুজ সাধারণত ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডায় রাখলে ফলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে’

Advertisement

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তরমুজের একটি বড় অংশ এখনো মৌসুম শেষে মূল্যহ্রাস ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে অপচয় হয়। আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তরমুজ শুধু মৌসুমি ফল নয়, বরং সারা বছরভিত্তিক একটি অর্থকরী কৃষিপণ্যে পরিণত হতে পারে।

তরমুজ কেন বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা লিটন মিস্ত্রী জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘তরমুজে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি পানি থাকে। ফলে ফলটি দ্রুত নরম হয়ে যায় এবং স্বাদ ও গুণগত মান কমতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পূর্ণ তরমুজ সাধারণত ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডায় রাখলে ফলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’

তবে কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করলে তরমুজ সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং প্রযুক্তি, হিমায়িত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারলে সারাবছর তরমুজের স্বাদ পাওয়া যাবে।’

‘তরমুজ সাধারণত সারাবছর সংরক্ষণ করা যায় না। তবে বর্তমানে বারি-১ ও বারি-২ জাতের তরমুজ সারাবছর পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে তরমুজের সংরক্ষণকাল কিছুটা বাড়ানো সম্ভব’

Advertisement

বরিশাল নগরীর তরুণ উদ্যোক্তা সাবিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও সনাতন পদ্ধতির কারণে দেশের সম্ভাবনাময় তরমুজ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দাঁড়াতে পারছে না। কাটার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাজারজাতকরণের আগেই ফেলে দিতে হচ্ছে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তরমুজ সংরক্ষণ করা গেলে প্রতি বছর কোটি টাকার ফল নষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে যাবে।’

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালি উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্ৰামের তরমুজ চাষি নান্না গাজী জানান, তিনি এবার ছয় বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তরমুজ খুব একটা নষ্ট হয়নি। তাই ফলনও ভালো হয়েছে। দামও ভালো পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণের অভাবে অনেক তরমুজ পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে। যদি তরমুজ সংরক্ষণ করা যায় তাহলে সারা বছরই বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব।’

গলাচিপা উপজেলার চাষি দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে যে পরিমাণ তরমুজ উৎপাদন হয়, তার বড় একটা অংশ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদি তরমুজ সংরক্ষণের জন্য একটা ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে এই ফল থেকে আরও বিশাল অংকের টাকা আয় করা সম্ভব হতো।’

‘তরমুজ সারাবছর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতি সিজনেই কিছু নির্দিষ্ট মৌসুমি ফল বাজারে থাকে। তখন অন্য ফল খেতে ভালো লাগবে না। তখন হয়তো দু-এক পিস খেতে ভালো লাগবে কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে না’

গবেষকদের মতে, তরমুজ কাটার পর জীবাণু সংক্রমণ ও আর্দ্রতা ক্ষয়ের কারণে দ্রুত মান কমতে শুরু করে। তাই কাটা তরমুজকে বায়ুরোধী প্যাকেটে রেখে ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা উচিত।

পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘তরমুজ সাধারণত সারাবছর সংরক্ষণ করা যায় না। তবে বর্তমানে বারি-১ ও বারি-২ জাতের তরমুজ সারাবছর পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে তরমুজের সংরক্ষণকাল কিছুটা বাড়ানো সম্ভব।’

কোল্ড স্টোরেজ: ১০-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৮৫-৯০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় তরমুজ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। উন্নত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা থাকলে দূরবর্তী বাজারেও সরবরাহ সহজ হয়।

ফ্রেশ-কাট ও প্যাকেজিং প্রযুক্তি: তরমুজ টুকরা করে বিশেষ খাদ্যগ্রেড প্যাকেটে সংরক্ষণ করলে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গুণগত মান ধরে রাখা যায়।

হিমায়িত সংরক্ষণ (ফ্রিজিং): তরমুজের শাঁস ছোট ছোট টুকরো করে দ্রুত হিমায়িত করলে কয়েক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পরে তা জুস, স্মুদি, আইসক্রিম বা ডেজার্ট তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন: তরমুজ থেকে জুস, স্কোয়াশ, সিরাপ, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, শুকনা ফল (ডিহাইড্রেটেড স্ন্যাকস) এবং পানীয় তৈরি করে দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি বরিশালের উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ মরিয়ম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘তরমুজ সারাবছর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতি সিজনেই কিছু নির্দিষ্ট মৌসুমি ফল বাজারে থাকে। তখন অন্য ফল খেতে ভালো লাগবে না। তখন হয়তো দু-এক পিস খেতে ভালো লাগবে কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে না।’

এসআর/এএসএম