মতামত

বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন উদ্যোগ: শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানার ওপর ভিত্তি করে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। সে সময় পাট, বস্ত্র, চিনি, কাগজ এবং ভারী শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে অসংখ্য কারখানা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ১৯৭২ সালের জাতীয়করণ নীতির মাধ্যমে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি শিল্প ইউনিট রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়, যা তখনকার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

Advertisement

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প কাঠামো তার প্রাথমিক গতিশীলতা হারাতে শুরু করে। ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুক্তবাজার ব্যবস্থার প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশও ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের পথে অগ্রসর হয়। ১৯৯০-এর দশকে Structural Adjustment Program-এর প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত পুনর্গঠন ও সংকোচনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে এবং উৎপাদন সক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে বহু কারখানা ধাপে ধাপে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এই অবনতির পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত কারণ কাজ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাব, অদক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবাধীন নিয়োগ প্রক্রিয়া শিল্পখাতের কার্যকারিতা দুর্বল করে দেয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী যেখানে শিল্পখাত অটোমেশন, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে বাংলাদেশের বহু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুরোনো যন্ত্রপাতি ও অনুন্নত উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক অদক্ষতা ও ধারাবাহিক লোকসান। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যয় উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়ে পড়েছিল। দুর্নীতি, কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। ফলস্বরূপ একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ বহু শিল্প ইউনিট ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

Advertisement

এই বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব কেবল শিল্পখাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা অর্থনীতি ও সমাজের বিস্তৃত স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েন, যা শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, প্রতিবছর নতুন শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের চাহিদার মুখোমুখি হয়, ফলে শিল্পখাতের এই সংকোচন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক শিল্পাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হ্রাস পায়, স্থানীয় ব্যবসা সংকুচিত হয় এবং দারিদ্র্য ও অভিবাসনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের পতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদনশীল সম্পদের অকার্যকর ব্যবহার। বহু কারখানার জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় থেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। এতে শুধু সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, ভবিষ্যৎ উৎপাদন সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অবক্ষয় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে, যা বাংলাদেশের কিছু পুরোনো শিল্পাঞ্চলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বর্তমানে এসব বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়টি আবারও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, শিল্পখাত সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাপের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান শিল্পসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন একটি কৌশলগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যম আয়ের অর্থনীতির পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে উৎপাদনশীল খাতের পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে পুনরায় চালুর সম্ভাবনা মূল্যায়নে বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে অনেক কারখানার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে, অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দক্ষ জনবলও আগের অবস্থায় নেই। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে নতুন শিল্প স্থাপনের সমান বা তারও বেশি হয়ে যায়। তাই শুধুমাত্র ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, বাজার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা বিবেচনা করা জরুরি।

Advertisement

একই সঙ্গে এটিও উপেক্ষা করা যায় না যে অনেক কারখানা এমন স্থানে অবস্থিত যেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো ও সংযোগ সুবিধা নতুন শিল্প স্থাপনের তুলনায় ব্যয় সাশ্রয়ী হতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং আঞ্চলিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও এই উদ্যোগকে অর্থনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে এর সঙ্গে গভীর সুযোগ ব্যয় (Opportunity Cost) জড়িত। সীমিত সম্পদের প্রেক্ষাপটে যেকোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত মানে একই সঙ্গে অন্য সম্ভাবনাগুলো থেকে সরে আসা। রাষ্ট্র যখন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্প ইউনিট পুনরুজ্জীবনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই সম্পদ কি নতুন শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা প্রযুক্তি খাতে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেত কি না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরোনো কাঠামো সংস্কারের মোট ব্যয় নতুন ও আধুনিক শিল্প স্থাপনের ব্যয়ের সমান বা তারও বেশি হয়ে যায়। ফলে এখানে আবেগ বা ঐতিহাসিক গুরুত্বের চেয়ে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই বিশ্লেষণে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ব্যয় হিসেবে কাজ করে। একটি পুরোনো কারখানা পুনরায় চালু করতে যে সময় প্রয়োজন হয়, সেই একই সময়ে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপন করলে উৎপাদন ও রপ্তানি আয় দ্রুত শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে আবার এটিও সত্য যে বিদ্যমান জমি, অবকাঠামো এবং আংশিকভাবে কার্যকর যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে শূন্য থেকে শুরু করার তুলনায় ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে কমে আসে। তাই সিদ্ধান্তটি কখনোই একমুখী নয়; বরং এটি লাভ, ব্যয় এবং সময়—এই তিনটির ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

এই প্রেক্ষাপটে অর্থায়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনা একটি বড় বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সাধারণত অত্যন্ত বড় এবং জটিল প্রকৃতির হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু সংস্কার নয়, পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হয়, যা ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে যেখানে বাজেটের একটি বড় অংশ অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ থাকে, সেখানে শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এই সীমাবদ্ধতার কারণে বিকল্প অর্থায়ন কাঠামোর গুরুত্ব বাড়ে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এখানে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অর্থায়নের উৎস যাই হোক না কেন, এর কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং আর্থিক অনিয়মের কারণে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবস্থাপনার দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবস্থাপনায় প্রায়ই ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বাজার পরিবর্তনের সঙ্গে সীমিত অভিযোজন ক্ষমতা দেখা যায়। অন্যদিকে বেসরকারি খাত তুলনামূলকভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বাজারের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত থাকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এর একটি বাস্তব উদাহরণ, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে সব শিল্প একইভাবে বেসরকারিকরণ উপযোগী নয়। কিছু কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য হতে পারে। এই কারণে অনেক অর্থনীতিবিদ যৌথ ব্যবস্থাপনা বা পিপিপি মডেলকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন, যেখানে রাষ্ট্র নীতিগত তদারকি করে এবং বেসরকারি খাত দক্ষতা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করে। তবে এই মডেল কার্যকর করতে হলে দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য।

এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে একাধিক ঝুঁকিও যুক্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানার অবকাঠামো ও প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে এতটাই পুরোনো হয়ে যায় যে পুনরায় চালু করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং দুর্নীতি বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি হলে নতুন বিনিয়োগও ব্যর্থ হতে পারে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। আধুনিক শিল্পখাত এখন সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলো উৎপাদন দক্ষতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে পুরোনো শিল্প কাঠামো দিয়ে টিকে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তে বাজার বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার গভীর বিশ্লেষণ জরুরি।

এই বাস্তবতার আলোকে কয়েকটি নীতিগত দিক স্পষ্ট হয়। প্রথমত, সব বন্ধ কারখানা একসঙ্গে না নিয়ে সম্ভাবনাময় ইউনিটগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে পুনরুজ্জীবন করা উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রকল্পের জন্য পৃথক সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ অপরিহার্য। তৃতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উৎপাদন সম্ভব নয়। চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, অর্থায়নে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বসহ বহুমাত্রিক কাঠামো গ্রহণ করা দরকার। সর্বশেষে, দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল শিল্পনীতি প্রণয়ন অপরিহার্য।

বাংলাদেশে প্রায় চল্লিশটি বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে মোট ব্যয় নির্ভর করবে প্রতিটি কারখানার ভৌত অবস্থা, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাত্রার ওপর। বিভিন্ন শিল্প-অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, একটি মাঝারি মানের পুরোনো কারখানা পুনরুজ্জীবনে গড়ে প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। সেই হিসেবে চল্লিশটি কারখানার জন্য মোট বিনিয়োগ আনুমানিক ৬,০০০ কোটি থেকে ২৪,০০০ কোটি টাকার মধ্যে দাঁড়াতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন, অটোমেশন এবং নতুন উৎপাদন লাইন সংযোজনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিতে গেলে এই ব্যয় ৩০,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে।

এই বিনিয়োগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আংশিক পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, পাশাপাশি পরোক্ষভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সহায়তা করবে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, পুরোনো শিল্প পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অদক্ষতা, প্রকল্প বিলম্ব এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে মোট ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় বা অতিরিক্ত খরচে রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ ও সংকটাপন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের পরিকল্পনা করেছিল, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার কাঠামোতে উন্নীত হয়। এর মধ্যে শিল্প পুনরায় চালুর জন্য একটি বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও কৃষি খাত মিলিয়ে পৃথক অর্থায়ন কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সব কারখানাকে সমানভাবে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় ইউনিটগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বাজারযোগ্য ও রপ্তানিমুখী খাতগুলোতে বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেল প্রয়োগ করলে দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অলাভজনক বা প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতিযোগিতামূলক কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবহার বা সম্পদ পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া অধিক অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত হবে। এভাবে পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন কেবল ব্যয় নয়, বরং জাতীয় সম্পদের কার্যকর বিনিয়োগে রূপ নিতে পারে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্টMizan12bd@yahoo.com

এইচআর/এমএস