দেশজুড়ে

সাদা মাছির আক্রমণে কমছে নারিকেল উৎপাদন, ধুঁকছে তেল শিল্প

একসময় বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর পরিচয় ছিল নারিকেল তেলের সুগন্ধ আর ব্যস্ত উৎপাদনমুখর পরিবেশ। সেই চিত্র এখন অতীত। সাদা মাছির (হোয়াইট ফ্লাই) আক্রমণে ক্রমাগত কমছে নারিকেলের উৎপাদন, সংকুচিত হচ্ছে কাঁচামালের সরবরাহ। এতে লোকসানের চাপে একের পর এক তেলের মিল বন্ধ হওয়ার পথে, কর্মহীন হচ্ছেন শ্রমিকরা। কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী নারকেলভিত্তিক শিল্প হারিয়ে যেতে পারে।

Advertisement

জানা গেছে, বাগেরহাটের কৃষকের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল নারিকেল, এই নারিকেল ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিসিক শিল্পনগরীর নারকেল তেল শিল্প। কিন্তু গত এক দশকে সাদা মাছির ব্যাপক আক্রমণে কমেছে নারকেলের ফলন, বেড়েছে কাঁচামালের সংকট। এর প্রভাবে উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

বিসিক শিল্প নগরীর কোকোনাট ওয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী চয়ন কুন্ডু। তিনি বলেন, ৩ মাস পর মিল খুলেছি। নারিকেলগুলো ভাঙানো শেষ হলে আবার বন্ধ হয়ে যাবে। একসময় এখানে প্রতিদিন ত্রিশ থেকে চল্লিশজন মানুষ কাজ করতেন। এখন একজনই কাজ করছেন। দুই তিনদিন পর নারকেল শেষ হলে তাও বন্ধ হয়ে যাবে। কোথাও নারিকেল পেলে দুই তিন মাস পর আবার চালু হবে। এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে মিল।

‘এক সময় বাগেরহাটে নারিকেলের অনেক ফলন ছিল। হোয়াইট ফ্লাইয়ের কারণে ফলন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলন কমার পাশাপাশি এই অঞ্চলে নারিকেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানও কমতে শুরু করেছে। নারিকেলের গাছের রোগ ও পোকার জন্য দিন দিন ফলন কমে যাচ্ছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বাগেরহাট নারিকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছি।’

Advertisement

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে নিজের সঞ্চয় ও ধারদেনা করে মিলটি প্রতিষ্ঠা করি। শুরুতে ব্যবসা ভালোই চলেছিল। দিন-রাত শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকতো মিল। কিন্তু এখন নারিকেলের অভাবে মিলটি প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। দুই-তিন মাস পরপর কিছু নারিকেল সংগ্রহ করতে পারলে কয়েকদিন তেল উৎপাদন করি। কাঁচামাল শেষ হলেই আবার মিল বন্ধ রাখতে হয়। নারিকেলের সংকটে শুধু আমার মিল নয়, বিসিক শিল্পনগরীর আরও ২০ থেকে ২৫টি তেল মিল একই সংকটে ধুঁকছে।

আরও পড়ুন ভারত থেকে আমদানির পর রপ্তানি হয় ‘সিলেটের সাতকরা’ নামে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাটে বর্তমানে ১০ লাখ ৩৪০টি নারিকেল গাছ আছে। অধিকাংশ গাছগুলো হোয়াই ফ্লাইয়ে আক্রান্ত। এতে আশঙ্কাজনক হারে ফলন কমেছে। হোয়াইট ফ্লাইয়ের আক্রমণে আবাদের পরিমাণও কমেছে। বর্তমানে নারিকেল গাছের আবাদ রয়েছে ৩ হাজার ৬৭৮ হেক্টর। উৎপাদন ৩৩ হাজার ৬০১ টন। গত ১০ বছরে নারিকেলের আবাদ কমেছে প্রায় ১৫০ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ হাজার টন।

নারিকেলের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তেলের কারখানা/ ছবি: জাগো নিউজ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেল গাছে তুলার মতো সাদা রঙের হোয়াইট ফ্লাই (সাদা মাছি) পাতার নিচের অংশে বসে রস শোষণ করে। এতে পাতা দুর্বল হয়ে হলদে হয়ে যায় এবং শুকিয়ে যায়। এতে গাছের খাদ্য তৈরির ক্ষমতা ও ফলন দুটোই কমে যায়। তাছাড়া হোয়াইট ফ্লাই আঠালো পদার্থ নিঃসরণ করে, ফলে পাতায় কালো ছত্রাক জন্মায়। এতে পাতায় কালো আস্তরণ পড়ে সূর্যের আলো গ্রহণ কমে যায়। পাতা ঠিকমতো খাবার তৈরি করতে পারে না। ফলে ফলন কমে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।

Advertisement

‘বিসিকে ২০টির মতো নারিকেল তেলের কারখানা ছিল। স্থানীয় পর্যায়ের নারিকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাইরে থেকে নারিকেল আনতে ব্যয় প্রচুর বেড়ে গেছে। ফলে তেল কারখানাগুলো খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নারিকেল স্বল্পতার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অন্য ব্যবসায়ের দিকে ঝুঁকছে।’

সদর উপজেলার ডেমা গ্রামের গৃহস্থ তরফদার দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার ২৫০টি নারিকেল গাছ আছে। আর কিছু সুপারি গাছ। আগে এই নারিকেল সুপারি বিক্রি করেই সংসার চালাতাম। আমাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই নারিকেল- সুপারি। এখন সাদা সাদা এক ধরনের পোকা আসছে, এর জন্য একদমই নারিকেল হচ্ছে না। সাদা পোকের জন্য গাছের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। নারিকেল কম হচ্ছে।

নারিকেল ব্যাপারী তুষার বোষ বলেন, আগে আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারিকেল কিনে এনে বিক্রি করতাম। গৃহস্তদের বাড়ির আঙিনার নারিকেল গাছ থেকেই বছরে দুই তিনবার তারা ৫শ’ থেকে ১ হাজার পিস নারকেল বিক্রি করতো। এখন কিছু গাছ মারা গেছে। যেগুলো আছে ওইগুলোতেও ফলন খুবই কম হচ্ছে। নারকেল গাছে সাদা এক ধরনের পোকা হয়, এর জন্য ফলন কমে গেছে। এখন আর আগের মতো নারিকেল হয় না। নারকেলের ফলন কমায় দামও বেড়েছে অনেক। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যও কমে গেছে।

আরও পড়ুন পাহাড়ে বিদেশি আম চাষে নতুন সম্ভাবনা

কচুয়া উপজেলার গৃহস্থ সোহান শেখ বলেন, আমাদের ১শ’ এর অধিক নারিকেল গাছ আছে। প্রতিটা গাছেই হোয়াইট ফ্লাই আক্রমণ করেছে। এতে গাছে পাতা শুকিয়ে গেছে, নারিকেলও তেমন হচ্ছে না। এই হোয়াইট ফ্লাইয়ের আগে প্রচুর নারিকেল হতো। তখন নারিকেলের টাকা দিয়েই সংসার চলতো। হোয়াইট ফ্লাইয়ের পাশাপাশি গাছে ইঁদুর উঠে নারিকেল কেটে দেয়। কোনোভাবেই এটা ঠেকানো যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাগেরহাট নারিকেল ও সুপারির জন্য বিখ্যাত। নারিকেল ও সুপারিতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এখনই যদি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে এই সেক্টরটি ধ্বংস হবে।

‘৩ মাস পর মিল খুলেছি। নারিকেলগুলো ভাঙানো শেষ হলে আবার বন্ধ হয়ে যাবে। একসময় এখানে প্রতিদিন ত্রিশ থেকে চল্লিশজন মানুষ কাজ করতেন। এখন একজনই কাজ করছেন। দুই তিনদিন পর নারকেল শেষ হলে তাও বন্ধ হয়ে যাবে। কোথাও নারিকেল পেলে দুই তিন মাস পর আবার চালু হবে। এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে মিল।’

বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, বিসিকে ২০টির মতো নারিকেল তেলের কারখানা ছিল। স্থানীয় পর্যায়ের নারিকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাইরে থেকে নারিকেল আনতে ব্যয় প্রচুর বেড়ে গেছে। ফলে তেল কারখানাগুলো খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নারিকেল স্বল্পতার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অন্য ব্যবসায়ের দিকে ঝুঁকছে।

আরও পড়ুন অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের লাভের গুড় খাচ্ছে ফেসবুক বিজ্ঞাপন

বাগেরহাটের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, এক সময় বাগেরহাটে নারিকেলের অনেক ফলন ছিল। হোয়াইট ফ্লাই (সাদা মাছি) এর কারণে ফলন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলন কমার পাশাপাশি এই অঞ্চলে নারিকেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানও কমতে শুরু করেছে। নারিকেলের গাছের রোগ ও পোকার জন্য দিন দিন ফলন কমে যাচ্ছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বাগেরহাট নারিকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, যদি বাগেরহাটে নারিকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র থাকে তাহলে একদিকে যেমন উপকূলীয় আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে নারিকেলের উৎপাদন বাড়বে। অন্যদিকে নারিকেল কেন্দ্রীক কুটির শিল্পগুলো জীবন ফিরে পাবে। এইজন্য আমরা ডিসি ও সংসদ সদস্যের প্রতি আহ্বান জানাই যেনো নারিকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নাহিদ ফরাজী/এনএইচআর/এএসএম