২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাসের আগে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনই আগামী অর্থবছরের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে একগুচ্ছ কর ছাড়ের প্রস্তাব এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কার অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
Advertisement
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনা শেষে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তবে সঠিক নীতি, জনগণের সহযোগিতা এবং পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবারও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকার কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে। এজন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো হবে। কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের ব্যবস্থা করা হলেও কাঁচাবাজার ও ছোট মুদি দোকান এ ব্যবস্থার বাইরে থাকবে।
Advertisement
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। আগামী অর্থবছরেও নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত এবং পরিচালন ব্যয় ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।
ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
Advertisement
পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অর্থমন্ত্রী একাধিক কর সুবিধার ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রয়েছে জিরো-কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো, আইপিও বা রাইট ইস্যুর মাধ্যমে শেয়ার ছাড়লে অতিরিক্ত কর সুবিধা, লভ্যাংশের ওপর করহার হ্রাস এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতে ৫ লাখ টাকার সীমা তুলে দেওয়া।
তিনি বলেন, ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। মে ২০২৬ পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে।
একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলন করতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিভিন্ন মহলের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারা ১৮(ক) বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আইএমএফ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার শূন্য হাতে ফেরেনি। বরং আগের সরকারের নেওয়া কর্মসূচির কিছু শর্ত দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সরকার নিজেই ওই কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে। ভবিষ্যতে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নতুন কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই সরকারের লক্ষ্য। বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে 'ডিরেগুলেশন' বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানোর নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এজন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প তদারকি, ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা জোরদার করা হবে।
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সংসদের সব সদস্যের সহযোগিতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
এমএএস/এমএসএম