অভিলাষ মাহমুদ
Advertisement
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির বিচারব্যবস্থা ও আইনি কাঠামোর সর্বোচ্চ চূড়া। এই আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমগ্র দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে। এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানে পৌঁছানো যে কোনো সাধারণ মানুষের জন্য অবিশ্বাস্য স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সোনিয়া সোতোমেয়র। ১৯৫৪ সালের ২৫ জুন জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারী আধুনিক আমেরিকান বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ল্যাটিন আমেরিকান, বিশেষ করে পুয়ের্তো রিকান বংশোদ্ভূত প্রথম নারী এবং সামগ্রিকভাবে তৃতীয় নারী বিচারপতি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ পেয়ে তিনি অনন্য নজির স্থাপন করেন।
প্রতিকূলতার মাঝে শৈশব ও বেড়ে ওঠাসোনিয়া সোতোমেয়রের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস এলাকার সাধারণ ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে। তার শৈশব মোটেও মসৃণ ছিল না। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি তার বাবাকে হারান। এরপর তার মা সেলিনা সোতোমেয়র চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও একা হাতে সোনিয়া ও তার ভাইকে বড় করে তোলেন। মায়ের কঠোর পরিশ্রম এবং শিক্ষার প্রতি অগাধ বিশ্বাস সোনিয়ার মনেও পড়াশোনার প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম দেয়। মাত্র আট বছর বয়সে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজের শারীরিক বা সামাজিক সীমাবদ্ধতাকে লক্ষ্যের মাঝে বাধা হতে দেননি। কঠোর পরিশ্রম, অদম্য অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে তিনি এগিয়ে চলেন।
শিক্ষাজীবনের অনন্য কৃতিত্বব্রঙ্কসের ক্যাথলিক স্কুল থেকে মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর সোনিয়ার মেধার স্বীকৃতি মেলে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। তিনি স্কলারশিপ নিয়ে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে ল্যাটিনো শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি অনন্য শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পাইন মেডেল’ লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে প্রিন্সটন থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি বিশ্বখ্যাত ইয়েল ল’ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৭৯ সালে ইয়েল ল’ স্কুল থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে ‘ইয়েল ল জার্নাল’-এর সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।
Advertisement
আইন স্কুল শেষ করার পর সোনিয়া সোতোমেয়র নিউইয়র্কের ম্যানহাটন কাউন্টির সহকারী জেলা অ্যাটর্নি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি কঠোর অপরাধমূলক মামলার বিচারিক কাজ পরিচালনা করে একজন দক্ষ ও আপসহীন আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিসে যোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট আইন নিয়ে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ তাকে নিউইয়র্কের দক্ষিণ জেলা আদালতের ফেডারেল বিচারক হিসেবে মনোনীত করেন। এর মাধ্যমে তিনি নিউইয়র্কের প্রথম হিস্পানিক ফেডারেল বিচারক হন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য সেকেন্ড সার্কিট’-এর বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেখানে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় প্রদান করে নিজের আইনগত প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেন।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নিয়োগ২০০৯ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ডেভিড সুটারের শূন্যপদে সোনিয়া সোতোমেয়রকে মনোনীত করেন। ওবামা তার মনোনয়ন প্রসঙ্গে সোতোমেয়রের জীবনসংগ্রাম এবং আইনি প্রজ্ঞার প্রশংসা করেন। ২০০৯ সালের আগস্টে মার্কিন সিনেটের অনুমোদনের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই নিয়োগ কেবল সোনিয়ার ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, বরং এটি ছিল আমেরিকার বিচারব্যবস্থায় বৈচিত্র্য, বহুসংস্কৃতি এবং যোগ্যতার নতুন দিগন্তের সূচনা।
সোনিয়া সোতোমেয়রের বিচারিক জীবনের মূল স্তম্ভসমূহ ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। মানবাধিকার এবং সামাজিক সমতা রক্ষা। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণ। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আইনের মানবিক ব্যাখ্যা। বিচারিক দর্শন ও সামাজিক প্রভাববিচারপতি সোনিয়া সোতোমেয়রের বিচারিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং সামাজিক সমতা। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন বিচারকের সিদ্ধান্ত কেবল শুষ্ক আইনের ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং তার সাথে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সমাজের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সংযোগ থাকা প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টের লিবারেল বা উদারপন্থী ব্লকের একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি নাগরিক অধিকার, নারীদের অধিকার, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বরাবরই দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তার ভিন্নমতাবলম্বী বা ‘ডিসেন্টিং’ মতামতগুলো আইনি মহলে দারুণভাবে প্রশংসিত ও আলোচিত হয়।
আরও পড়ুন নেইমারের যত বিশ্বরেকর্ড ও অনন্য কীর্তি নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণাসোনিয়া সোতোমেয়র আজ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বই নন বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক সংকট বা সামাজিক সীমাবদ্ধতা কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্নের চেয়ে বড় হতে পারে না। যদি থাকে মেধা, সততা আর কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা, তবে সমাজের তলানি থেকে উঠে এসেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া সম্ভব। তার জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে সর্বদা আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রজ্জ্বলিত থাকবে।
Advertisement
লেখক: কবি ও গল্পকার।
এসইউ