জাতীয়

ডার্ক ওয়েব-ক্রিপ্টোতে বাড়ছে মাদক কারবার, ঠেকাতে আসছে ‘সাইবার ফরেনসিক’

ঢাকার একটি ল্যাবে অবৈধভাবে ‘কিটামিন’ তৈরির অভিযোগে গত ২৫ মার্চ গ্রেফতার হন চীনের তিন নাগরিক। চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার নেওয়া এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করতো।

Advertisement

এছাড়াও তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করতো।

২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কিটামিন (চেতনানাশক ওষুধ), এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড) ও ডিওবির (ডাইমেথক্সিব্রোমো অ্যাম্ফেটামিন) অন্তত তিনটি বড় চালান জব্দ করা হয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এলএসডিসহ এক যুবক গ্রেফতার হন। তদন্তে জানা যায়, ওই যুবক ডার্ক ওয়েবে অর্ডার দিয়ে বিদেশ থেকে মাদক আনতেন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য পরিশোধ করতেন।

এরও আগে ২০২১ সালে খুলনায় ডিওবি ও এলএসডির চালানসহ দুই যুবককে আটক করা হয়। পরে তদন্তে উঠে আসে, পোল্যান্ড থেকে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে মাদক আনা হয়েছিল এবং অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল বিটকয়েনের মাধ্যমে।

Advertisement

আরও পড়ুন ঢাকায় ভয়ানক মাদক ‘কিটামিন’ তৈরির ল্যাব, ৩ চীনা নাগরিক গ্রেফতার

দেশে মাদক পাচার ও বিক্রির ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রচলিত সীমান্তপথ বা সরাসরি লেনদেনের পরিবর্তে অপরাধচক্র এখন ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এ বাস্তবতায় অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার দমনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক মাদক চক্র পরিচয় গোপন রাখতে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার বেড়েছে। অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার বেশ বেড়েছে। এ ধরনের কারবারি শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কারিগরি সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন ভালো উদ্যোগ। তবে সেখানে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হলেই শুধু সফলতা পাওয়া সম্ভব।—অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের অভিযান দিয়ে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সাইবার গোয়েন্দা নজরদারি, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক অনলাইন লেনদেন বিশ্লেষণের আধুনিক প্রযুক্তি।

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়, ক্রিপ্টো লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং ডার্ক ওয়েবভিত্তিক অপরাধ শনাক্তে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অনলাইনভিত্তিক মাদক চক্র শনাক্ত ও দমনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত মাদক নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।

আরও পড়ুন ‘কেটামিন’ তৈরির ল্যাব / ডার্ক ওয়েবে মাদক কেনাবেচা-ক্রিপ্টোতে লেনদেন করতেন চীনের তিন নাগরিক

অনলাইনে মাদক কারবার ও পাচার রোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডার্ক ওয়েব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা ও লেনদেনকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে একটি বিশেষ সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে সাইবার স্পেসে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন এবং বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট, ডার্ক ওয়েব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ই-মেইল বা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিতরণের উদ্দেশে যোগাযোগ পরিচালনা করলে তা আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে মাদক-সংক্রান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের বিষয়টিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যুক্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে মাদক কারবারিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডার্ক ওয়েব এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন করায় এসব অপরাধের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ / ভ্যাপ ও ই-সিগারেটের মাধ্যমে অনলাইনে বিক্রি হতো মাদক ‘এমডিএমবি’

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল তথ্য জব্দ ও সংরক্ষণের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইস, সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ ও ডিজিটাল ওয়ালেটের তথ্য জব্দ এবং ফরেনসিক পরীক্ষা করতে পারবেন। এছাড়া মাদকের প্রচার বা বিক্রিতে ব্যবহৃত কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত হলে তা অপসারণ বা ব্লকের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অনুরোধ করা যাবে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবার এখন ডিজিটাল ও সাইবারভিত্তিক নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। তাই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন আধুনিকায়নের অংশ হিসেবেই এসব বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।

এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কার্যক্রম গোপন রাখে মাদক কারবারিরা। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে।—মো. হাসান মারুফ

গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকের ভয়াল থাবা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। জুয়ার অপ্রতিরোধ্য গতি থামাতে হবে। যুবসমাজকে রক্ষা করতেই সরকার এসব উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরকে ডগ স্কোয়াড দেওয়া হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্রসহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আসামিদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য হাজতখানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সব জেলায় ল্যাব করার উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি।

আরও পড়ুন ডার্ক ওয়েবে কিনতেন এলএসডি, বিট কয়েনে দাম দিতেন নাজমুল

সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের সশস্ত্র দল থাকে। তাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিরস্ত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকির মধ্যে পাঠানো যায় না—যোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জাগো নিউজকে বলেন, মাদক কেনাবেচার ধরন পরিবর্তন হয়েছে। কারবারিদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে অভিযান পরিচালনায় এখন তথ্য-প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ হতে হয়। এমনকি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কারবারিদের ধরতে তাদের চেয়েও বেশি অভিজ্ঞ হওয়া প্রয়োজন। পাশপাশি ডার্ক ওয়েবসহ অন্যান্য এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সম্পর্কেও গভীর ধারণা রাখতে হবে। 

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জাগো নিউজকে বলেন, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কার্যক্রম গোপন রাখে মাদক কারবারিরা। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন ম্যানেজ হয়ে হেরোইন হয়ে যায় আটা-ময়দা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘তবে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে’—বলেন তিনি।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার বেশ বেড়েছে। এ ধরনের কারবারি শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কারিগরি সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন ভালো উদ্যোগ। তবে সেখানে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হলেই শুধু সফলতা পাওয়া সম্ভব।

টিটি/এমকেআর