স্বাস্থ্য

ডেঙ্গু রোগীর তথ্যে গরমিল, দিশাহারা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা-মোবাইল নম্বর ভুল দিচ্ছে রোগী খুঁজে পায় না সিটি করপোরেশন অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েও মিলছে না প্রতিকার

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া ডেঙ্গু রোগীর তালিকায় গরমিল থাকছে বলে অভিযোগ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। সংস্থা দুটি বলছে, অধিদপ্তর রোগীদের যে ঠিকানা দেয় তার অনেকগুলোই ভুল বা অসম্পূর্ণ। ফলে মশক নিধন কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের।

Advertisement

বিষয়টি সমাধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনো সমাধান হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

সাধারণত যে বাড়িতে ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়, সে বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের যে তালিকা দেওয়া হয়, বাস্তবে অধিকাংশ রোগীকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মোবাইল নম্বর ও তাদের নাম-ঠিকানা ভুল থাকায় এ সমস্যা বেশি তৈরি হচ্ছে।

Advertisement

আরও পড়ুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী / ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল চালু করা হবে

এ ছাড়া ঢাকার বাইরের শত শত রোগীকে ঢাকার অস্থায়ী ঠিকানায় (আত্মীয়ের বাসা) হাসপাতালে ভর্তি করায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এ কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিদিন রাজধানীর ২০টি সরকারি হাসপাতাল, ৪২টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ঢাকা শহরের বাইরের ৭১টি হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীর তথ্য তারা প্রকাশ করে। প্রতিদিন ওই হাসপাতালগুলো নির্দিষ্ট ছকে কন্ট্রোল রুমে ডেঙ্গুর তথ্য পাঠায়। ওই ছকে অন্য তথ্যের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় নতুন কত রোগী ভর্তি হলো, কতজনের মৃত্যু হলো, কত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেন এবং কত রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সেই তথ্য থাকে। কন্ট্রোল রুম সব হাসপাতালের তথ্য একত্র করে তা সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও গণমাধ্যমে পাঠায়। এখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কিছু করার থাকে না।

কেবল মশা নিধন অভিযান পরিচালনা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, আবার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নত করেও সংক্রমণ কমানো যায় না। প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সঠিক হওয়া জরুরি।-কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার

কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে, কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন ওয়ার্ডে দ্রুত অভিযান প্রয়োজন- এসব সিদ্ধান্ত নির্ভর করে নির্ভুল তথ্যের ওপর। কিন্তু তথ্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বিলম্বিত হয়।

Advertisement

একটি সংস্থা যখন অন্য সংস্থার তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও কমে যায়। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন ডেঙ্গুর ধরন কয়টি, কোনটি বেশি মারাত্মক?

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অংশগ্রহণ-এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে কাজ করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘কেবল মশা নিধন অভিযান পরিচালনা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, আবার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নত করেও সংক্রমণ কমানো যায় না। প্রতিরোধ ও চিকিৎসাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সঠিক হওয়া জরুরি।’

যখন থেকে ভর্তির তথ্যে গরমিল শুরু

২০২৩ সালে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করে। ওই বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় ডিএসসিসি-ডিএনসিসি। পরে ২০২৪ সালের ২৬ মে বিষয়টি অবগত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেন ডিএসসিসির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মিজানুর রহমান।

চিঠিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকার হাসপাতালগুলোতে আসেন। তাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, রোগীরা ঢাকায় বসবাসকারী তাদের আত্মীয়দের ঠিকানা ব্যবহার করেন। এই রোগীদের ব্যাপকভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির রোগী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা ডিএসসিসির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করপোরেশন যে কোনো রোগীর বাড়ির ৩০০ গজের মধ্যে মশা নিধন কর্মসূচি জোরদার করে। একই সঙ্গে ডিএসসিসি ওই এলাকায় চিরুনি অভিযানও চালায়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তালিকা বিশ্লেষণ করে করপোরেশন বেশ কিছু অসঙ্গতি পাচ্ছে।

ফলে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে করপোরেশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, যা তাদের স্বাভাবিক কাজকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। তাই ডেঙ্গু রোগীদের বিষয়ে সঠিক ও বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ করেছে।

ডেঙ্গু নিধনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার অনেক অ্যাকটিভ। তবে একটা জায়গায় শুধু আমাদের অবজারভেশন আছে। সেটা হল ডাটা সিস্টেম। তারা সিস্টেম জেনারেট করতে পারেনি।-ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী

দুই বছরের বেশি সময় পরও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিয়ে সেই গরমিল কাটেনি। এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসিতে ভুল তথ্যের তালিকা দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে ডিএনসিসি এলাকায় ১৭ জন ডেঙ্গু রোগীর তথ্য প্রকাশ করে। ওই তথ্য যাচাই করতে গিয়ে ১২ জন রোগী নিজেদের এলাকার পেয়েছে ডিএনসিসি। একইভাবে অন্য দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়, সেগুলোতেও এ গরমিল থাকে। এ ছাড়া একই অভিযোগ ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টদেরও।

আরও পড়ুন ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়, উদ্বেগ বাড়ছে ভারতে

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিধনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার অনেক অ্যাকটিভ। তবে একটা জায়গায় শুধু আমাদের অবজারভেশন আছে। সেটা হল ডাটা সিস্টেম। তারা সিস্টেম জেনারেট করতে পারেনি।’

আমাদের তথ্য সার্ভারে সমন্বয় হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সার্ভারে ইনপুট দেয়। কতজন ভর্তি হলো, কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো, কতজন মারা গেলেন, তাদের বয়স কত, জেন্ডার কী- সবই উল্লেখ থাকে।-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু রোগী নিয়ে যে তথ্য সিটি করপোরেশনের সরবরাহ করে তা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ দাবি করে তিনি বলেন, ‘এক কথায় তারা রোগীর সংখ্যায় ভুল তথ্য সরবরাহ করে। যেমন আজ দেখালো তারা ডিএনসিসি এলাকার ১৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি। তখন আমরা সার্ভে করে দেখেছি গড়ে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ রোগী ডিএনসিসির। বাকি রোগী ঢাকার আশপাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী এলাকায়।

ওই ভুল তথ্যের কারণে মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হয় জানিয়ে ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় হুট করে ঢাকায় ২০০-৩০০ ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন সরকারের মন্ত্রী বলেন উত্তর সিটিতে এত রোগী কেন। তখন আমরা গুনে বা যাচাই করে দেখি, ডিএনসিসি এলাকার ৫০ জন রোগীও নেই।’

এ কাজটি করতে গিয়ে মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘তাই আমরা রোগীর সঠিক নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর দিতে অধিদপ্তরকে বরাবর চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।’

অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের তথ্য সার্ভারে সমন্বয় হয়। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সার্ভারে ইনপুট দেয়। কতজন ভর্তি হলো, কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো, কতজন মারা গেলেন, তাদের বয়স কত, জেন্ডার কী- সবই উল্লেখ থাকে।’

এমএএ/এএসএ