খেলাধুলা

স্কোরলাইন আর্জেন্টিনার, প্রশংসা কেপ ভার্দের

‘বিপদে মোরে রক্ষা করো—এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।’ বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতা প্রতিফলনই যেন দেখা গিয়েছে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দের পারফরম্যান্সে। ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটারের দেশের কেউ এই কবিতা বা রবীন্দ্রনাথকে চিনেন কিনা বলা মুশকিল, হয়তো চিনেন না। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দের শারীরিক ভাষা, খেলার ধরণ ঠিক তেমনই ছিল। আর্জেন্টিনা সবকিছুতেই এগিয়ে, ফলে হারানোর কিছু ছিল না কেপ ভার্দের। তবে তাদের ছিল প্রতিপক্ষ দেখে ভড়কে না গিয়ে লড়াই করা। তারা সেটাই করেছে, ভয় না পেয়ে লড়াইটাই করেছে। দিনশেষে রেজাল্ট তাদের বিপক্ষে গেলেও ঠিকই দাগ কেটে গেছে ফুটবল বিশ্বে।

Advertisement

এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়েকে রুখে দেয় তারা। প্রথম ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে ড্র করেই মূলত আলোচনায় আসে দলটি। এরপর উরুগুয়েও আটকে যায়। সৌদি আরবের সঙ্গেও ড্র, ৩ ড্রয়ে শেষ ৩২-এ ওঠে কেপ ভার্দে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অনেকেরই ধারণা ছিল স্রেফ উড়ে যাবে ভার্দে। সেটা নাহলেও সহজ জয় পাবে মেসির দল। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে কেপ ভার্দে রীতিমতো আর্জেন্টিনাকে প্রতি মুহূর্তে ভয় ধরিয়েছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১২০ মিনিটের সেই লড়াই ছিলো এমন, যেখানে জয় নয়, সাহসই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।

ম্যাচের প্রতি পরতে পরতে কেপ ভার্দে বুঝিয়ে দিচ্ছিলো, আর্জেন্টিনা তাদের কাছে অন্তত মাঠের ভিতর স্রেফ প্রতিপক্ষ। কাগজে-কলমে দুই দলের পার্থক্য ছিলো আকাশ-পাতাল। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। কিন্তু মাঠে সেই ব্যবধান বুঝতেই দেয়নি কেপ ভার্দে। ৯০ মিনিটের খেলা শেষে স্কোরলাইন ১-১, খেলা গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। সেখানে আর্জেন্টিনা আবার লিড নিলে সেটাও ফিরিয়ে দেয় কেপ ভার্দে। ডান দিক থেকে বল পেয়ে তিনি আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে কাটিয়ে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নেন লোপেজ। সেকেন্ড পোস্ট দিয়ে যখন বলটা পোস্টের ভিতর যায়, গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।

খেলা দেখে বোঝার উপায় ছিল না দুই দলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শক্তিতে এত ফারাক! কেপ ভার্দের এই পারফরম্যান্সের পেছনে শুধু আবেগ নয়, ছিলো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো, কেপ ভার্দে শুধু ডিফেন্স করতে নামেনি; তারা আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে নেমেছে। বল ছাড়া মুহূর্তে কখনো ৪-২-৩-১, কখনো ৪-৫-১— হুটহাট নিজেদের পজিশন বদলাচ্ছিলেন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা।

Advertisement

একই সঙ্গে এক পাশ থেকে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় এনে মেদিনার দিকেও চাপ তৈরি করা হচ্ছিলো। ফলে আর্জেন্টিনার বিল্ডআপ বারবার ধীর হয়ে যায়। কেপ ভার্দে জানতো, মাঝখান পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে আর্জেন্টিনা বাধ্য হবে উইং ব্যবহার করতে। মাঝমাঠ তারা এতটাই আটকে দিয়েছিল যে, মেসির কাছে বল পৌছানোই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মেসিকে বারবার নিচে নেমে এসে বল নিতে হয়েছে, স্কোরিং জোন থেকে অনেক দূরে। এতে বলের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বক্সের আশপাশে আর্জেন্টিনা হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্রকে।

আর্জেন্টিনার সমস্যাও সেখানেই। কেপ ভার্দে ইচ্ছা করেই মাঝখান বন্ধ করে ওয়াইড এরিয়ায় কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো ধারাবাহিক ওভারল্যাপিং ফুলব্যাক আর্জেন্টিনার ছিল না। অ্যাটাকের ছন্দ বারবার থেমে যাচ্ছিলো। প্রথম হাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণে না ছিল গতি, না ছিল ধার। শেষ পর্যন্ত সেই অচলাবস্থা ভাঙতে এগিয়ে আসেন সেই মেসিই। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের দারুণ এক থ্রু ধরে নিখুঁত ফিনিশ। একসময় এই পরিস্থিতিতে আর্জেন্টিনার জন্য সমাধান হয়ে উঠতেন আনহেল ডি মারিয়া। মেসিকে ঘিরে ফেললে বিপরীত প্রান্ত থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতেন তিনি। এই দলে সেই প্রোফাইলের ফুটবলার নেই। লাউতারো মার্টিনেজ নিজের সেরা ছন্দে নেই, হুলিয়ান আলভারেজও প্রভাব ফেলতে পারেননি প্রত্যাশামতো। ফলে শেষ পর্যন্ত আবারও মেসিকেই হতে হয়েছে ত্রানকর্তা, আবার তাকেই হতে হয়েছে ফিনিশার। আধুনিক ফুটবলে কোনো দলের জন্য এটি সুখকর বাস্তবতা নয়।

তবে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে যতটা কৃতিত্ব দিতে হয়, তার সমান প্রশংসা প্রাপ্য কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সেও তার রিফ্লেক্স, পজিশনিং আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। একের পর এক সেভ, অবিশ্বাস্য পজিশনিং, আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অটুট মানসিকতা, পুরো বিশ্বকে দেখিয়েছেন কি করতে পারেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টেই তিনি ছিলেন দলের ভরসা, আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও সেই ছন্দ ধরে রেখেছিলেন তিনি।

কেপ ভার্দের গল্পটা আসলে শুধু গোলকিপার বা রক্ষণভাগের নয়। দুইবার পিছিয়ে পড়েও তারা ম্যাচে ফিরেছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে, এবার হয়তো শেষ; কিন্তু তারা আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া একটি দলের মধ্যে এমন মানসিক দৃঢ়তা খুব কমই দেখা যায়। তাদের শরীরী ভাষায় কখনোই মনে হয়নি, তারা শুধু সম্মানজনক হার নিয়ে সন্তুষ্ট। প্রতি সেকেন্ডে নিজেদের নিংড়ে দিয়েছে, দেখাতে চেয়েছে আন্ডারডগরাও জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

Advertisement

অন্যদিকে এই ম্যাচ আর্জেন্টিনার জন্যও বড় একটি সতর্কবার্তা। নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষ আর ভুলের সুযোগ দেবে না। ফুলব্যাক পজিশনে সীমাবদ্ধতা, উইং থেকে পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাব, মাঝমাঠে ছন্দ হারানো, আর মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সবকিছুই এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে। শেষ দিকে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেই গুরুত্বপূর্ণ সেভ না এলে ম্যাচের গল্প হয়তো অন্যরকমও হতে পারত।

বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা হয়তো শেষ পর্যন্ত জিতেছে, কিন্তু কেপ ভার্দে তাদের নিজেদের ধারণার বাইরে গিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। আর সেটাই হয়তো এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ই শেষ কথা। ইতিহাস বিজয়ীদেরই বেশি মনে রাখে। সেই অর্থে আর্জেন্টিনা তাদের কাজটা করেছে। কিন্তু এই ১২০ মিনিট স্কালোনিকে নিশ্চয়ই নতুন করে ভাবাবে।

আধুনিক ফুটবলে শুধু অসাধারণ একজন ফুটবলার দিয়ে আর সব সমস্যার সমাধান হয় না। মেসি এখনও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, কিন্তু তাকে ঘিরে যদি পর্যাপ্ত গতি, রান, উইং থেকে সমর্থন কিংবা বিকল্প পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে প্রতিপক্ষের জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই ম্যাচে সেটাই করেছে কেপ ভার্দে। তারা বুঝেছিল, মেসিকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়। তাই মেসিকে এমন জায়গায় খেলতে বাধ্য করেছে, যেখানে তার প্রভাব কমে যায়। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের সীমাবদ্ধতাও সামনে এনে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ভরসা হতে হয়েছে মেসির মুহূর্তের জাদু আর এমিলিয়ানো মার্তিনেজের নির্ভরযোগ্যতাকেই।

আর কেপ ভার্দে? তাদের জন্য এই পরাজয় কোনো ব্যর্থতার গল্প নয়। এই পরাজয় গর্বের, দলটির কোচও তেমনটাই বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দল এবং পুরো কোচিং স্টাফকে নিয়ে গর্বিত। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে এভাবে লড়াই করা, দুইবার সমতায় ফেরা এবং ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের দেশের জন্য সম্মানের। সবচেয়ে বড় কথা, এটা গৌরবের পরাজয়। আমি আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বিত। এই বিশ্বকাপে আমাদের চরিত্র ও লড়াইয়ের মানসিকতা আমাদের দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে। এটাই আমাদের পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।’

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির কথাতেও বোঝা যায় কেপ ভার্দে তাদের কি পরিমান পরীক্ষা নিয়েছে। ম্যাচের পর তিনি বলেন, ‘এটি খুবই কঠিন একটি ম্যাচ ছিলো। প্রতিটি ম্যাচ থেকেই ইতিবাচক কিছু নেওয়া যায়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দল কখনো হার মানে না। প্রতিপক্ষকে অবশ্যই অভিনন্দন জানাতে হবে। তারা আজ প্রমাণ করেছে যে তারা একটি দুর্দান্ত দল। আমরা যখন বলি নকআউটে কোনো সহজ কোনো প্রতিপক্ষ নেই, আজ তারা সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে।’

এসকেডি/আইএন