ফুটবল মাঠে আর্লিং হালান্ডকে দেখলে অনেক সময় মনে হয়, তিনি যেন সাধারণ কোনো স্ট্রাইকার নন-একটি নিখুঁতভাবে প্রোগ্রাম করা গোলমেশিন। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা জাতীয় দলের জার্সি-যেখানেই খেলুন না কেন, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য তিনি এক দুঃস্বপ্ন। শক্তি, গতি, উচ্চতা আর গোল করার সহজাত ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে সমসাময়িক প্রায় সব ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে।
Advertisement
তবে এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা ও জীবনযাপনের এক ভিন্ন দর্শন। খাবারের পছন্দ থেকে ঘুমের অভ্যাস-সবকিছুতেই তিনি অনুসরণ করেন এমন কিছু নিয়ম, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
প্রাকৃতিক খাবারেই ভরসাআজকের দিনে অনেক ক্রীড়াবিদ যখন নির্দিষ্ট ক্যালরি, সাপ্লিমেন্ট ও প্রক্রিয়াজাত পুষ্টিকর খাবারের ওপর নির্ভর করেন, হালান্ড সেখানে গুরুত্ব দেন যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রতি।
তার খাদ্যতালিকায় নিয়মিত থাকে গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা। পুষ্টিবিদদের মতে, এসব অঙ্গে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি, আয়রন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান থাকে, যা পেশি গঠন ও শরীরের শক্তি ধরে রাখতে সহায়ক।
Advertisement
এ ছাড়া তিনি ঘাস খেয়ে বড় হওয়া গরুর টমাহক স্টেক, সাওয়ারডো রুটি, ডিম এবং খাঁটি মধু খেতে পছন্দ করেন। যতটা সম্ভব প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করেন তিনি।
ঘুমের জন্য কঠোর নিয়মহালান্ডের কাছে ভালো ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তার দৈনন্দিন প্রশিক্ষণেরই একটি অংশ। প্রায় প্রতিদিন রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে শুধু সময়মতো শুয়ে পড়াই নয়, ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগেই শুরু হয় তার প্রস্তুতি।
ঘুমানোর প্রায় তিন ঘণ্টা আগে তিনি ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা ব্যবহার করেন। স্মার্টফোন, টেলিভিশন কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো যাতে শরীরের মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদনে ব্যাঘাত না ঘটায়, সেটিই এর উদ্দেশ্য।
সবচেয়ে আলোচিত অভ্যাসগুলোর একটি হলো ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ ধরনের সার্জিক্যাল টেপ লাগানো। এর মাধ্যমে তিনি মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া এড়িয়ে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখেন।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার ফলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদন বাড়তে পারে, যা শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যকারিতা এবং গভীর ঘুমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি আঙুলে বিশেষ অরা রিংও ব্যবহার করেন, যা হার্ট রেট ও শরীরের তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন তথ্য রেকর্ড করে।
দিনের শুরু প্রকৃতির আলোয়ঘুম থেকে ওঠার পর দিনের প্রথম কয়েক মিনিট প্রকৃতির সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করেন হালান্ড। তিনি সাধারণত অন্তত ১০ মিনিট বাইরে হাঁটেন এবং সকালের প্রাকৃতিক আলো গ্রহণ করেন। এতে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা হয় বলে মনে করা হয়।
তবে ম্যানচেস্টারের আবহাওয়া প্রায়ই মেঘলা থাকায় সূর্যের আলো না পেলে তিনি রেড লাইট প্যানেলের সামনে কিছু সময় দাঁড়ান। এই আলোর ব্যবহার শরীরের কোষে শক্তি উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।
পুনরুদ্ধারেও সমান গুরুত্বএকজন পেশাদার ফুটবলারের জন্য শুধু অনুশীলন করাই যথেষ্ট নয়; শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেন হলান্ড। সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন তিনি বরফ-ঠান্ডা পানিতে ডুব দেন এবং নিয়মিত সনায় সময় কাটান।
সনা হলো অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক পরিবেশের একটি বিশেষ কক্ষ, যেখানে সাধারণত তাপমাত্রা ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে ঘাম ঝরানোর পর ঠান্ডা পানিতে গোসল করেন তিনি। এই পদ্ধতি পেশির ক্লান্তি কমাতে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক বলে বিবেচিত হয়।
এর পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ২০ মিনিট সময় দিয়ে হিপ ফ্লেক্সর, গ্রোইন ও হ্যামস্ট্রিংয়ের নমনীয়তা বৃদ্ধির ব্যায়াম করেন। এমনকি হালকা অনুশীলনের সময়ও তিনি সচেতনভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখেন।
সাফল্যের ভিত্তি শৃঙ্খলাহালান্ডের জীবনযাত্রা অনেকের কাছেই যেন আধুনিক যুগে বাস করা কোনো ভাইকিং যোদ্ধার গল্প। কৃত্রিমতার পরিবর্তে প্রাকৃতিক খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পুনরুদ্ধার এবং কঠোর শৃঙ্খলাকেই তিনি নিজের সাফল্যের ভিত্তি বানিয়েছেন।
তার প্রতিটি অভ্যাস সবার জন্য উপযুক্ত বা বৈজ্ঞানিকভাবে সমানভাবে প্রমাণিত-এমন দাবি করা যায় না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, নিজের শরীরের প্রতি অসাধারণ যত্ন, ধারাবাহিক অনুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরও পড়ুন হালান্ডের প্রিয় খাবার প্রায়ই খাওয়া হয়, সহজে বাড়িতে বানিয়ে ফেলুনতথ্যসূত্র: রয়টার্স
জেএস/