খেলাধুলা

ব্যর্থতা নয়, যে দুর্ভাগ্য তাড়া করে বেড়ালো নেইমারকে

ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে যারা ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, তারা নেইমারকে জিকো আর সক্রেটিসের মতো ‘ট্র্যাজেডি কিং’ আখ্যা দিয়েছেন। আর যারা একটু গভীরে চিন্তা-ভাবনা করেন, তাদের চোখে নেইমার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘দুর্ভাগা’।

Advertisement

প্রথমত, তার ক্যারিয়ারের ৪টি বিশ্বকাপের দুটিতে শুধু প্রতিপক্ষ নয়, ইনজুরির বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়েছে তাকে। যার প্রমাণ হলো, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে প্রথম দুটি বিশ্বকাপে নেইমার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে খেলেছেন ৫টি করে, মোট ১০ ম্যাচ। আর গতবার অর্থাৎ ২০২২ (৩টি) ও এবার (২টি) মিলে সাকুল্যে ম্যাচ সংখ্যা মোটে ৫টি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইনজুরি তার ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে এসে বড় ধরনের বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারের বিশ্বকাপের বেশ আগে থেকেই নেইমার মাঠের বাইরে। দীর্ঘদিন ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করতে করতে ফিটনেস লেভেল গেছে কমে। গতি, ক্ষিপ্রতা, চপলতা হ্রাস পেয়েছে।

সর্বোপরি ম্যাচ প্র্যাকটিসও নেই। তাই সব মিলিয়ে তার পক্ষে এবারের বিশ্বকাপে মাঠে নেমে নিজেকে মেলে ধরা এবং নিজের সেরা সময়ে পৌঁছানো ছিল বেশ কঠিন ও প্রায় অসাধ্য/অসম্ভব। যাকে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হতো। এবং যিনি শারীরিক সক্ষমতা ও ফুটবল মেধা, স্কিলে প্রায় মেসি ও রোনালদোর কাছাকাছি।

Advertisement

মেসি ও রোনালদোর মতো মাস্টার ড্রিবলার তিনি নন। কম জায়গায় ‘ডেড’ বলে পায়ের কাজ ও শরীরের ঝাঁকুনিতে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের পরাস্ত করার ক্ষমতাও তুলনামূলক কম নেইমারের।

তবে গতির ওপর বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং চোখের পলকে খুব ভালো জায়গায় বল সরবরাহ করার পাশাপাশি জোরালো শট নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল বেশ। গতির ওপর প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগে ফাটল ধরানোর কাজে নেইমারের পারদর্শিতা ছিল প্রচুর। কাজেই প্রতিপক্ষ তার ভয়ে কম্পমান থাকত। নেইমারকে কড়া মার্কিংয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকত প্রতিপক্ষ।

পাশাপাশি স্কোরিং এবিলিটিও দারুণ। তাই ফুটবল সম্রাট পেলেকে টপকে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে নেইমারই সর্বাধিক গোলদাতা। মোটকথা, সৃষ্টি ও সৃজনশীলতা এবং গোল করার দক্ষতায় নেইমার তার সময়ে হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের ‘চালিকাশক্তি’, ‘প্রাণভোমরা’।

তাই মেসি ও রোনালদোর পাশাপাশি অল্প সময়ের মধ্যেই নেইমারের গায়ে এঁটে যায় বড় তারকার তকমা। জনপ্রিয়তাও পান প্রচুর। এমবাপে উপাখ্যান শুরুর আগে মেসি ও রোনালদোর পাশাপাশি নেইমারের নামই উচ্চারিত হতো বেশি। সামর্থ্য, অর্জন, কৃতিত্ব ও প্রাপ্তিতে কিছুটা কমতি থাকলেও মেসি ও রোনালদোর সঙ্গে প্রায় সমান তালে পাল্লা দিয়েই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন নেইমার।

Advertisement

দীর্ঘ সময় তার জাদুকরি ফুটবল মেধায় একটা বিশাল ফ্যান-ফলোয়ারও তৈরি হয়েছে। এক কথায় গত এক যুগের বেশি সময় ধরে নেইমার বিশ্ব ফুটবলের এক বড় তারা হয়েই জ্বলেছেন। ক্লাব ফুটবলেও তার সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

তার হাত ধরেই ব্রাজিল কনফেডারেশন্স কাপ ও প্রথমবার অলিম্পিক গেমস ফুটবলে স্বর্ণপদক জিতেছে। আর তাই এক সময় নেইমার হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। রোনালদো, রোনালদিনহো আর কাকাদের যুগ শেষ হওয়ার পর থেকে নেইমারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ব্রাজিলের সম্ভাবনা।

ব্রাজিল ভক্তরা আশার প্রহর গোনেন, বিশ্বকাপ এলেই নেইমারকে ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকেন বিশ্বজোড়া অগণিত ব্রাজিল ভক্ত। সবাই ভাবতে শুরু করেন, নেইমারের জাদুকরি নৈপুণ্যেই ব্রাজিল আবার ফুটবলে হারানো শিরোপা ফিরে পাবে।

কিন্তু হায়, সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২-এর পর এবারও সেই প্রত্যাশার বেলুন চুপসে গেল ব্রাজিল ভক্তদের। নেইমার সেই কল্পলোকে রাজকুমার হয়ে ব্রাজিলকে বিশ্ববিজয়ী করতে পারলেন না।

তার পূর্বসূরি পেলে, রোমারিও, বেবেতো, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো আর কাকারা একবার করে ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করাতে পারলেও নেইমার তা পারেননি। এবারও নেইমারের ব্রাজিল শেষ ষোলো থেকেই ছিটকে পড়ল।

নেইমারের মহানায়ক হতে না পারা নিয়ে অনেকেই হতাশ। তাদের কারো কারো ধারণা ছিল, নেইমারের হাত ধরে অন্তত একবার হলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে ব্রাজিল। তার পূর্বসূরি পেলে তিনবার ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করিয়ে অমর হয়ে আছেন। রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো আর রোনালদিনহোও একবার করে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছেন। কিন্তু নেইমার তা পারলেন না।

কেন পারলেন না, তা নিয়ে রাজ্যের কথাবার্তা। অনেক আলোচনা, পর্যালোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ। খোদ লিওনেল মেসি নেইমারের শূন্য হাতে মাঠ থেকে বিদায়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। নেইমারকে আবার মাঠে ফিরিয়ে এনে তার হাত ধরে ব্রাজিলের ফুটবলের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনার ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতিভা মেসি।

ইতালিয়ান সাবেক তুখোড় স্ট্রাইকার ভিয়েরিও নেইমারের বিরাট গুণমুগ্ধ। তিনিও বলেছেন, তিনি নেইমারের খেলা দেখতে মুখিয়ে থাকতেন। নেইমারের বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণ না হওয়া নিয়ে অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অনেক বড় বড় ফুটবলবোদ্ধাই আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, নেইমারের অন্তত একবার বিশ্বকাপ জেতা উচিত ছিল।

কেন তিনি পারেননি? তার হাত ধরে কী কারণে ব্রাজিল বিশ্বসেরা হতে পারেনি? তার কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত অনেকে।

এটা ঠিক যে, ইনজুরির কারণে নেইমার বহুদিন ধরেই মাঠে অনিয়মিত। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বেশ অনেকদিন ধরেই ছন্দে নেই। তার একার পক্ষে দল টেনে নেওয়ার মতো অবস্থা আর নেই। আসলে এই জায়গায় নেইমার নিজেকে খানিক দুর্ভাগা ভাবতেই পারেন। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পুরো সময় যোগ্য, দক্ষ ও কার্যকর সহযোগী পাননি।

পেলে যেমন ভাভা, গ্যারিঞ্চাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন। ৯৪-এর বিশ্বকাপে দুঙ্গার নেতৃত্বে মাউরো সিলভা আর ওপরে রোমারিওর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন বেবেতোর মতো অতি কার্যকর পারফরমার। রক্ষণপ্রাচীর ও সুগঠিত মাঝমাঠের পাশাপাশি রোমারিও-বেবেতো জুটির আক্রমণাত্মক ফুটবল ব্রাজিলকে দুই যুগ পর এনে দেয় বিশ্বসেরার মুকুট।

তারপর ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের মাটিতে ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে না পারলেও তাফারেল, কাফু, রবার্তো কার্লোস, লিওনার্দো, দুঙ্গা, রিভালদো, রোনালদো, বেবেতোর মতো একঝাঁক বিশ্বমানের খেলোয়াড় ব্রাজিলকে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন।

ফাইনালে জিনেদিন জিদানের একক নৈপুণ্যের কাছে ৩-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়ে তুষ্ট থাকলেও, ৪ বছর পর ২০০২ সালে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

কাফুর নেতৃত্বে মার্কোস, এডমিলসন, লুসিও, রবার্তো কার্লোস, গিলবার্তো সিলভা, রোনালদিনহো, রিভালদো আর রোনালদোর গড়া ব্রাজিলের সাজানো-গোছানো, ছন্দময় ও গতিময় আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলীর সামনে দাঁড়াতে পারেনি কোনো দল।

কিন্তু নেইমার একবারের জন্যও অমন সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দল পাননি। একজন বেবেতো, একজন রোনালদো, রিভালদো আর রোনালদিনহো বহুদূরের কথা, ন্যূনতম কাকার মানের ‘ক্রিয়েটিভ’ ও ‘ইফেক্টিভ’ মিডফিল্ডারও পায়নি ব্রাজিল। কাফু, রবার্তো কার্লোস, লিওনার্দো, এডমিলসন আর লুসিওর গড়া চীনের প্রাচীরের মতো ডিফেন্সও আর পায়নি ব্রাজিল।

ডুঙ্গার টাফনেস, গিলবার্তো সিলভার পরিশ্রমী খেলা আর রিভালদো ও রোনালদিনহোর মতো সৃষ্টি ও সৃজনশীল প্লেয়ারও আর আসেনি ব্রাজিলে। তাই একা নেইমারের পক্ষে দলকে টেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারপরও ২০১৪ সালে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল ব্রাজিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেবারই জার্মানির সঙ্গে মরণযুদ্ধে অতি আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে ৭ গোল হজম করে।

ইতিহাস সাক্ষী, শুধু ব্রাজিল নয়; আর্জেন্টিনা, ইতালি, জার্মানি আর ফ্রান্সও কারো একার নৈপুণ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়নি। পেলের সময়ও ভাভা, গ্যারিঞ্চার মতো অসাধারণ প্রতিভাবান প্লেয়ার ছিলেন।

১৯৭৪-এ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের নেতৃত্বে গতি ও পাওয়ার ফুটবল খেলে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয় গার্ড মুলারের মতো একজন অতি উচ্চমানের ও কার্যকর স্ট্রাইকারকে নিয়ে। ১৯৭৮ সালে ড্যানিয়েল পাসারেলার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনাও বিশ্ববিজয়ী হয় মারিও কেম্পেসের অসামান্য নৈপুণ্যে ভর করে।

১৯৮২ সালে পাওলো রোসি ইতালিকে সোনালি সাফল্য এনে দিলেও সে আসরে ইতালি একটি দল হিসেবেই চ্যাম্পিয়ন হয়। একইভাবে ১৯৮৬ ও ১৯৯০-এ দিয়েগো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য আর অসামান্য সৃষ্টিশীল ফুটবল আর্জেন্টিনাকে সোনালি সাফল্য পাইয়ে দিলেও, বুরুচাগা, ভালদানো, ক্যানিজিয়া আর বাতিস্তুতার ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট।

৯০-এর দশকে লোথার ম্যাথাউসের নেতৃত্বে জার্মানি এক অন্যরকম দুর্দমনীয় দলে পরিণত হয়। সেখানেও ছিল আন্দ্রেয়াস ব্রেমে, থমাস বার্থোল্ড, ইয়ুর্গেন কোহলার, থমাস হ্যাসলার, লোথার ম্যাথাউস, রুডি ফোলার ও ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের মতো তখনকার সময়ের সেরা খেলোয়াড়দের সমারোহ।

১৯৯৪ সালে দুঙ্গার অধিনায়কত্বে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয় তাফারেল, কাফু, রিকার্ডো রোচা, ব্রাঙ্কো, মাউরো সিলভা, ডুঙ্গা, রোমারিও, বেবেতো ও লিওনার্দোদের মতো নামী ও সুপ্রতিষ্ঠিত পারফরমারদের নিয়ে।

বেশি দূর পিছনে তাকানোর দরকার নেই। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষেত্রে রাইট উইংয়ে ডি মারিয়ার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মেসির সঙ্গে তার বোঝাপড়া, দেওয়া-নেওয়াই ছিল আর্জেন্টিনার সাফল্যের মূলে।

কাজেই এটা ধ্রুবতারার মতো সত্য যে, দক্ষ, যোগ্য আর কার্যকর সহযোগী ছাড়া কারো একার পক্ষে দল টেনে নেওয়া এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করানো খুব কঠিন। সেই আলোকে নেইমার গত এক যুগে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে তেমন কাউকে সঙ্গী হিসেবে পাননি। সেটা তার ব্যর্থতা নয়, দুর্ভাগ্য।

এআরবি/আইএইচএস/