দেশজুড়ে

চার সন্তান নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন জুলাই শহীদের স্ত্রী

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কারখানা শ্রমিক সাব্বির ইসলাম। নিজের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় সাব্বিরের কবর হয় অন্যের জমিতে। তবে দুই বছর পরও পরিবারটি অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। বাসা ভাড়া দিতে না পারায় তার পরিবারকে এরইমধ্যে বাসা থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

Advertisement

চার সন্তান নিয়ে আজ মানুষের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন স্ত্রী ফরিদা আক্তার। অভাবের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে সন্তানদের লেখাপড়াও।

সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ সাব্বির ইসলামের পরিবারের খোঁজ নিতে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান এলাকায় তার শ্বশুরবাড়িতে যান প্রতিবেদক।

সাব্বিরের শ্যালক মো. চঞ্চল মিয়া জানান, এখানে ওখানে থাকছে তার বোন। নিজের বাড়িতে জায়গা কম, পারিবারিক অশান্তির কথা বিবেচনা করে ভাড়া বাসায় উঠেছে তারা। সেখানেও বাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে না পারার কারণে বের করে দিয়েছে, এখন কোথায় থাকে তা জানেন না তিনি।

Advertisement

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট সকাল নয়টায় ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হন সাব্বির ইসলাম (৪৪)। উদ্দেশ্য ছিল চাল-ডালসহ বাজার সদাই নিয়ে ঘরে ফেরার। কিন্তু তা আর হয়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামে নিজের জমিজমা না থাকায় শহীদ সাব্বিরের কবর দেওয়া হয় শ্বশুরবাড়ি এলাকায় অন্যের জমিতে।

সাব্বির ইসলাম নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বাউন্দি গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে। উপজেলার বানিয়াজান এলাকায় তার পরিবারের লোকজন বাস করে। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ১২ বছর বয়সি ছেলে মো. মমিন মিয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে লিজা আক্তার (১৫) পঞ্চশ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে টাকার অভাবে আর পড়তে পারেনি।

স্থানীয়রা জানায়, সাব্বির ইসলাম প্রায় দুই দশক আগে বানিয়াজান গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি শ্বশুরবাড়ি এলাকায় চলে যান। তার শ্বশুরও দরিদ্র। সেখানে দিনমজুরিসহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সাব্বির। কিন্তু বছর সাতেক আগে তার কুঁড়েঘরটিও ভেঙে পড়ে। জীবিকার তাগিদে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় গিয়ে একটি সরিষা তেলের কারখানায় কাজ নেন তিনি। সেখানে স্ত্রী, আর চার সন্তান নিয়ে কোনো রকমে সংসার চলছিল তার।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন সাব্বির। ৫ আগস্ট সকালে কাজের সন্ধানে বাসা থেকে বের হন তিনি। দিনমজুরি শেষে বাজার সদাই নিয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল তার। পরিস্থিতি দেখে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারের বাইপাইল এলাকায় তার ডান কানের পাশ দিয়ে একটি গুলি ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

Advertisement

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সাব্বিরকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন স্ত্রী ফরিদা আক্তার। নিজের ভিটে মাটি না থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। এরিমধ্যে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে তিন সন্তানের। সরকারি জায়গা বরাদ্দ দিয়ে শহীদ পরিবারটিকে মাথা গোজার ঠাঁই করে দেওয়ার দাবি এলাকাবাসীর।

উপজেলা সদরের অন্তত তিনটি স্থানে খোঁজ নিয়ে পাওয়া যায় সাব্বিরের স্ত্রী ফরিদা আক্তারকে। একটা জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় বিষণ্ন মনে বসে ছিলেন তিনি। কথা বলার এক পর্যায়ে আহাজারি করে ফরিদা বলেন, ‘আন্দোলন শুরু হওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ হইয়া যায়। কাজকাম না থাহনে ধারদেনা কইরা চলছি। পোলাপান ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি আর সংসারে অভাব দেইখা আমার স্বামী আন্দোলনে যোগ দেয়। ৫ তারিখ ঘর থাইক্কা বাইর হওনের সময় কইছিল, বাজার-সদাই লইয়া আইমু। কাম না পাইলে ছাত্রদের লগে আন্দোলনে গিয়া সরকার পতন ঘটাইয়া ঘরে ফিরমু। কিন্তু সরকার পতন ঠিকই হইল, আমার স্বামী তো আর ফিরলো না। পোলাপান নিয়া আমি অহন কীভাবে চলবাম? যারা আমার স্বামীরে মারল, তাদের বিচার আল্লাহর কাছেই দিলাম।’

ফরিদা বলেন, ‘আমি কীবায় চার সন্তান লইয়া চলবাম? আমার তো সবই শেষ হইয়া গেছে। ছেড়াডাও (ছেলেটিও) প্রতিবন্ধী, মেয়েডাও বড় হইছে বিয়া দিতে হইব। আমার মাথায় কিছুই ধরে না।’

তিনি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। মাথা গোজার স্থায়ী কোনো জায়গা না থাকায় সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বাসা ভাড়া দিতে না পারলে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। অভাব-অনটনের কারণে সন্তানদের পড়াশোনাও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সাব্বিরের বড় মেয়ে লিজা আক্তার বলেন, ‘বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি। পড়াশুনা বন্ধ অইয়া গেছে। বাসা ভাড়া সময়মতো দিতে না পারলে মালিক থাকতে দেয় না। সবাইতো এমপি-মন্ত্রী অইছে! আমার বাবার কী অইছে? আমরাতো অহন খেতে পরতে পারি না! পড়ালেখা করতে পারি না! আমরার খবর কেউ নেয় না!’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আঙ্গুর মিয়া বলেন, ‘শহীদ সাব্বিরের পরিবার চরম মানবিক সংকটে রয়েছে। তাদের জন্য সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত করে একটি ঘর নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। উপজেলা সদরেই সরকারি খাস জমি আছে! সেটা বন্দোবস্ত দিয়ে ঘর করে দিতে পারে প্রশাসন। একজন শহীদ জুলাই যোদ্ধার পরিবার এভাবে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে। এটা দেখতেও খারাপ লাগে।’

ফরিদা আক্তারের বড় ভাই মো. চঞ্চল মিয়া বলেন, গুলিতে নিহত সাব্বির রাস্তায় পড়েছিল। একজন সাব্বিরের ফোন থেকে ফরিদার বড় মেয়েকে বিষয়টি জানান। পরে তারা একটি পিকআপভ্যানে করে মরদেহ আটপাড়ার বানিয়াজান গ্রামে নিয়ে ফেরেন রাত পৌনে চারটায়। ৬ আগস্ট ১০টায় জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়। সাব্বির খুবই নিরীহ ও ভালো মানুষ ছিলেন। আন্দোলনে গিয়ে নিহত হওয়ায় তার পরিবার এখন খুবই বিপদে পড়েছে। সরকার ও বিত্তবানরা সহযোগিতার হাত বাড়ালে বাচ্চাদের নিয়ে সাব্বিরের স্ত্রী ফরিদা ভালোভাবে বাঁচতে পারতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালে ৫ লাখ টাকা সহায়তা পায় সাব্বিরের পরিবার। এরপর ২৫ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেয় সরকার। চলতি বছরের জুন মাসে ১০ বছর মেয়াদি আরও ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র করে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহনূর রহমান বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তারা সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন। পরিবারটির জমিজমা না থাকায় সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী খাসজমিসহ ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

এফএ/এএসএম