মিজানুর রহমান, জার্মানি
Advertisement
জার্মানিতে আউসবিল্ডুং, উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরি নিয়ে দেশ ছাড়ার পর একটা সাধারণ দীর্ঘশ্বাস প্রায়ই শোনা যায়- ‘জার্মানরা কেমন জানি একটু রোবোটিক, সহজে মিশতে চায় না, সারাক্ষণ একটা দূরত্ব বজায় রাখে।’
ইউরোপের এই অর্থনৈতিক পরাশক্তির নাগরিকরা পেশাগত জীবনে ভীষণ যান্ত্রিক আর ব্যক্তিগত সম্পর্কে বেশ গম্ভীর— এমন একটা ধারণা বিশ্বজুড়েই প্রচলিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গম্ভীর ও আপাত-দূরত্ব বজায় রাখা জার্মানদের মনের খোলস ভাঙার কোনো জাদুকরী চাবিকাঠি কি আমাদের জানা আছে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাদেরই সংস্কৃতিতে। সেই চাবিকাঠিটি হলো- ‘জার্মান ভাষা’। জার্মানির কর্মক্ষেত্রে বা প্রাত্যহিক জীবনে ইংরেজি দিয়ে হয়তো আপনি কোনো রকমে টিকে থাকতে পারবেন, কিন্তু তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হলে চাই তাদেরই মাতৃভাষা।
Advertisement
আপনি যখন একজন জার্মানের সাথে তার নিজের ভাষায় কথা বলবেন, তখন সে আপনাকে কেবল একজন অভিবাসী বা বিদেশি হিসেবে দেখবে না; বরং আপনাকে তাদেরই একজন ভাবা শুরু করবে। এর পেছনে কাজ করে কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
প্রথমত, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি হলো সম্মানের সর্বোচ্চ রূপ। জার্মানরা তাদের ভাষা এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি নিয়ে প্রচণ্ড গর্বিত। আপনি যখন কোনো জার্মান বসের সামনে কিংবা কলিগের সাথে ভাঙা-ভাঙা জার্মানেও কথা বলার চেষ্টা করবেন, তখন তারা ধরে নেয়— আপনি তাদের দেশকে এবং সংস্কৃতিকে মন থেকে শ্রদ্ধা করেন।
তারা আপনার ব্যাকরণ বা উচ্চারণের ভুল ধরবে না; তারা দেখবে আপনার শেখার আন্তরিক চেষ্টা। এই সামান্য চেষ্টাই তাদের মনে আপনার প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো আস্থা। জার্মান সমাজ গড়ে উঠেছে পারস্পরিক আস্থার ওপর ভিত্তি করে। তারা যে কোনো কাজে স্পষ্টতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা পছন্দ করে। কর্মক্ষেত্রে আপনি যখন জার্মানে পরিষ্কার কথা বলতে পারবেন, তখন আপনার ট্রেইনার বা সহকর্মীরা নিশ্চিন্ত হন যে, কাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আপনি ভুল বুঝবেন না কিংবা কোনো মেশিনের ভুল বোতাম টিপে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটাবেন না। এই ভাষাগত দক্ষতাই আপনার পেশাদার নির্ভরযোগ্যতা তাদের চোখে এক ধাক্কায় শতগুণ বাড়িয়ে দেয়।
Advertisement
তৃতীয়ত, এটি আপনাকে যে কোনো সামাজিক আড্ডার মূল স্রোতে মিশে যেতে সাহায্য করে। জার্মান অফিসে কাজের সময় শুধু কাজ হলেও, দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক বা কফি পিরিয়ডে সবাই হালকা আড্ডায় মেতে ওঠে। সেখানে আপনি যদি শুধু ইংরেজি জানেন, তবে প্রথামাফিক দু-একটি আনুষ্ঠানিক কথার পর তারা আবার নিজেদের মধ্যে জার্মানে হাসাহাসি বা আলোচনা শুরু করবে, যা আপনাকে একাকীত্বে ভোগাতে পারে।
কিন্তু আপনি যদি জার্মানে টুকটাক কৌতুক বা তাদের উইকেন্ডের প্ল্যান নিয়ে কথা বলতে পারেন, তবে তারা আনন্দের সাথে আপনাকে তাদের আড্ডার মূল অংশ বানিয়ে নেবে। এভাবেই পেশাদার সহকর্মীরা এক সময় পরম বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়।
চতুর্থত, জার্মান কর্মসংস্কৃতিতে তোষামোদি নয়, যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়। সেখানে বসের মুখে মিষ্টি কথা বলে বা তেল মেরে প্রমোশন পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেখানে মূল্যায়ন হয় শুধু কাজ এবং যোগাযোগের দক্ষতার।
জার্মানি এমন একটা দেশ যেখানে আপনি কাজ যতই ভালো পারেন না কেন, ভাষা না জানলে আপনার দারুণ সব আইডিয়া বসের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যখন আপনার জার্মান সহকর্মীর সমান স্তরে গিয়ে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন, জার্মানরা আপনার সেই স্পষ্টবাদিতাকে স্যালুট জানাবে এবং আপনাকে একদম সমান চোখে দেখবে।
সবশেষে, এই ভাষা আপনার জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল ভেঙে দেয়। জার্মানির সরকারি অফিসগুলো তাদের কঠিন নিয়মের জন্য কিছুটা কুখ্যাত। ভিসা এক্সটেনশন বা আনমেলডুং-এর সময় বহু বিদেশি কর্মকর্তাদের রুক্ষ আচরণের মুখোমুখি হন, কারণ অনেক সময়ই তারা ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
কিন্তু আপনি যদি কাউন্টারে গিয়ে মিষ্টি করে জার্মানে নিজের সমস্যাটা বুঝিয়ে বলতে পারেন, তবে দেখা যাবে সেই কড়া অফিসারই আপনার ফাইলটি সবার আগে হাসিমুখে প্রসেস করে দিচ্ছেন। এমনকি আপনার বাসার জার্মান বাড়িওয়ালা বা প্রতিবেশীও যে কোনো বিপদে আপনার দিকে সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
তাই পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে যারা আউসবিল্ডুং বা স্টুডেন্ট ভিসায় জার্মানি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তারা জার্মান ভাষা শিক্ষাকে কেবল ‘ভিসা পাওয়ার উসিলা’ বা একটি অতিরিক্ত বোঝা ভাববেন না। এটিকে ভাবুন আপনার ভবিষ্যৎ জার্মান লাইফের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সফলতার মূল চাবিকাঠি।
দেশ থেকেই মন দিয়ে A1 থেকে B2 লেভেলটা এমনভাবে আয়ত্ত করা উচিত, যেন জার্মানির মাটিতে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই আপনি তাদের মন জয় করে নিতে পারেন। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা এক একজন জার্মান তখন আপনার জন্য বুক বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করবে না।
এমআরএম