দেশজুড়ে

অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাবুলের বিরুদ্ধে মামলা

নরসিংদীতে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। তাকে জিম্মি করে মারধরের পর পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

Advertisement

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী লিখন তালুকদার নরসিংদী মডেল থানায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাসুদ রানা বাবুলকে প্রধান আসামি করে সাতজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন। এরপর থেকে আসামিরা পলাতক।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী লিখন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার গোবিন্দপুরের বাসিন্দা এবং ঢাকার একটি কনসালটেন্সি ফার্মের ব্যবসা করেন।

মামলার আসামিরা হলেন নরসিংদীর হাজীপুর ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের সামাদ সরকারের ছেলে মাসুদ রানা বাবুল ওরফে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাবুল ৫৫), তার ভাই কামাল সরকার (৪৯), বদরপুর গ্রামের হাসিম ভূইয়া ছেলে কামাল ভূইয়া (৪৭), নরসিংদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু হানিফ সজিব (৩৮), বিলাসদী এলাকার ইনসান (৪০) ও শরীফ (৩৮) এবং শিবপুরের পুটিয়া গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে মোশারফ হোসেন (৪৯)।

Advertisement

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে চেক সংক্রান্ত একটি মামলায় হাজিরা দিতে নরসিংদী আদালতে আসেন লিখন তালুকদার ও তার বন্ধু শাকিল খান। হাজিরা শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় মাসুদ রানা বাবুলের নেতৃত্বে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখেন।

ভুক্তভোগীর দাবি, সেখানে তাকে মারধর করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ব্যবহৃত মোবাইলফোন থেকে স্ত্রী সায়মা শাহীন রিয়াকে ফোন করে নির্যাতনের শব্দ শোনানো হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চক্রের প্রধান মাসুদ রানা বাবুল দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধ কণ্ঠ, নরসিংদী পোস্ট, জনসংবাদ টিভি নামসহ আইডি খুলে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের হয়রানি ও ব্ল্যাকমেল করে টাকা আদায় করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে নরসিংদীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি অপহরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে হয়রানিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি নিজেকে ‘মাদক বিরোধী আন্দোলন’ নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে আসছেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ২০১২ সাল থেকে বাবুলের নেতৃত্বে নরসিংদীতে একটি সংঘবদ্ধ হানি ট্র্যাপ চক্র সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি চক্রটির কয়েকজন নারী সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও কথিত নারী প্রধান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই নারীকে আগলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক থেকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

Advertisement

অভিযোগ রয়েছে, এই হানি ট্র্যাপ চক্রের ফাঁদে পড়েছেন নরসিংদীর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, প্রকৌশলী, কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষক নেতা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চক্রের কথিত নারী প্রধান প্রথমে মেসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কৌশলে টার্গেট ব্যক্তিদের ভিডিও কল দিয়ে প্রথমেই স্কিনশর্ট নেন। সুযোগ পেলে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরে মাসুদ রানা বাবুলের সঙ্গে সমন্বয় করে তার কথিত পেজগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছে অর্থ দাবি করা হয়। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে তার পরিচালিত ফেসবুক পেজগুলোতে মানহানিকর প্রচারণা ও চরিত্রহনন করা হয়।

টাকা আদায়ের মেসেজে চক্রটির দাবি, আদায়কৃত অর্থের ৭০ শতাংশ কথিত নারী প্রধান এবং ৩০ শতাংশ মাসুদ রানা বাবুল গ্রহণ করতেন। এই মধ্যে হানি ট্যাপের এই চক্রটি স্বনামধ্যন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায়ের একটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাসুদ রানা বাবুলের সঙ্গে মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর এম আল মামুন বলেন, ‌‘সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’

এ বিষয়ে নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। এ ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে ‘

সঞ্জিত সাহা/এসআর