মতামত

শুধু ভবন নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নে অন্য কিছু করতে হবে

দেশের শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন- এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বিনিয়োগ কোথায় হওয়া উচিত? নতুন ভবন, নতুন প্রতিষ্ঠান আর নতুন প্রকল্পে, নাকি বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট দূর করার কাজে? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০টি সরকারি আবাসিক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Advertisement

পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েক বছরের মধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বহুতল একাডেমিক ভবন, হোস্টেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব নির্মাণ করা হবে। শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতা ভিন্ন প্রশ্ন তুলে ধরে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট কি সত্যিই ভবনের অভাব?

দেশে বর্তমানে হাজার হাজার সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে। অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই, কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও আবার বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার কিংবা আইসিটি সুবিধা কার্যকর নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে ভবন থাকলেও মানসম্মত পাঠদান নেই। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলেও প্রকৃত শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন ভবন নির্মাণ কি সত্যিই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনবে?

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শেখার মানের অবনতি। মাধ্যমিক পর্যায়ের বহু শিক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা দুর্বল হওয়ায় কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। অর্থাৎ বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষা কার্যকর হচ্ছে না। এই অবস্থায় আরও শত শত নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ করলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না।

Advertisement

অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতেই শিক্ষক সংকট ভয়াবহ। বহু বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের হাজার হাজার পদ শূন্য পড়ে আছে। নেতৃত্বহীন ও শিক্ষকস্বল্প প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। নতুন ৬০০টি প্রতিষ্ঠান চালু হলে সেখানে আবার নতুন করে হাজার হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রয়োজন হবে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানেই যেখানে দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কতটা বাস্তবসম্মত- সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই উন্নয়নের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রয়োজন অগ্রাধিকার নির্ধারণ। নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও মানসম্মত করা জরুরি। যে বিদ্যালয়গুলো আজ শিক্ষক সংকটে, নেতৃত্বহীনতায়, দুর্বল পাঠদানে এবং অব্যবস্থাপনায় ভুগছে, সেগুলো ঠিক না করে নতুন ভবন নির্মাণ শিক্ষা সংস্কার নয়; বরং সমস্যার ওপর নতুন রং করার মতো।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলেও অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা, শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ালেই উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ে, যদি শিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে তার সংযোগ তৈরি না হয়। তাই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জমি। বাংলাদেশের কৃষিজমি প্রতিবছরই কমছে। নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উর্বর জমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন করে শত শত প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত। শিক্ষা উন্নয়নের নামে যদি কৃষিজমিই ক্রমাগত কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য আরও বড় হতে পারে।

Advertisement

যদি সত্যিই শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো সরকারের লক্ষ্য হয়, তাহলে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পিছিয়ে থাকা বিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়ন। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের স্কুলগুলোতে দক্ষ শিক্ষক পাঠানো, সেখানে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা, আধুনিক ল্যাব, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় পরিচালনায় জবাবদিহি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে।

ক্যাডেট কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম সফল শিক্ষা মডেল- এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে শুধু আবাসিক ভবন নয়; রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা, দক্ষ শিক্ষক, নির্বাচিত শিক্ষার্থী, নিবিড় তদারকি, সুশাসন এবং দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি। কেবল ভবনের নকশা অনুকরণ করলেই ক্যাডেট কলেজের মতো শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয় না। সুশাসন ও মানসম্মত ব্যবস্থাপনা ছাড়া একই ধরনের অবকাঠামো কেবল ব্যয়বহুল স্থাপনায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রাখে।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষার মান উন্নয়ন। নতুন ভবনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়ন, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, গবেষণা, কর্মমুখী শিক্ষা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক জবাবদিহি। যে অর্থ নতুন ভবন নির্মাণে ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার বড় একটি অংশ বিদ্যমান স্কুল ও কলেজগুলোর মান উন্নয়নে ব্যয় করা হলে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হবে।

রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই উন্নয়নের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রয়োজন অগ্রাধিকার নির্ধারণ। নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও মানসম্মত করা জরুরি। যে বিদ্যালয়গুলো আজ শিক্ষক সংকটে, নেতৃত্বহীনতায়, দুর্বল পাঠদানে এবং অব্যবস্থাপনায় ভুগছে, সেগুলো ঠিক না করে নতুন ভবন নির্মাণ শিক্ষা সংস্কার নয়; বরং সমস্যার ওপর নতুন রং করার মতো।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কতগুলো নতুন ভবন তৈরি হলো তার ওপর নয়; বরং কতজন শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থে শেখার সুযোগ পেল, কতজন দক্ষ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ফিরলেন এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর হলো—তার ওপর। তাই সময়ের দাবি একটাই- নতুন ভবনের আগে বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।

লেখক: ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটি (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর।

 এইচআর/জেআইএম