রাত তখন কত, করিম বাক্স ঠিক জানে না। বয়স হলে সময়ের হিসাব রাখাটাও একরকম ভার হয়ে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাঁটা তখন আর নিজের থাকে না, থাকে অন্যদের হাতে, যাদের এখনো ভবিষ্যৎ আছে বলে সময় গোনার দরকার পড়ে। ঘুম ছুটে গেছে তার বহুকাল। এই বয়সে ঘুম যেন এক অভিমানী প্রাচীন অতিথি। যে জানে তার প্রাপ্য সমাদর আর নেই এই ঘরে, তবু মাঝেমধ্যে আসে, দ্বিধায় আসে, দরজার কাছটায় একটু দাঁড়ায়। তারপর নিঃশব্দ পায়ে ফিরে যায় যেন ভয় পায় থিতু হতে, ভয় পায় এই বৃদ্ধ শরীরের সাথে দীর্ঘ কোনো সংলাপে জড়িয়ে পড়তে। কোথায় যায় সে, কে জানে। বোধহয় চলে যায় ছেলেপুলেদের কাছে, যাদের ঘুম এখনো ঋণমুক্ত, নিষ্কণ্টক। রফিকের কাছে। রফিক ঢাকায় থাকে, রফিক ঘুমায়; গভীর, স্বার্থপর আর নিরুপদ্রব ঘুম। যে ঘুমে অতীতের কোনো দায় এসে থাবা বসায় না। জোয়ান বয়সের এই এক বড় আশীর্বাদ। ঘুম তখনো বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে না, তখনো সে বাধ্য ভৃত্যের মতো ডাক দিলেই আসে, ডাক দিলেই যায়। বার্ধক্য এসে সেই সরলতা কেড়ে নেয়; তখন ঘুম হয়ে ওঠে এক দুর্লভ অতিথি, আর জেগে থাকা হয়ে ওঠে জীবনের দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম।
Advertisement
করিম বাক্স উঠে পড়লেন। বাইরে এলেন। আকাশে মেঘ নেই, কিন্তু চাঁদও নেই। তারার আলোয় মাঠ একটা অদ্ভুত ধূসর রং ধরে আছে। উত্তরের বাতাস বইছে, মৃদু। এই বাতাসের গন্ধ তিনি চেনেন; মাটির গন্ধ, তার নিজের মাটির গন্ধ, কিন্তু সেই গন্ধের সঙ্গে এখন মিশে আছে পোড়া ইটের একটা ধোঁয়াটে গন্ধ। সেই গন্ধটা তার ভালো লাগে না।
পুবদিকে তাকালেন। অন্ধকারেও বোঝা যায়, পুবের তিন বিঘা জমি এখন ইটভাটার দখলে। শুকনো ঠাটা মাঠ। মাটি কেটে কেটে লাল করে দিয়েছে শ্রমিকেরা। পাশে দক্ষিণের জমিটাও বিক্রি হয়ে গেছে গত বছর। মালেকদের জমি। মালেক ছেলেপুলে নিয়ে শহরে গেছে। জমির টাকায় ব্যবসা করবে।
করিম বাক্সের নিজের পাঁচ বিঘা জমি মাঝখানে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক বিক্রি হয়েছে, তিনি বেচেননি। লোকে বলে, বাক্সদার, এই জমি রাইখ্যা কী করবেন? ছেলে ঢাকায়, আপনে একলা, আপনের বয়স হইছে। এই জমি চাষ দিবেন কী দিয়া? পানি নাই, মজুর পাওয়া যায় না। বেইচ্যা দেন, ভাটার মালিক ভালো দাম দেবে।করিম বাক্স শোনেন, চুপ থাকেন।রফিক ফোনে বলে, আব্বা, আপনি কি শুনছেন না কথা? ওই জমিতে আর ধান হবে না। পানির স্তর নামছে, আশেপাশে ভাটা হলে মাটিও নষ্ট হয়ে যাবে। তখন দাম পাবেন না। এখনই বেচে দেন।করিম বাক্স বলেন, তুই চুপ যা রফিক।রফিক বলে, আব্বা...করিম বাক্স ফোন রেখে দেন।
Advertisement
এই রাতে তিনি মাঠে নামলেন।জমির আলে দাঁড়িয়ে থাকলেন একটু। পায়ের নিচে মাটি শক্ত, চৈত্রের শেষে এমনই হয়, ফাটল ধরে, থাকে শুকনো খটখটে। কিন্তু এই ফাটলের ভেতরেও প্রাণ আছে, তিনি জানেন। বাপের আমলে দেখেছেন, এই মাটিতে বোনা বীজ কেমন ফুটে উঠতো। এক বিঘায় পনেরো মণ ধান। এখন সে সব কোথায়?তখনই করিম বাক্সের চোখ যায় জমির মাঝামাঝি। মানুষ। একটা মানুষ বসে আছে জমির মধ্যে; না, ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, মাটি খুঁড়ছে। হাতে কিছু একটা।করিম বাক্সের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত নামলো। চোর নাকি!তিনি এগিয়ে গেলেন। পা টিপে টিপে নয়, সোজাসুজি। বয়স হলে ভয় কমে, এটা তিনি লক্ষ করেছেন।কাছে গিয়ে দেখলেন, একটা ছেলে। বয়স বিশ-বাইশ হবে। পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি, গায়ে কিছু নেই। হাতে একটা ছোট কোদাল। মাটি খুঁড়ে একটা গর্ত করেছে, এখন সেই গর্তে কিছু একটা রাখছে খুব সাবধানে সন্তর্পণে যেন শিশুকে শোয়াচ্ছে।কেডা তুই?ছেলেটা চমকে উঠলো না। মাথা তুলল ধীরে। তারার আলোয় মুখটা অস্পষ্ট।বেলু। কয় মানুষ।বেলু? কার ছাওয়াল?তাহের মিয়ার।করিম বাক্স থামলেন। তাহের মিয়া, হ্যাঁ, চেনেন। পুবের জমি যে বেচে দিয়েছে। এই ছেলে তারই।মোর জমিত কী করতেছস রে?ছেলেটা উত্তর দিলো না। আবার মাটির দিকে তাকালো। তারপর, খুব সাবধানে, হাতের জিনিসটা গর্তে নামাল। একটা ছোট মাটির পাত্র। মুখ কাপড়ে বাঁধা।ওটা কী?বীজ। কণ্ঠস্বর শান্ত, যেন ঘুমের ভেতর থেকে কথা বলছে। আমার বাপের বীজ। হামার জমির বীজ।করিম বাক্স সেখানে বসে পড়লেন। হঠাৎ পা দুটো যেন আর দাঁড়াতে চাইল না। কোন বীজ?হামার বাপে রাখছিলো। বাপের বাপে রাখছিলো। নাগার ধান। শুনছেন না নাগার ধানের কথা? এই ধান এই অঞ্চলে আর নাই বললেই চলে। হামার বাপের কাছে ছিল। জমি বেচার পর যখন শহরে যাইতেছিলাম, আব্বা আমার হাতে দিয়া কইছে, এটা রাখিস বেলু। জমি গেলে গেছে, কিন্তু বীজটা যেন না যায়।করিম বাক্স কিছু বললেন না।কিন্তু শহরে বীজ রাখমু কই? ভাড়া ঘরে? তাই আইলাম।মোর জমিতে ক্যান?বেলু একটু চুপ করে রইল। তারপর বললো, আপনে বেচেন নাই বাক্সদা। এই অঞ্চলে এখন এইটাই একমাত্র জমি যেইটা ভাটা হয় নাই। এই মাটিতে বীজ থাকলে... একটু থামলো বেলু। বীজ টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসা নিয়ে উচ্চারণ করলো, বাঁচতে পারে।করিম বাক্স বেলুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছেলেটার মুখে কোনো আবেদন নেই, কোনো কান্না নেই। শুধু একটা সত্য কথা বলছে, যেভাবে মানুষ বলে চিরন্তন আশার কথা। বীজ মাটিতে রাখলে বাঁচে?বাঁচে। বীজের ভেতর প্রাণ থাকে বাক্সদা, রাত থাকে। রাত থাকে মানে, অপেক্ষা থাকে। মাটি পাইলে ফোটে, আলো হইয়া ফোটে।করিম বাক্স হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করলেন। শুকনো। ঠান্ডা। কিন্তু তার নিচে...তোর বাপ কী কইছে আর?বেলু একটু হাসল। তারায় মাখানো সেই হাসি।কইছে, মাটি মরে না। মানুষ মরে, জমির দলিল মরে, কিন্তু মাটি মরে না। মাটি শুধু ঘুমায়। আবার পানি পাইলে জাইগা ওঠে।
আরও পড়ুন ফারজানা অনন্যার গল্প: নরকের গানসেই রাতে তারা দুজন অনেকক্ষণ বসে রইলেন। বেলু আরও কয়েকটা জায়গায় গর্ত করলো, বীজ রাখলো, মাটি চাপা দিলো; যেন বীজ রাখছে না, যেন শয্যা পাতছে। করিম বাক্স দেখলেন। এক পরম বিস্ময় নিয়ে নীরব রইলেন।একসময় বেলু উঠে দাঁড়ালো।যাই বাক্সদা।থাক রাতটা।না, কাইল সকালে কামে যাইতে হবে।কীসের কামে?ইটভাটায়।করিম বাক্স থমকে গেলেন।ইটভাটায়। যে ভাটা তার জমির চারদিক গ্রাস করে নিচ্ছে, সেই ভাটায় কাজ করে বেলু। তার বাপের জমির মাটি পুড়িয়ে ইট বানানো হচ্ছে, সেই আগুনের পাশে সারাদিন বসে থাকে সে।কষ্ট লাগে না?বেলু একটু ভাবলো।লাগে। কিন্তু পেট চালান লাগে বাক্সদা।বেলু চলে গেল। করিম বাক্স বসে রইলেন মাটির ওপর। আকাশে তারা কমে আসছে, ভোর হবে।
পরদিন সকালে রফিকের ফোন এলো।আব্বা, আপনি কি জমির বিষয়টা ভেবে দেখেছেন? ভাটার লোক আবার আসবে এই সপ্তাহে। ভালো দামই দেবে।করিম বাক্স বললেন, রফিক, নাগার ধানের কথা জানোস?ফোনের ওপাশে চুপ।নাগার ধান কী আব্বা?তোর দাদার আমলের ধান। এক বিঘায় পনেরো মণ দিতো। পোকা ধরতো না, বন্যায় নষ্ট হইতো না। এই ধানের জীবনীশক্তি খুব বেশি। তোর দাদা কইতো এই ধান নাকি মাটির সাথে কথা বলে।আব্বা, এসব এখন...করিম বাক্স বললেন, তোর দাদা কইতেন, মাটিরে যদি শুধু নাও আর কিছু না দাও, মাটি একদিন মরে যায়। মরা মাটিতে হাইব্রিডও জন্মায় না।আব্বা!আমার জমিতে বীজ আছে রফিক। আমি বেচমু না।রফিক একটু থামলো।কীসের বীজ?যে বীজ তুই চিনস না। যে বীজ তোর ছেলেপুলে হয়তো চিনবে।ফোন রেখে দিলেন।
হাশিমন আসলো দুপুরে। পাশের বাড়ির বুড়ি। তার স্বামীও গত হয়েছে দশ বছর আগে। একা থাকে।বাক্সদা, শুনলাম তাহেরের পোলায় রাইতে আইছিলো তোমার জমিতে?গ্রামে কথা ছড়ায় বাতাসের আগে।আইছিলো।কী করছে?বীজ রাখছে।হাশিমন একটু চুপ করে রইল। তারপর বললো, ভালো করছে।করিম বাক্স একটু অবাক হলেন।ভালো?হ্যাঁ। হামার শাশুড়ি কইতেন, বীজ যদি মাটি না পায়, বীজ মইরা যায়। মানুষও তাই। শিকড় না থাকলে মানুষও মরে। বেলু শিকড় রাখতে চাইছে। এইটাই তো বাঁচা।করিম বাক্স আকাশের দিকে তাকালেন। পশ্চিমে মেঘ জমছে। বৃষ্টি আসবে কি?হাশিমন, তুমি কী মনে করো, মাটি কি কথা শোনে?হাশিমন হাসলো, বৃদ্ধার হাসি বেশ গভীর আর প্রাণবন্ত।শোনে বাক্সদা। মাটি সব শোনে। মাটি যা শোনে দুইখান কান থাকতে তা আমরাও শুনি না।
Advertisement
সন্ধ্যায় করিম বাক্স আবার মাঠে গেলেন।যেখানে বেলু বীজ রেখেছে, সেই জায়গাগুলো তিনি মনে রেখেছেন। হাঁটু গেড়ে বসলেন। হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করলেন। এই মাটির নিচে এখন ঘুমিয়ে আছে একটা ইতিহাস। তাহের মিয়ার বাপের বাপের হাতে বাছাই করা বীজ। কত বছরের? পঞ্চাশ? একশ? আরও বেশি? এই বীজ কত বন্যা দেখেছে, কত খরা পেরিয়েছে, কত দুর্ভিক্ষ পার করেছে।আর এখন মাটির তলায় অপেক্ষা করছে।করিম বাক্স বুঝতে পারলেন, বেলু যা বলেছে তা ঠিক। বীজের ভেতর রাত থাকে। রাত মানে অন্ধকার নয়, রাত মানে অপেক্ষা। রাত মানে পরবর্তী প্রভাতের প্রতিশ্রুতি।তিনি জমির ওপর হাত রেখে বললেন, মুই বেচমু না।কেউ শুনলো না। বাতাস শুনলো হয়তো আর শুনলো মাটি।
সেই রাতে করিম বাক্স স্বপ্ন দেখলেন, তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন জমির আলে। পরনে সাদা ধুতি। হাতে একমুঠো ধান-পাকা, সোনালি ধান। বলছেন, করিম, এই ধান দেখ, এই ধান তোর দাদার হাতে লাগানো। তার আগে তোর দাদার বাবার হাতে। এই ধানের দানায় দানায় তাগো হাতের ছোঁয়া আছে। তুই কি বুঝবার পারস? জমি শুধু মাটি না করিম। জমি হইলো স্মৃতি। যে জমি বেচে, সে শুধু মাটি বেচে না; সে নিজের অতীত বেচে, নিজের ভবিষ্যৎ বেচে।ঘুম ভেঙে গেল।বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। মৃদু ঠান্ডা হাওয়ায় করিম বাক্স কাঁথাটা আরেকটু গায়ে জড়িয়ে নিলেন। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে শুয়ে রইলেন। মাটিতে বৃষ্টি পড়ছে, তার মাটিতে। সেই মাটির নিচে বেলুর বীজ। বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে যাচ্ছে। বীজকে স্পর্শ করছে। একটা বীজের ভেতর এই মুহূর্তে কী হচ্ছে? ঘুম ভাঙছে? নাকি আরও গভীর ঘুমে যাচ্ছে, যে ঘুমের শেষে বীজ প্রতীক্ষায় থাকে জেগে ওঠার!
পরদিন ভাটার মালিকের ম্যানেজার এলো। ভদ্রলোক। পোশাক-পরিচ্ছদ নিপাট। হাতে কাগজপত্র।বাক্স সাহেব, আপনার সাথে একটু কথা ছিল।করিম বাক্স বললেন, কও।আপনার জমিটা আমরা নিতে চাই। দাম আপনিই বলেন। যা বলবেন তাই দেব।করিম বাক্স একটু হাসলেন।আমার জমির কোনো দাম নাই।লোকটা অবাক হলো।মানে?মানে এই জমির দাম নাই। যার দাম নাই, তা বেচা যায় না।সাহেব, সব কিছুরই দাম আছে।আমার বাপের দাম কত, কও? আমার দাদার দাম কত? তারা এই জমিতে আছে। এই জমিতে যে বীজ আছে, সেই বীজ এই অঞ্চলে আর নাই। যে বীজ শত বছর পুরানা। তার দাম কত?লোকটা কিছু বলতে পারলো না। ফিরে গেল।
তিনদিন পর ভাটার মালিকের আরও কিছু লোক এলো। দলবলে। সঙ্গে দুজন লাঠিওয়ালা, আর একটা মোটরসাইকেল রাগী ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রইলো আলের ওপর, যেন শাসাচ্ছে মাটিটাকেই।বাক্স সাহেব, মালিক নিজে খুশি হয়ে দাম বাড়াইছেন। বিঘা লাখ টাকা। ভাবেন।করিম বাক্স মাটির দিকে চোখ রেখে বললেন, দাম যত বাড়াও; মাটি তত সস্তা হয় না।লোকটার মুখে হাসি শুকিয়ে গেল। বাক্স সাহেব, এই তল্লাটে আপনার একলা জমি টিকিয়ে রাখা, এইটা ভালো দেখায় না। চাইরদিকে ভাটা, মাঝখানে খাল কাটা ধানজমি, পানি জমবে, মাটি বসবে, আপনারই ক্ষতি।ক্ষতি তো তখনই হইছে; যখন তোমরা মাটির নিচের পানি টাইনা নিছো, চিমনির আগুনে চাইরদিকের বাতাস পোড়াইছো। এখন আইসা কও আমার ক্ষতি হইবো?লোকটা গলা নামালো, কিন্তু চোখে আগের নমনীয়তা নেই। বাক্স সাহেব, জমি একলা রাখলে তো চলবে না। আশেপাশের সবাই বেচছে। আপনি একলা আটকাইয়া থাকলে ভাটার রাস্তা, পানি নিকাশ, সব আটকা পড়ে। মালিক লোকসানে আছেন।মালিকের লোকসান! করিম বাক্স হেসে উঠলেন। শুকনো আর ধারালো সে হাসি। যে মানুষ একবিঘা মাটির বদলে একজীবনের ঘাম কাইড়া নেয়, সে যদি লোকসানের কথা কয়, তবে লাভের কথাটা কে কইবো? তাহেরের কথা কও। মালেকের কথা কও। যারা জমি দিয়া শহরে গেছে, দুই বছরে তাদের টাকা কই গেছে? আর তাদের ছাওয়ালরা তোমাদের ভাটার আগুনের সামনে বইসা আছে, কেন? কথার জবাব দিও।লোকটা আর কথা বাড়ালো না। ফিরে যাওয়ার আগে বলল, ভালোই হবে, যদি জমি নিজ থেইকা দিয়া দেন। নইলে জমি কীভাবে নিতে হয়...করিম বাক্স জবাব দিলেন না। মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেন, যেভাবে বহুকাল আগে তার বাপ দাঁড়াতো, বন্যার জল কিংবা খরার নিষ্ঠুরতাকে উপেক্ষা করে।
আরও পড়ুন ফারজানা অনন্যার গল্প: যন্ত্রপতনসেই রাতে গ্রামে খবর ছড়ালো, বাক্সদারে শাসাইয়া গেছে ভাটার লোক। হাশিমন আসলো, তাহেরের বউ আসলো, আরও দুই-চারজন। তারা কিছু বলল না, গিয়ে শুধু উঠোনে খানিক বসে রইলো, যেন নিঃশব্দ পাহারা দিচ্ছে করিম বাক্সকে। করিম বাক্স বুঝলেন, মানুষ যেমন মাটি আঁকড়ে থাকে, মাটিও তেমন মানুষ আঁকড়ে রাখে।
সন্ধ্যায় এলো বেলু।শুনছি বাক্সদা।কী শুনছস?জমি বেচেন নাই।না।বেলু একটু চুপ থাকলো। তারপর বললো, ধন্যবাদ বাক্সদা।ধন্যবাদ কীসের? এইটা আমার জমি। আমি বেচমু কি বেচমু না, সেইটা আমার ব্যাপার।তা ঠিক। কিন্তু বাক্সদা, আপনি শুধু নিজের জন্য বেচেন নাই, তা না?করিম বাক্স বেলুর দিকে তাকালেন। ছেলেটার চোখে একটা গভীরতা আছে। ইটভাটার আগুনের সামনে ঝলসে ঝলসে হয়তো খাঁটি হয়েছে বোধ।তুই কবে বীজ তুলবি?আষাঢ়ে। বৃষ্টি হলে।তারপর?তারপর বুনবো। একটুক জমি পাইলে। কোথাও না কোথাও পাবোই।করিম বাক্স একটু ভাবলেন। তারপর, এমন একটা কথা বললেন যেটা তিনি নিজেও জানতেন না মনের ভেতর জমা ছিল।এই জমিতে বুন।বেলু চমকে উঠলো।বাক্সদা?এই জমিতে বুন বলছি। অর্ধেক তোর, অর্ধেক আমার। ফলন যা হয়, ভাগ করে নেবো।বেলু কিছু বলতে পারলো না। তার চোখ চকচক করে উঠলো, ইটভাটার আগুন নয় বরং অন্য কোনো আলো।বাক্সদা, আপনে...চুপ কর। কাইল থেকে কাজে আয়। জমি পড়ে আছে, চাষ করতে হবে।
রাতে আবার একা বসলেন করিম বাক্স।আকাশে এবার চাঁদ আছে। তার আলোয় জমি দেখা যাচ্ছে। পাঁচ বিঘা। চারদিকে ভাটার ধ্বংসস্তূপ, মাঝখানে এক সবুজাভ মাটির টুকরো।দ্বীপ।দ্বীপের মতো একা। সমুদ্র ঘিরে ফেললে দ্বীপ যেমন তার সবটুকু দৃঢ়তা নিয়ে টিকে থাকে, ঠিক তেমনি।তিনি ভাবলেন, মানুষ কেন জমি বেচে? টাকার জন্য। কিন্তু টাকায় কী পাওয়া যায়? রফিক ঢাকায় আরামে আছে। কিন্তু রফিক কি জানে তার শেকড় কোথায়? রফিকের ছেলে কি জানবে?
মাটি সব রাখে। মাটি ভোলে না।করিম বাক্স হাত দিয়ে এক মুঠো মাটি তুললেন। হাতের তালুতে রাখলেন। চাঁদের আলোয় দেখলেন। এই মাটির কণায় কণায় কত মানুষের শ্রম। কত বছরের ফসল। কত বর্ষার পানি। কত রোদ। কত ঘাম। এই মাটি তিনি বেচবেন না।তিনি মাটি আবার মাটিতে রাখলেন, গভীর মমতায়।
রাত গভীর হচ্ছে। মাটির নিচে বীজ ঘুমায়। কিন্তু ঘুমের ভেতরেও তারা জেগে থাকে, অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তের জন্য যখন মাটি ডাকবে, বৃষ্টি ডাকবে, আলো ডাকবে। তখন তারা ফুটবে। যে মাটিকে পোড়ায়, সে মাটির ভাষা বোঝে না; যে মাটিতে বীজ বোনে, সেই জানে মাটি কথা বলে, ধীরে, নিঃশব্দে, বহু বছরের পুরোনো অক্ষরে। করিম বাক্স আকাশের দিকে তাকালেন। ফুলের মতো ফুটে আছে অজস্র তারা। এই তারার নিচে তার বাপ বসতো, তার দাদা বসতো। একই আকাশ। একই মাটি। মানুষ যায়। মাটি থাকে। আর থেকে যায় বীজের আশ্রয়।
করিম বাক্স উঠে দাঁড়ালেন। ঘরে ফিরলেন। আজ রাতে তার কাছে ঘুম আসবে এক প্রাচীন নিশ্চিন্ততায় ভয় না পেয়ে। যে মানুষ জানে কী রক্ষা করতে হবে এবং কার বিরুদ্ধে, তার ঘুম আর তাকে ছেড়ে যায় না।
আরও পড়ুন ফারজানা অনন্যার গল্প: নিঃশেষে বিভাজ্যএসইউ