মতামত

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমানো গেল না কেন?

রাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকে, তখন ব্যয় কমানোর প্রতিটি উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—কোন ব্যয় কমানো হচ্ছে, কার ব্যয় কমানো হচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত ও ন্যায্য।

Advertisement

সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসে ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তা প্রত্যাহারের ঘটনা আমাদের সামনে এমনই কিছু মৌলিক প্রশ্ন হাজির করেছে। প্রশ্নটি শুধু ২৫ হাজার টাকা কমানো বা না কমানোর নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি তার ব্যয়সংকোচন নীতি বাস্তবায়নে সক্ষম? নাকি সুবিধাভোগী একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে সরকারের সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত নরম হয়ে যায়?

৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসে ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নিতে বলে। চিঠিতে ‘প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’র কথাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পর ১৬ জুলাই নতুন চিঠি দিয়ে জানানো হয়, এই ব্যয় কমানোর উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না; ৫০ হাজার টাকার সুবিধাই বহাল থাকছে।

মাত্র সাত দিনের এই ঘটনাপ্রবাহে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গভীর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সিদ্ধান্ত নেওয়া যত সহজ, তা বাস্তবায়ন করা তত সহজ নয়। বিশেষ করে যখন সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী ও সুবিধাভোগী অংশের স্বার্থে আঘাত করে।

Advertisement

৭ হাজার ২০০ কর্মকর্তার সুবিধা

বর্তমানে উপসচিব বা সমমর্যাদা থেকে তদূর্ধ্ব প্রায় ২ হাজার ৫০০ সরকারি কর্মকর্তা মাসে ৫০ হাজার টাকা করে মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পান। এ সুবিধার আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাও রয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার ২০০ কর্মকর্তা এই সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অর্থাৎ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সুবিধা নয়; রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা। ফলে এই সুবিধা কমানোর উদ্যোগ যে প্রশাসনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা অনুমান করা কঠিন ছিল না।

প্রশ্ন হলো, অর্থ মন্ত্রণালয় কি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই বাস্তবতা বিবেচনা করেছিল? সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল? সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারের মোট কত টাকা সাশ্রয় হবে—তার নির্দিষ্ট হিসাব কি তৈরি করা হয়েছিল?

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমানো গেল না—এটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট প্রশাসনিক ঘটনা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার বড় এক সত্য। সংস্কার শুধু প্রজ্ঞাপনে হয় না; সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দৃঢ়তা, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি—সবকিছুর প্রয়োজন।

Advertisement

খবরে জানা যাচ্ছে, এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা বা অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা ছাড়াই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল। এমনকি সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও এই সিদ্ধান্ত থেকে কত টাকা সাশ্রয় হবে, তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা যায়নি। এখানেই মূল দুর্বলতা।

সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নেওয়া যায় না। এটি হতে হয় তথ্য, হিসাব, প্রভাব মূল্যায়ন ও নীতিগত যুক্তির ভিত্তিতে। অন্যথায় একটি ভালো উদ্যোগও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে চিঠির ভাষা নিয়ে। সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫০-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি আদেশ জ্ঞাপন-সংক্রান্ত চিঠিতে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমনভাবে বিষয়টি উল্লেখ করার বিধান নেই। সেখানে বলতে হয়, ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’

কিন্তু সংশ্লিষ্ট চিঠিতে সরাসরি ‘প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’ থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে শুধু প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্নই ওঠেনি; সিদ্ধান্তের দায়ও যেন ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর বর্তানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখিয়ে ব্যক্তিগত নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত করা প্রশাসনিকভাবে কতটা সঠিক—সেটিও বড় প্রশ্ন।

সিদ্ধান্তের পরিণতি কি অনুমান করা হয়নি?

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি-সুবিধা কমানোর প্রস্তাবের সঙ্গে একই সময়ে সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং পূর্ণ বৃত্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রেষণের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার প্রস্তাবও সামনে আসে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শিক্ষা রয়েছে। একই সময়ে একাধিক সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আগে তার সামগ্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা জরুরি। একটি সিদ্ধান্ত হয়তো এককভাবে যুক্তিসংগত; কিন্তু একসঙ্গে তিনটি সিদ্ধান্ত কোনো একটি গোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করলে তার প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি সুবিধার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ২০১৬ সালে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সরকারি অর্থায়নে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিল—সরকারি গাড়ির বহর, চালক, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার, ওভারটাইম ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানো।

এই নীতির অর্থনৈতিক যুক্তি একেবারে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। একজন কর্মকর্তাকে সরকারি গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণ সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুযোগ দিলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু এই নীতির কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য নিয়মিত ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সেই বিশ্লেষণ কি হয়েছে?

যদি ২০১৬ সালের নীতি সত্যিই সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে থাকে, তবে তার প্রমাণ কোথায়? আর যদি বাস্তবতা বদলে গিয়ে থাকে, জ্বালানি, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে গিয়ে থাকে, তবে নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। নীতি একবার গ্রহণ করা হয়েছে বলেই তা চিরস্থায়ী হতে পারে না। আবার কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি উঠেছে বলেই তা রাতারাতি বাতিলও করা যায় না।

সরকার এখন যে দুটি বিকল্প পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে, সেটিই হওয়া উচিত ছিল শুরুতে। একজন কর্মকর্তাকে সরকারি গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দিলে বছরে সরকারের মোট ব্যয় কত; অন্যদিকে সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারের ব্যয় কত—এই দুই মডেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আমলাতন্ত্রের কাছে নতিস্বীকার?

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি এখানেই। সরকারের একটি সিদ্ধান্ত প্রশাসনের অসন্তোষের মুখে মাত্র সাত দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করা হলো। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিষয়টিকে একশ্রেণির সুবিধাভোগী কর্মকর্তার অন্যায্য প্রভাবের কাছে সরকারের নতিস্বীকার হিসেবে দেখেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দেশের আর্থিক সংকটের মধ্যে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের অসন্তোষের মুখে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ।

এই বক্তব্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ব্যাখ্যা যতটা স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল, তা হয়নি। যদি সিদ্ধান্তটি ভুল হয়, সরকার বলতে পারে—হিসাব-নিকাশে ভুল ছিল, তাই সংশোধন করা হয়েছে। যদি আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকে, তা জানানো যেতে পারে। যদি নতুন পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়, সেটিও বলা যায়।

কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া, স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাকে বদলি করা এবং এরপর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার—এই ধারাবাহিকতা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করে।

একজন যুগ্ম সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কি শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল? যদি না হয়, তাহলে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া কোথায়? প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় কি সব সময় স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার ওপরই বর্তাবে? নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তাদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে প্রশাসনে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়—নীতিগতভাবে বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

ব্যয় কমাতে হলে জনপ্রিয়তা নয়, যুক্তি দরকার

সরকারের ব্যয় কমানোর সুযোগ অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হতে হবে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক। শুধু কর্মকর্তাদের গাড়ি-সুবিধা কমিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয়সংকোচন সম্ভব নয়। সরকারি গাড়ির ব্যবহার, জ্বালানি খরচ, সরকারি ভবন, বিদেশ ভ্রমণ, প্রকল্প ব্যয়, পরামর্শক নিয়োগ, অপ্রয়োজনীয় সভা-সেমিনার, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার—সব খাতের সামগ্রিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।

কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে, কোন ব্যয় অপরিহার্য, কোন ব্যয় কমানো সম্ভব—তার একটি স্বচ্ছ ডেটাবেস থাকা উচিত। প্রতিটি বড় ব্যয়খাতের জন্য নিয়মিত ‘পাবলিক এক্সপেন্ডিচার রিভিউ’ করা যেতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, অডিট বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

গাড়ি-সুবিধার ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন। কেউ যদি সরকারি গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ পান, তাহলে তাকে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? আবার কেউ যদি সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনেন, তাহলে তার প্রকৃত ব্যবহার, কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন ও দায়িত্বের ধরন অনুযায়ী সুবিধা নির্ধারণ করা যায় কি না—তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি হলো, সুবিধা নির্ধারণে পদমর্যাদার পাশাপাশি দায়িত্বের প্রকৃতি, কর্মস্থলের দূরত্ব, মাঠপর্যায়ে কাজের প্রয়োজন এবং সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া।

রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের সেবক—এই কথাটি শুধু বক্তৃতায় উচ্চারিত হলে হবে না; রাষ্ট্রীয় সুবিধা নির্ধারণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের কাজের বাস্তব প্রয়োজনও অস্বীকার করা যাবে না। তাই সমাধান হতে হবে যুক্তিনির্ভর, প্রতিহিংসামুক্ত এবং প্রমাণভিত্তিক।

সরকারের জন্য এ ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যেন প্রশাসনের সঙ্গে অযথা সংঘাত তৈরি না হয়; আবার প্রশাসনিক অসন্তোষের ভয়ে যেন প্রয়োজনীয় সংস্কারও থেমে না যায়। নীতিনির্ধারণে তড়িঘড়ি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকারও রাষ্ট্রের জন্য আরও বিপজ্জনক।

কারণ, আজ যদি ৫০ হাজার টাকার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো না যায় শুধু অসন্তোষের কারণে, কাল অন্য কোনো বড় সংস্কারও একই যুক্তিতে আটকে যেতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে—রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কে নেয়? নির্বাচিত সরকার, নাকি সুবিধাভোগী প্রশাসনিক গোষ্ঠী?

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমানো গেল না—এটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট প্রশাসনিক ঘটনা। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার বড় এক সত্য। সংস্কার শুধু প্রজ্ঞাপনে হয় না; সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দৃঢ়তা, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি—সবকিছুর প্রয়োজন।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই ব্যয় কমাতে চায়, তবে তাকে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর সঠিক সিদ্ধান্তের পথে কেউ অসন্তুষ্ট হলেই যদি সরকার পিছিয়ে যায়, তাহলে একসময় রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্কার আটকে যাবে সুবিধাভোগীদের অদৃশ্য ভেটোর কাছে।

জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রে শেষ কথা বলার অধিকার জনগণের। সরকারি সুবিধা কারও ব্যক্তিগত অধিকার নয়; তা দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা যদি সময়ের সঙ্গে অযৌক্তিক হয়ে ওঠে, তবে তা সংস্কার করতেই হবে। তবে সেই সংস্কার হতে হবে হিসাবের ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে এবং সবার জন্য সমান নীতিতে।

কারণ, রাষ্ট্রের অর্থভান্ডার সীমাহীন নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যয়সংকোচনের সাহস যদি সীমাহীন সুবিধাভোগী চাপের কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংকট শুধু বাজেটে থাকবে না—সংকট তৈরি হবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়ও।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম