নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, ডেনমার্ক
Advertisement
বিশ্বের সুখী ও বাসযোগ্য শহরের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে বরাবরই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। উন্নত জীবনমান, সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতির কারণে শহরটি বারবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হ্যাপি সিটি ইনডেক্সে কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শহর হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। অন্যদিকে ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর গ্লোবাল লিভএবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ টানা দুই বছর বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায়ও শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্কের এই রাজধানী। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন সূচকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ স্কোর পাওয়ায় এই অর্জন।
আরও পড়ুন মালয়েশিয়া ছাড়বো না, এখানকার মানুষ খুব ভালো: রোহিঙ্গার আকুতিকোপেনহেগেনের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো নাগরিকদের পারস্পরিক বিশ্বাস। ডেনমার্ক বিশ্বের অন্যতম কম দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিরাপদ দেশ। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে, অন্যরাও নিয়ম মেনে চলবে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করবে।
Advertisement
এই সামাজিক আস্থার প্রতিফলন দেখা যায় দৈনন্দিন জীবনেও। অনেক ডেনিশ পরিবার শিশুকে স্ট্রলারে রেখে ক্যাফে বা দোকানের বাইরে কিছু সময়ের জন্য রেখে যায়—যা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে বিস্ময়কর হলেও ডেনমার্কে নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
গোধূলিলগ্নে- কোপেনহেগেনের ঐতিহ্যবাহী নিহাউন/ছবি: নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর
ডেনিশ জীবনধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স। এখানে দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় না। বরং পরিবার, অবসর, ব্যক্তিগত সময় এবং মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের শিক্ষা, যা নাগরিকদের জীবনকে আরও নিশ্চিন্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে।
Advertisement
টিবলি পার্ক কোপেনহেগেন - বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম পার্ক/ছবি: নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর
কোপেনহেগেন বিশ্বের অন্যতম সাইকেলবান্ধব শহর। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন কাজে সাইকেল ব্যবহার করেন। বৃষ্টি, ঠান্ডা কিংবা তুষারপাত—কোনো কিছুই তাদের এই অভ্যাস থেকে বিরত রাখতে পারে না।
এই সাইকেল সংস্কৃতি একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমায়, অন্যদিকে নাগরিকদের সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
ডেনিশদের সুখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো (হুগে)। এটি এমন একটি জীবনদর্শন, যেখানে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তে স্বস্তি, উষ্ণতা ও আনন্দ খুঁজে নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, এক কাপ কফি নিয়ে শান্ত বিকেল উপভোগ করা কিংবা ঘরের আরামদায়ক পরিবেশে সময় কাটানো—এসবই ডেনিশদের কাছে সুখী জীবনের অংশ।
কোপেনহেগেনে, মিডসামার ইভ উদযাপনের দৃশ্য/ছবি: নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর
ডেনমার্কে বছরের বড় একটি সময় ঠান্ডা ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়া থাকে। তবে ডেনিশদের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ—‘খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, খারাপ পোশাক আছে।’
এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের বাস্তববাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং সেটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই তাদের জীবনধারার অংশ।
কোপেনহেগেন আধুনিক নগর পরিকল্পনার পাশাপাশি ঐতিহ্যকেও সমানভাবে ধারণ করেছে। বিশ্বের জনপ্রিয় খেলনা লেগো-এর জন্ম ডেনমার্কে। ১৯৩২ সালে ওলে কির্ক ক্রিস্টিয়ানসেন প্রতিষ্ঠা করেন এই ব্র্যান্ড, যা আজ বিশ্বজুড়ে শিশু ও বড়দের কাছে সমান জনপ্রিয়।
পোস্টবায়েন টাওয়ার্স, কোপেনহেগেন/ছবি: নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর
এছাড়া ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত টিভোলি গার্ডেন্স বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিনোদন পার্ক, যা এখনো কোপেনহেগেনের সংস্কৃতি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোপেনহেগেনের সাফল্যের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। উন্নত অবকাঠামো, নিরাপদ নগরজীবন, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা, সামাজিক আস্থা, কার্যকর জনসেবা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সমন্বিত মডেলই শহরটিকে বিশ্বের অন্যতম সুখী ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করেছে।
দিনের কোলাহল শেষে, কোপেনহেগেনের শান্ত রাতের নির্জনতা/ছবি: নুরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর
বিশ্বের অনেক শহর যখন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন কোপেনহেগেন দেখিয়েছে—একটি শহরের প্রকৃত সাফল্য শুধু আকাশচুম্বী ভবন বা বড় অর্থনীতিতে নয়; বরং তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, সুস্থ, স্বস্তিতে এবং সুখে জীবনযাপন করছেন, সেটিই আসল মানদণ্ড।
এমআরএম