মতামত

নিউ হোস্টেল: তারুণ্যের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ

(পূর্ব প্রকাশের পর-৮ম পর্ব)

Advertisement

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াকালীন থাকতাম লাকসাম রোডস্থ ‘নিউ হোস্টেলে’। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হলে যা হয়—অন্তত সেই সময় নামেই এটি নিউ হোস্টেল, কিন্তু কাজে ছিল ওল্ড। শেওলাপড়া দেওয়াল, ফুটো চাল, অন্যান্য অবকাঠামো—সবই ছিল বেশ পুরোনো। দুপুর-রাতে গরুর গাড়ি নিয়ে মেথর আসত পায়খানার ময়লা সংগ্রহে; পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। তবে শান্তির ঠিকানা ছিল শানবাঁধানো ঘাটসমেত পুকুরটি। এর পূর্ব পাড়ে ছিল পাকা ঘাট, দুই পাশে পাকা বেঞ্চ। সেই শানবাঁধানো ঘাটে ঘুমের ঘোর কাটাতে রাতবিরাতে আড্ডা আর বাঁশির সুরে গান গাওয়া—‘পুবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও, কাবার পথে বইয়া; যাওরে বইয়া, এই গরিবের সালামখানি লইয়া...।’ এদিকে দরজা-জানালা বন্ধ করে খুব সিরিয়াস ছাত্ররা থাকত পড়াশোনায় মহাব্যস্ত।

হোস্টেলের দক্ষিণ-পূর্বে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের জন্য নির্মিত ঘাঁটি থেকে রূপান্তরিত কুমিল্লা বিমানবন্দর। তখন একটি মাত্র ফ্লাইট চলত শর্ট ল্যান্ডিং অ্যান্ড টেক-অফ বা ‘স্টল’ সার্ভিস নামে। হোস্টেলের দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল ব্রিটিশ আমলের টমসন ব্রিজ, আর একটু পশ্চিমে ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী ও প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠিত ‘সবিতা মিশন আশ্রম’, যা পরে ‘অভয় আশ্রম’ নামে পরিচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মহাত্মা গান্ধী এটি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন বলে শুনেছিলাম। ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খাদি আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল এই অভয় আশ্রম।

নিউ হোস্টেলের হোস্টেল সুপার ছিলেন অঙ্কের অধ্যাপক রজব আলী স্যার। দেখতে খাটো, মিশমিশে কালো এবং অতি সাধারণ হলেও অঙ্কে ছিলেন অসাধারণ। মাঝেমধ্যে শার্লক হোমসের মতো গোয়েন্দা মন নিয়ে, এমনকি লুঙ্গি পরেই, জানালায় উঁকি মেরে দেখতেন তাঁর ছেলেরা পড়াশোনা করছে কি না। একদিন ‘গোপন ভিজিটে’ এসে দেখলেন, এক রুমে চারজন তাস খেলছে আর ছয়জন তামাশা দেখছে। বাসায় গিয়ে চটজলদি তাদের ডেকে পাঠিয়ে উষ্মাভরে বললেন, ‘পড়ার সময় তাস খেল! লজ্জা করে না? জান না, তাস হচ্ছে নাশ? তোমাদের আমি বহিষ্কার করে দেব।’ বলে উঠতে উদ্যত হলেন। সবচেয়ে দুষ্ট এবং নাটের গুরু বলল, ‘স্যার, না হয় বুঝলাম তাসে নাশ, কিন্তু বের করে দিলে তো সর্বনাশ!’ ছেলেটির দিকে কটমট করে তাকিয়ে স্যার বললেন, ‘আচ্ছা যাও, এবারের মতো মাফ করে দিলাম।’

Advertisement

নিউ হোস্টেলে সাক্ষাৎ পাই স্কুলজীবনের সিনিয়র শহিদুল্লাহ ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আগত আহমেদ ফারুকের। শহিদুল্লাহর মধ্যে শিবরাম চক্রবর্তীর মতো নিজেকে নিয়ে মশকরা করার প্রবণতা ছিল। যেমন বলত, ‘আরে, আমাদের আবার কী কেরিয়ার—জাস্ট টিফিন কেরিয়ার!’ আহমেদ ফারুক ছিল ফিটফাট, কেতাদুরস্ত। টেডি প্যান্ট, টেটরনের শার্ট পরিহিত। তার ও শহিদুল্লাহর রুমে একটি গ্রামোফোন ছিল, যা সারাদিন, চাইকি সারারাতও বাজত। আহমেদ ফারুকের মধুর কণ্ঠ আর আমাদের হেঁড়ে গলা মিলে গান গাইতে গাইতে লাকসাম রোড ধরে কলেজে যাতায়াত করতাম—‘ঝুঁঠ হ্যায় ইয়ে সাড়ি নাগরী, ঝুঁঠা হ্যায় ইয়ে সংসার... লুট লিয়া মেরা পিয়ার।’

একবার খাওয়াদাওয়া আর সিনেমা দেখে তিনজন এমন ফতুর হলাম যে, ভোলানাথের লজিক বই বিক্রি করে আহমেদ ফারুকের বাড়ি ফেরার টিকিট কিনতে হয়েছিল। এখন বুঝি, হিন্দি সিনেমার থ্রি ইডিয়টস-এর মতো আমরা ছিলাম ‘থ্রি স্টুপিডস’; তবে আমির খানের চরিত্রগুলোর মতো সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত ছিলাম না।

নিউ হোস্টেলে পাওয়া পরমপ্রিয় বন্ধু, পরবর্তীকালে রিয়ার অ্যাডমিরাল আজাদ—সুঠামদেহী, চৌকস, মেধাবী এবং সংবেদনশীল। অল্প কথা বলত, মুখে থাকত স্মিত হাসি। কত বিকেল হাঁটতে হাঁটতে অভয় আশ্রম পর্যন্ত যাওয়া, খেলা দেখা এবং গল্প করা। তার প্রাণের কাছাকাছি খুব কম বন্ধুদের মধ্যে আমি ছিলাম একজন। এখনো সে আমার খোঁজখবর নেয়। ধনে-মানে সুখের সংসার তার। দুহাতে আংটি ও গলায় সোনার চেন পরিহিত ধনী পরিবারের ছেলে খুরশিদ রাত দেড়টা-দুটায় ঘুম থেকে জাগিয়ে রিকশায় তুলে দুই-তিন মাইল দূরের রেলস্টেশনের আমানিয়া (বা ইমানিয়া) রেস্টুরেন্টে পুডিং খাওয়াতে নিয়ে যেত। দুর্ঘটনায় সে জীবন হারিয়েছে, কিন্তু রেখে গেছে একরাশ স্মৃতি।

অবশেষে এইচএসসি চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল বেরোল এবং আমি কলা বিভাগে প্লেস পেয়ে উত্তীর্ণ হলাম। এমনকি পত্রিকায় আমার নামও উঠল। আব্বা আম্মাকে বললেন, ‘এই দেখ, আমার ছেলে পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেছে।’ আনন্দিত আম্মা হেসে উত্তর দিলেন, ‘খারাপ ফল করলে আমার ছেলে, আর ভালো ফল করলে আপনার ছেলে—ঠিক না?’

Advertisement

সেই সময়ের নিউ হোস্টেলের পূর্ব ব্লকের শুরুতেই ছিল চারজনের জন্য ১৪ নম্বর রুম। আমার অবস্থান ছিল পূর্ব পাশের জানালার কাছে। জানালা খুললেই মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ দিগন্ত। উপভোগ করতাম দক্ষিণ চরথা থেকে একের পর এক মাইকে ভেসে আসা, ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত বিভিন্ন সিনেমার গান—‘পরাণে দোলা দিল এ কোন ভোমরায়...’, ‘পিয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’, ‘আপলাম চাপলাম চাপলাই রে...’। অথবা নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবির সংলাপ—‘বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি...’, ‘মির জাফর আলী খাঁ, আপনি শুধু সেনাপতি নন, আত্মীয়ও বটে...’, ‘কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে, কে তাকে শোনাবে জাগরণের হে অভয়বাণী...’, ‘এ কী, তোমার চোখে জল কেন, গোলাম হোসেন?’

প্রায় প্রতিদিনই ওখানে বিয়ে লেগে থাকত। বলা বাহুল্য, গানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যখন হাওয়া খাওয়া যেত না, তখন জানালা বন্ধ করে নিমীলিত চোখে পড়া মুখস্থ করা ছাড়া উপায় থাকত না।

কান্দিরপাড়ের লিবার্টি, চকবাজারের রূপালী কিংবা মাঝপথের রূপকথা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা ছিল প্রায় নিয়মিত—বেশির ভাগই নাইট শো, মাঝেমধ্যে ম্যাটিনি মারা। আমাদের দেখা ছবিগুলো ছিল নিরেট সামাজিক ছবি—‘বেহুলা’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘রূপবান’ ইত্যাদি। ধূমধাড়াক্কা মারামারি ছিল না; খুব বেশি হলে কিল-ঘুষি বা ভিলেনের হাতে একখানা ফল কাটার ছুরি। সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষাই ছিল বেশি। ‘রূপবান’ সিনেমার টিকিট কিনতে গিয়ে জামা ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা চিত্রনায়িকা সুজাতাকে এক পলক দেখার উন্মাদিত উৎসাহ এখনও স্মৃতির আখরে আখ্যান হয়ে আছে। ওপারের উত্তম-সুচিত্রা আর এপারের রহমান-শবনম, কবরী-রাজ্জাক, কবরী-সুভাষ দত্ত, সুজাতা-আজিম প্রভৃতি জুটি মগজ দখল করে রাখত। উর্দু ছবির ‘চকলেট নায়ক’ খ্যাত ওয়াহিদ মুরাদ, বলবান দেহের ‘আবেগী নায়ক’ মোহাম্মদ আলী, তাঁদের সঙ্গে জেবা, নায়ার সুলতানা এবং হিন্দি ছবির দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, ওয়াহিদা রহমান, শর্মিলা ঠাকুর, মালা সিনহা ও ‘দুঃখের রানি’ খ্যাত মীনা কুমারী হৃদয়ে এমনভাবে গেঁড়ে বসেছিলেন যে পড়াশোনা লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছিল। তবে যে রাঁধতে জানে, সে চুলও বাঁধতে জানে—বলে বেঁচে গিয়েছিলাম।

তখন অর্থের একমাত্র উৎস ছিল আব্বার বেতন। প্রতি মাসে দেবীদ্বার থেকে কুমিল্লায় এসে কোনো রেস্তোরাঁয় ছানার সন্দেশ খাইয়ে হাতে টাকা তুলে দিতেন। এমনিতে প্রথম বিভাগ মিস করেছি, বৃত্তি পাব কোথায়? সেই সময় এইচএসসিতে নিয়ম ছিল প্রথম বর্ষে প্রথম পত্রগুলোর পরীক্ষা দিয়ে রাখা যাবে, যা পরবর্তীতে চূড়ান্ত পরীক্ষায় দ্বিতীয় পত্রের নম্বরের সঙ্গে যোগ হবে। অবশ্য প্রথম পত্রে খারাপ করলে দ্বিতীয় বর্ষে আরেকবার সুযোগ ছিল। তবে যারা প্রথম বর্ষে বৃত্তি পায়নি, শুধু তারাই ভালো ফলের জন্য এককালীন কিছু টাকা বৃত্তি হিসেবে পেত। আমি কী মনে করে যেন পরীক্ষাটা দিলাম এবং যত দূর মনে পড়ে, বৃত্তিহীন (বিত্তহীন নয়) যতজন এ পরীক্ষা দিয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হয়েছিলাম। ওই খরার সময়ে এককালীন ৯০০ টাকা বৃত্তি পাওয়া ছিল এক পশলা বৃষ্টির মতো। মনে পড়ে, প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

কিন্তু বৃত্তির সেই ৯০০ টাকা পেতে আমাকে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল, চাইকি আঙুলও বাঁকা করতে হয়েছিল। গল্পটা তাহলে বলেই ফেলি।

টাকাটা দেবে ডিসি অফিস। দেবীদ্বার থেকে ২৭ মাইল বাসে করে এসে ডিসির পেশকারের কাছে শুনতে হতো—আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু, পরশু নয় তরশু। বুঝতে বাকি রইল না, তিনি কেন আমাকে ঘুরাচ্ছেন। এর মধ্যে তিনিই আবার আমার আর্থিক অনটন দেখে বৃত্তির টাকার বিপরীতে কিছু টাকা ধার দিলেন, নাস্তা-পানিও খাওয়ালেন। এমন করতে করতে একসময় দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেল, আমি সরাসরি ডিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললাম, বৃত্তির ৯০০ টাকা না পেলে আমার ঢাকায় গিয়ে অনার্স পড়া হবে না। ডিসি সাহেব তাৎক্ষণিক সেই লোককে ডেকে এনে ধমকের সুরে নির্দেশ দিলেন, ‘ওর টাকা নিয়ে আসুন।’ তারপর আমাকে বললেন, ‘আপনি এখানেই বসুন।’ টাকা এলো, আমি বাঁচলাম।

তখনকার কুমিল্লার ডিসি ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের, ধবধবে গায়ের রঙের ও দীর্ঘদেহী এ. এইচ. এস. কে. সাদেক। পরবর্তীকালে তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬–২০০১) শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। বলা দরকার, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের সূচনা তাঁর সময় থেকেই। জাবিতে আমার কোষাধ্যক্ষ, প্রো-ভিসি এবং ভিসি হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কুশীলবের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। বস্তুত, আমার লেখা বই উপাচার্য উপাখ্যান তাঁকেই উৎসর্গ করা।

অবশেষে এইচএসসি চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল বেরোল এবং আমি কলা বিভাগে প্লেস পেয়ে উত্তীর্ণ হলাম। এমনকি পত্রিকায় আমার নামও উঠল। আব্বা আম্মাকে বললেন, ‘এই দেখো, আমার ছেলে পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেছে।’ আনন্দিত আম্মা হেসে উত্তর দিলেন, ‘খারাপ ফল করলে আমার ছেলে, আর ভালো ফল করলে আপনার ছেলে—ঠিক না?’

স্ট্যান্ড করা ছাত্রদের পত্রিকায় নাম ওঠা স্বাভাবিক। তবে আমার নাম আব্দুল বায়েসের জায়গায় ছাপা হয়েছিল ‘আব্দুল কায়েস’। জীবনে একবারই ছেলের নাম পত্রিকায় উঠল, তাও ভুল নামে। আব্বার এই আফসোস অনেক দিন ছিল।

(চলবে)

লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম