সাহিত্য

উদয় রহমানের গল্প: অতিলৌকিকতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্ব

ফারজানা অনন্যা

Advertisement

বাংলা ছোটগল্পের হাল আমলের প্রবাহে হঠাৎ যেন একটা ভিন্ন স্রোত এসে মিশেছে। তার নাম উদয় রহমান। তার গল্প পড়তে বসে প্রথমেই যে অনুভূতিটা হয়, তা হলো এই লেখক গল্প বলছেন না। তিনি যেন কোনো এক গোপন সমীকরণ খুলে দেখাচ্ছেন। যে সমীকরণের একপাশে বসে আছে আমাদের চেনা মধ্যবিত্ত জীবন, অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা আর অতিলৌকিক শক্তি। যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের চিরায়ত গণ্ডিকে উল্টে দেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তার তিনটি গল্প ‌‘সুর’, ‘ঘুম’ আর ‘দুঃখবিলাস’ পাশাপাশি রেখে পড়লে বোঝা যায়, বাংলা কথাসাহিত্যে একজন সত্যিকারের তারকার আবির্ভাব ঘটছে। যার কলমে চেনা মধ্যবিত্ত জীবন আর অচেনা অতিলৌকিকতা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানবমনস্তত্বের সূক্ষ্ম জটিলতার চিত্র অঙ্কনে তৎপর।

‘সুর’ গল্পে এক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার তার মায়ের পুরোনো হারমোনিয়াম সারাতে গিয়ে আবিষ্কার করে নবাবপুরের এক রহস্যময় কারিগরকে। যিনি বলেন পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্র একদিন বাঁধা হতো ৪৩২ হার্টজে, আর যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে সেই মান বদলে ৪৪০ হার্টজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মানুষকে ভেতরে ভেতরে অস্থির রাখার জন্য। ‘ঘুম’ গল্পে এক অঙ্ক শিক্ষক তেরো বছর ধরে দুটো সমান্তরাল জীবনে বেঁচে আছেন। এক জগতে সে ঢাকার ব্যাংক কর্মকর্তা, স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সংসারী; আরেকটিতে সিলেটের হাওরপাড়ের স্কুলমাস্টার। যেখানে তার মৃত মা এখনো জীবিত। ‘দুঃখবিলাস’ গল্পে বেকার যুবক আত্মহত্যার প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখা পায় রহস্যময় ব্যবসায়ীর। যে দুঃখ কিনে নেয়, বদলে দেয় অতীত ইতিহাস আর প্রতিদানে দেয় নগদ টাকা ও মিথ্যা সুখের সংসার। তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট, ভিন্ন পেশা, অথচ তলদেশে বইছে একই অনুসন্ধিৎসা। মানুষ যখন নিজের ভেতরের ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করতে চায়; তখন সে আসলে কী মূল্য দেয়, সেই মূল্য শেষ পর্যন্ত তাকে কতটা রিক্ত করে তোলে।

বাংলা সাহিত্যে অতিবাস্তবতার চর্চা নতুন কিছু নয়। কিন্তু উদয় রহমানের হাতে এই ধারা যে রূপ নিয়েছে, তা রীতিমতো স্বতন্ত্র একটা কণ্ঠস্বর তৈরি করে ফেলেছে। যাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও তাঁর অনুসারীদের জাদুবাস্তবতা লোকজ পুরাণ আর গ্রামীণ কল্পনার গায়ে বোনা। বাংলা গল্পসাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, শাহাদুজ্জামান প্রমুখের লেখায় মার্কেজীয় ম্যাজিক রিয়ালিজমের সুস্পষ্ট ছাপ থাকলেও উদয় রহমান সরাসরি সেই পথে হাঁটেননি। তার অলৌকিকতা আসে পরিমাপযোগ্য জগৎ থেকে; কম্পাঙ্ক, তরঙ্গ, সমান্তরাল বাস্তবতা কিংবা লেনদেনের অর্থনীতি। তার গল্পের অলৌকিকতাকে জাদুবাস্তবতা কিংবা পরাবাস্তবতার সাথে একেবারেই মেলানো যায় না। এই অলৌকিতার জন্ম বাস্তবতার রূঢ় গর্ভেই। তার গল্পের জাদুবাস্তবতায় আছে প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের ছোঁয়া। যা তাকে অন্যান্য লেখক থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। তার তিনটি গল্পেই এ প্রবণতা বিদ্যমান।

Advertisement

একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের গল্পে যখন হার্টজের সংখ্যা নিয়ে তর্ক ওঠে কিংবা দুই জীবনের মানুষের গল্পে যখন ‘সিস্টেম এরর’-এর ভাষা ব্যবহৃত হয়, তখন বোঝা যায় এই লেখক অলৌকিকতাকে রূপকথার কুয়াশা থেকে টেনে এনে বসিয়ে দিচ্ছেন প্রযুক্তির যুগের যুক্তি কাঠামোর ভেতরে। ফলে পাঠকের বিশ্বাস অর্জনের কাজটা তিনি করেন এক অদ্ভুত কৌশলে। তিনি বৈজ্ঞানিক বা আধা-বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রলেপ দিয়ে অতিলৌকিক দাবিকে এমনভাবে মুড়ে দেন, যাতে পাঠক ঠিক প্রত্যাখ্যান করতেও পারে না, আবার সরল বিশ্বাসও করে না। এই দোদুল্যমানতাই তার গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। তার চরিত্ররা প্রায়ই নিজেদের বিশ্বাসের ব্যাপারে সতর্ক, তারা জানে তাদের কথার মধ্যে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসের ভাগ বেশি। এই আত্মসচেতনতাই লেখাকে প্রচারবাক্য হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করে।

আরও পড়ুন গল্পগুলো একটা সুতোয় বাঁধার কাজ চলছে: উদয় রহমান

উদয় রহমানের গল্পভুবনে ঘুরেফিরে যে জিনিসটা আসে, তা হলো বিনিময়ের ধারণা। কিছু একটা দিয়ে কিছু একটা পাওয়া, আর সেই পাওয়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হারানোর বীজ। এই বিনিময় কখনো হয় সরাসরি, চুক্তির ভাষায়; কখনো হয় প্রতীকী, দুটি সমান্তরাল বাস্তবতার একটাকে বেছে নেওয়ার নিষ্ঠুর শর্তে। যা লক্ষণীয়, এই বিনিময়ব্যবস্থায় লাভের অঙ্কটা কখনোই সরল নয়। যে চরিত্র সবকিছু পেয়ে যায়, সে আবিষ্কার করে প্রাপ্তির ভেতরে একটা ফাঁপা জায়গা থেকে যায়। কারণ যা অর্জন না করে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে আত্মার কোনো সংযোগ তৈরি হয় না। ‘দুঃখবিলাস’ গল্পের কথক এই দর্শনকে প্রায় একটা নৈতিক সূত্রে দাঁড় করান, ‘অকারণে কিছু পাওয়া আর অর্জনের মধ্যে যে ফারাক, সেই ফারাকটার নাম আত্মা।’ একটি বাক্যেই ধরা পড়ে যায় লেখকের গোটা জগৎদৃষ্টির সারাংশ। প্রকৃত সুখ কেনা যায় না, কারণ কেনা জিনিসে অনুভূতির শেকড় থাকে না। এই ভাবনা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে হুট করে ধনী হওয়া, চটজলদি সাফল্য, আর ভেতরে ভেতরে ফাঁপা হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। লেখক সেই সামাজিক বাস্তবতাকে অতিলৌকিক আধারে ঢেলে দিয়ে তাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছেন।

শব্দ এবং কম্পনকে তিনি প্রায় দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। মানুষের ভেতরের অস্থিরতা, শান্তি, স্মৃতি; সবকিছুকেই তিনি কম্পাঙ্কের ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। এটা নিছক পরিভাষাগত কৌশল নয় বরং এর পেছনে একটা গভীরতর বিশ্বাস কাজ করে। শরীর আর মহাবিশ্বের মধ্যে একটা অদৃশ্য সংযোগরেখা আছে, যা আধুনিক নগরজীবন ক্রমাগত ছিন্ন করে চলেছে। শহরের কোলাহল, স্ক্রিনের আলো, তাড়াহুড়োর ছন্দ; এসবই তার গল্পে একধরনের ‘বেসুরা’ জীবনযাপনের প্রতীক হয়ে ওঠে। যার বিপরীতে দাঁড় করানো হয় প্রকৃতির ছন্দ, আজানের সুর, মায়ের গলার স্বর। ‘সুর’ গল্পের অন্যতম চরিত্র সুরাইয়ার সংলাপে উদয় রহমান তার এই অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটান, ‘বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে।... আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে।’ নগরজীবন ও প্রকৃতির সুরের এই দ্বন্দ্ব নিছক নস্টালজিয়া নয় বরং এটা একটা সমালোচনা, আধুনিকতার বিরুদ্ধে নয় বরং আধুনিকতার সেই দিকটার বিরুদ্ধে যা মানুষকে তার নিজের ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তার গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্ররা প্রায় সব সময় নগর মধ্যবিত্তের চেনা প্রতিনিধি। যেমন- ঘুম গল্পের ব্যাংক কর্মকর্তা, সুর গল্পের প্রকৌশলী ও দুঃখবিলাস গল্পের বেকার স্নাতক। ‘দুঃখবিলাস’ গল্পের শুরুতেই নির্মম হিসাব-নিকাশ উঠে আসে ‘কাফনের কাপড় আটশো টাকা, কবরের জায়গা বারো হাজার, বাবা রেখে গিয়েছিলেন একটা মোটরসাইকেল, নয় লাখ টাকার ঋণ’। এই বাক্যগুলো নিছক পটভূমি নির্মাণ নয় বরং মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত বাংলাদেশের একটা চেনা যন্ত্রণাকে ঠিক তার আসল রূঢ়তায় তুলে ধরে। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের বোঝা কাঁধে নেওয়া বেকার তরুণ, আত্মীয়দের কটাক্ষ, প্রেমের ব্যর্থতা, টাকার অভাব; এসব আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। লেখক সামাজিক এই বাস্তবতাকে অতিলৌকিক আধারে ঢেলে দিয়ে তাকে আরও তীক্ষ্ণ, আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছেন।

Advertisement

উদয় রহমান তার গল্পের চরিত্রের পেশাকে নিছক পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করেন না বরং গল্পের কেন্দ্রীয় রূপকল্পের সঙ্গে জৈবিকভাবে বেঁধে দেন। যে মানুষ শব্দ নিয়ে কাজ করে, তার সংকটও শব্দেরই দর্শনে গাঁথা হয়; যে মানুষ হিসাবের জগতে বাস করে, তার জীবনও দুটি হিসাবের খাতায় ভাগ হয়ে যায়। এই কাঠামোগত সংগতি লেখকের নৈপুণ্যের একটা বড় প্রমাণ। পেশা এখানে নিছক পটভূমি নয় বরং গল্পের যুক্তিকাঠামোর মেরুদণ্ড। তার গল্পের পার্শ্বচরিত্রদের মধ্যেও একটা অভিন্ন সুর ধরা পড়ে, বিশেষত মাতৃচরিত্রের প্রতি লেখকের গভীর টান। মায়ের অনুপস্থিতি, মায়ের ফিরে আসা বা মায়ের নীরব প্রজ্ঞা—এই মোটিফ তার গল্পভুবনে বারবার ফিরে আসে প্রায় একটা অবচেতন কেন্দ্রবিন্দুর মতো। এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, লেখকের গল্পগুলোর গভীরতম স্তরে একটাই মৌলিক হাহাকার সক্রিয়, তা হলো যা হারিয়েছি, তা কি সত্যিই ফিরে পাওয়া সম্ভব, আর ফিরে পেলেও তা কি আগের মতোই ‘খাঁটি’ থাকে?

আরও পড়ুন উদয় রহমানের ভাইরাল গল্প ‌‘সুর’ নিয়ে কেন তোলপাড়

এ পর্যন্ত উদয় রহমানের প্রকাশিত তিনটি গল্পই তিনি লিখেছেন উত্তমপুরুষে এবং আমার ধারণা তার এই পছন্দটা নিছক আঙ্গিকগত নয়। উত্তমপুরুষের বয়ান পাঠককে বাধ্য করে কথকের চোখ দিয়ে দেখতে, তার সংশয়, তার অপরাধবোধ, তার আত্মপ্রতারণার মধ্য দিয়ে হাঁটতে। ফলে গল্পগুলো অনেক সময় স্বীকারোক্তির চরিত্র নেয়, যেন কথক নিজের অতীতের একটা অংশ পাঠকের সামনে মেলে ধরে বিচার চাইছে, অথবা অন্তত সাক্ষী চাইছে। এই স্বীকারোক্তিমূলক সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেখক প্রায়ই পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করেন, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, উত্তর না দিয়ে বাক্য শেষ করেন। এই কৌশল গল্পকে একটা নৈতিক উন্মুক্ততা দেয় যে সিদ্ধান্তের ভার লেখক একা বহন করেন না, পাঠকের কাঁধেও কিছুটা চাপিয়ে দেন।

উদয় রহমানের গদ্যে একটা লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো; দুই স্তরের ভাষার সহাবস্থান। কথকের নিজস্ব বয়ান সাধারণত প্রমিত, নাগরিক, ইংরেজি-মিশ্রিত আধুনিক বাংলায় লেখা; যা তার পেশাগত পরিচয় আর নাগরিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু যখনই তার গল্পে প্রবীণ কারিগর, গ্রামের মা, রহস্যময় প্রতারক বা প্রান্তিক চরিত্ররা কথা বলেন, তখনই তাদের মুখে বসে যায় প্রাণবন্ত আঞ্চলিক উচ্চারণ, যার তাল আর ছন্দ লেখক অসাধারণ দক্ষতায় চরিত্রে আরোপ করেন। এই ভাষাগত বৈপরীত্য নিছক সাজসজ্জা নয়; এটা প্রায় একটা রাজনৈতিক অবস্থান। প্রজ্ঞা আর শেকড়ের সংযোগ যেন লোকজ কণ্ঠেই বেশি অবিকৃত থেকে যায়, আর প্রমিত নাগরিক ভাষা প্রতিনিধিত্ব করে সেই মানুষদের, যারা নিজের শেকড় থেকে দূরে সরে গেছে। পাশাপাশি তার গদ্যে প্রবচনধর্মী পঙ্‌ক্তির প্রতি একটা স্বাভাবিক টান আছে। ছোট ছোট বাক্যে দার্শনিক উপলব্ধিকে স্ফটিকের মতো জমিয়ে ফেলার ক্ষমতা তার আছে, যা পাঠককে গল্পের গতির মধ্যেই থমকে ভাবতে বাধ্য করে।

গঠন কাঠামোর দিক থেকে উদয় রহমানের গল্পগুলো প্রায়ই একটা বৃত্তাকার নকশা অনুসরণ করে। শুরুর দৃশ্যে যে চিত্রকল্প বা অভ্যাস উপস্থাপিত হয়, গল্পের শেষে সেটাই ফিরে আসে, কিন্তু ততক্ষণে তার অর্থ আমূল বদলে গেছে। এই কৌশল পাঠকের কাছে একটা গভীর তৃপ্তি তৈরি করে। কারণ শুরুতে যা নিছক অভ্যাসের বর্ণনা মনে হয়েছিল, শেষে তা হয়ে ওঠে গোটা গল্পের দার্শনিক ভার বহনকারী প্রতীক। মাঝেমধ্যে তিনি সচেতনভাবে পুনরাবৃত্তির আশ্রয় নেন। একই দৃশ্য ও একই সংলাপ দুইবার হাজির করেন, যা প্রথম দর্শনে খাপছাড়া মনে হলেও আসলে গল্পের ভেতরকার বাস্তবতা-জোড়ের ধারণাকে জোরালো করে তোলে। যেমন ‘ঘুম’ গল্পে ঘুম ভাঙার পর ছাদ দেখার একটা সাধারণ অভ্যাস দিয়ে গল্প শুরু হয়, সেই একই অভ্যাসেই তা শেষ হয়। কিন্তু প্রথমবার যা ছিল নিছক রুটিন, শেষবার তা হয়ে ওঠে একটা অপূরণীয় ক্ষতির স্মারক। ‘দুঃখবিলাস’ গল্পে ফ্লাইওভারের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ট্রাক গোনার দৃশ্য দিয়ে গল্প আরম্ভ হয়, সেই একই দৃশ্যে তা ফিরে আসে, কিন্তু প্রথমবারের গণনা ছিল মৃত্যুর দিকে যাত্রা, শেষবারেরটা জীবন বেছে নেওয়ার এক দুঃসহ দ্বিধা। উদয় রহমানের এই মেটাফিকশনাল সচেতনতা প্রমাণ করে যে, লেখক নিছক গল্প বলছেন না, গল্প বলার প্রক্রিয়া নিয়েও ভাবছেন।

আমার সমালোচকের সততা দাবি করে যে এসব শক্তির পাশাপাশি কিছু ঝুঁকির কথাও বলা দরকার। কখনো কখনো তার চরিত্ররা দীর্ঘ দার্শনিক ভাষণে নেমে পড়ে, যা গল্পের নাটকীয় গতিকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়। ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, প্রভৃতি সবকিছু একসূত্রে গাঁথার আকাঙ্ক্ষা লেখকের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা, কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো গল্পের চেয়ে প্রবন্ধের কাছাকাছি চলে যায়। এ ছাড়া তার ব্যবহৃত কিছু রূপকল্প, যেমন সমান্তরাল বাস্তবতা, আত্মা-বিনিময়ের চুক্তি, বৈশ্বিক জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ইতিমধ্যে বহুচর্চিত, ফলে তাদের মৌলিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এই চেনা কাঠামোগুলোকে তিনি যেভাবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনের নির্দিষ্ট বুনটে, স্থানীয় ভূগোলে আর ভাষার নিজস্ব ছন্দে প্রোথিত করেছেন, সেখানেই তার নিজস্বতার আসল প্রমাণ।

আরও পড়ুন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জীবনে দরিদ্রতা

উদয় রহমানকে পড়া মানে এক ধরনের অস্বস্তিকর আয়নার সামনে দাঁড়ানো। তিনি অতিবাস্তবতাকে ব্যবহার করেন পালানোর পথ হিসেবে নয় বরং বাস্তবতার গভীরে পৌঁছানোর একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্র হিসেবে। মাত্র তিনটি গল্প দিয়েই যে লেখক একটি সংহত, স্বতন্ত্র জগৎদৃষ্টি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, তাকে নিঃসংকোচে বলা যায় বাংলা কথাসাহিত্যের একজন সত্যিকারের সম্ভাবনাময় গল্পকার। তার ভাষা প্রাত্যহিক অথচ কাব্যিক, তার গঠন সচেতন অথচ আবেগঘন, তার চরিত্ররা প্রতীকী হয়েও রক্তমাংসের মানুষ থেকে যায়। বাংলা গল্পের জগতে বাস্তব আর অতিলৌকিকের মাঝখানের যে সরু, বিপজ্জনক রেখা, তিনি সেই রেখা ধরে হাঁটছেন সতর্ক অথচ সাহসী পায়ে। আর সেই হাঁটার শব্দটাই বলে দেয়, বাংলা কথাসাহিত্যে একটা নতুন, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর জন্ম নিচ্ছে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।

এসইউ