মানুষ যখন সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন কোনো না কোনো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে নিয়েছে। সেখান থেকেই ধর্মের আবির্ভাব। মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামে কারও না কারও সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে, এখনও হয়। অসহায় মুহূর্তে অদৃশ্য এক শক্তির প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আস্থার নামই ধর্ম। শত-সহস্র বছর ধরে এই বিশ্বাস মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশ হয়ে আছে।
Advertisement
প্রায় সাড়ে পাঁচ শ বছর আগের একটি কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এমনই এক ধর্মীয় স্থাপনাকে আমরা নির্ধারণ করে রেখেছিলাম আমাদের এ যাত্রার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে।
স্টিফান—বসনিয়ান বংশোদ্ভূত আমাদের গাইড ও চালক। একটি আধুনিক মিনিবাস নিয়ে আমাদের ১২ জনের পারিবারিক ভ্রমণের পথপ্রদর্শক তিনিই। সাবলীল ইংরেজিতে কথা বলেন। ১৯৯১ সালের অস্থির সময়ে তাঁর জন্ম। শৈশবে যুদ্ধের বিভীষিকায় তাঁদের পরিবার ঘরছাড়া হয়েছিল। আজও তাঁর মা সেই যুদ্ধের স্মৃতি মনে করে প্রার্থনা করেন—পৃথিবীর আর কোথাও যেন যুদ্ধ না হয়।
আমাদের ভ্রমণসূচি আগে থেকেই তাঁর কোম্পানির কাছে পাঠানো ছিল। তাই গাইড হিসেবে প্রতিটি পর্যটনস্থলের ইতিহাস, দেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি যুগোস্লাভিয়ার সাবেক নেতা জোসিপ ব্রজ টিটোর প্রশংসা করে বলছিলেন, সমাজতান্ত্রিক টিটোই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একত্রে ধরে রেখেছিলেন এবং দেশকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। অথচ এর আগের দিন বসনিয়ায় আমাদের গাইড ইয়াশ টিটোর সমালোচনা করেছিলেন। ইতিহাসও বলছে, ১৯৮০ সালে টিটোর মৃত্যুর পর জাতিগত উত্তেজনা ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে এবং ১৯৯১ সাল থেকে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। বসনিয়া যুদ্ধ ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সেই যুদ্ধের পরই ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, উত্তর মেসিডোনিয়া, স্লোভেনিয়া এবং পরে মন্টেনেগ্রোসহ একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
Advertisement
দ্বীপটির চারদিকে কালো পাহাড় যেন নীরবে পাহারা দিচ্ছে। অথচ ছোট্ট সেই দ্বীপজুড়ে মানুষের ভিড়, চারদিকে কোলাহল। সামনে, পেছনে, ডানে-বাঁয়ে শুধু জল আর জল। দুলছে ছোট ছোট নৌকা। কখনও মনে হচ্ছিল, যদি একটু একা হয়ে যাই, ঢেউ যেন আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্রের অনন্ত সীমান্তে।
ডুব্রোভনিক থেকে আমরা সেদিন নাশতা না করেই খুব ভোরে রওনা দিয়েছিলাম, যাতে সীমান্তে দীর্ঘ যানজট এড়ানো যায়। সকাল ছয়টার সূর্য তখনও খুব প্রখর হয়ে ওঠেনি, কিন্তু বাতাসে গরমের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছিল। আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছিল মন্টেনেগ্রোর দিকে।
সীমান্তে পৌঁছানোর আগে স্টিফান একটি ছোট্ট, পরিচ্ছন্ন পাহাড়ি হোটেল—Holiday-তে বিরতি দিলেন। পাহাড় কেটে তৈরি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হোটেলটিতে লিফটে উঠে ওপরে যেতে হয়। সেখানে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে দূরের নীল সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।
মন্টেনেগ্রো সত্যিই এক বিস্ময়ের দেশ। চারদিকে শুধু পাহাড়, যেন পুরো দেশটাই একটি বিশাল পর্বত। পাহাড়ের বুকজুড়ে সবুজ বন, আর মাঝেমধ্যে হাজার বছরের পুরোনো পাথুরে স্তর যেন পাহাড়গুলোকেই পাহারা দিচ্ছে। দেশটির নামই এসেছে ইতালীয় শব্দ Monte Negro থেকে, যার অর্থ ‘কালো পাহাড়’। এখানকার সমুদ্র আর পর্বত যেন যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুই চিরন্তন প্রেমিক—একজন স্থির, অন্যজন নিরন্তর ছুটে চলেছে।
Advertisement
ইউরোপের ছোট্ট এই দেশটিও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতিহাস বহন করে। তবে ২০০৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর মন্টেনেগ্রো দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আধুনিক অবকাঠামো, সমুদ্রঘেঁষা মসৃণ সড়ক, প্রাণবন্ত পর্যটনকেন্দ্র—সব মিলিয়ে দেখে বোঝার উপায় নেই, দেশটি এত অল্প সময় আগে স্বাধীন হয়েছে। সমুদ্রতটে আধুনিক ইয়ট, বিশাল ক্রুজ জাহাজ আর পর্যটকদের কোলাহলে মুখর শহরগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে এই চাকচিক্যের মাঝেও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী এখনও কাজের সন্ধানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যান। মন্টেনেগ্রো এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, যদিও তারা ইউরো মুদ্রা ব্যবহার করে।
সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আরও চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম পর্যটকদের প্রিয় ছোট্ট শহর পেরাস্টে। সেখান থেকে জনপ্রতি ১৫ ইউরো দিয়ে টিকিট কেটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে ছোট মোটরচালিত নৌকায় উঠলাম। ইঞ্জিনের শব্দ আর ঢেউয়ের দোলায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য—Our Lady of the Rocks-এ।
সমুদ্রের বুকের ছোট্ট কৃত্রিম দ্বীপ। তার মাঝখানে একটি ক্যাথলিক গির্জা, আর গির্জার ভেতরেই একটি ছোট কিন্তু সমৃদ্ধ জাদুঘর। মন্টেনেগ্রোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও পর্যটনকেন্দ্র এটি। ইউনেসকো-স্বীকৃত Bay of Kotor অঞ্চলের অংশ হিসেবে এর গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃত।
স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, ১৪৫২ সালের ২২ জুলাই দুইজন জেলে সমুদ্রের মাঝখানে একটি পাথরের ওপর ভার্জিন মেরি ও শিশু যিশুর একটি আইকন খুঁজে পান। তাঁরা ঘটনাটিকে অলৌকিক বলে বিশ্বাস করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন, যেখানে এই আইকনটি পাওয়া গেছে, সেখানেই একটি গির্জা নির্মাণ করবেন।
এরপর প্রতিটি সফল সমুদ্রযাত্রার শেষে তাঁরা সেখানে একটি করে পাথর ফেলতে শুরু করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, অনেক পুরোনো নৌকাও ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের এই প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সমুদ্রের বুকে একটি কৃত্রিম দ্বীপ। সেই দুই জেলে হয়তো এর পূর্ণ রূপ দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস একদিন সত্যিই একটি দ্বীপ, একটি গির্জা এবং একটি জাতীয় ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে।
আজও ক্যাথলিক বিশ্বাসীদের কাছে এটি নাবিকদের রক্ষাকারী পবিত্র স্থান। সমুদ্রযাত্রার আগে অনেকেই এখানে এসে প্রার্থনা করেন, নিরাপদ ভ্রমণের আশীর্বাদ চান। শতাব্দী পেরিয়েও সেই ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।
দ্বীপে নেমেই আমরা দেখলাম দীর্ঘ লাইন। পর্যটকেরা একজন একজন করে জাদুঘরে প্রবেশ করছেন। আমরাও লাইনে দাঁড়ালাম। ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে শত শত বছরের সামুদ্রিক ইতিহাস, নাবিকদের দান করা মূল্যবান সামগ্রী, সোনালি বেদি, বারোক স্থাপত্যশৈলী, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Tripo Kokolja-এর আঁকা দেয়ালচিত্র এবং বহু ঐতিহাসিক ধর্মীয় নিদর্শন।
দ্বীপটির চারদিকে কালো পাহাড় যেন নীরবে পাহারা দিচ্ছে। অথচ ছোট্ট সেই দ্বীপজুড়ে মানুষের ভিড়, চারদিকে কোলাহল। সামনে, পেছনে, ডানে-বাঁয়ে শুধু জল আর জল। দুলছে ছোট ছোট নৌকা। কখনও মনে হচ্ছিল, যদি একটু একা হয়ে যাই, ঢেউ যেন আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্রের অনন্ত সীমান্তে।
প্রতি বছর ২২ জুলাই এখানে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত Fašinada উৎসব। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক, ধর্মীয় তীর্থযাত্রী, ইতিহাস গবেষক ও স্থাপত্যপ্রেমীরা এ সময় এখানে ভিড় করেন। আমাদের ভ্রমণ ছিল তার ঠিক আগের দিন। এমনিতেই জায়গাটি অত্যন্ত ব্যস্ত। তার ওপর প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ২২ জুলাই ছিল আমাদের ম্যানচেস্টারে ফেরার আগের দিন। তাই সচেতনভাবেই আমরা সেই বিশাল আয়োজন এড়িয়ে গিয়েছিলাম।
অর্থনৈতিকভাবে মন্টেনেগ্রো ক্রোয়েশিয়ার সমপর্যায়ে না হলেও, আমার কাছে দেশটি প্রতিবেশী বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার তুলনায় অনেক বেশি পর্যটননির্ভর ও সুশৃঙ্খল মনে হয়েছে। দেশটির জিডিপির একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। Bay of Kotor এবং Our Lady of the Rocks সেই আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
এই ছোট্ট দ্বীপকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য কর্মসংস্থান। স্থানীয় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, স্যুভেনিরের দোকান, শিল্পকর্মের বাজার, নৌকা পরিবহন ও ট্যাক্সিসেবা—সবকিছুই পর্যটকদের ঘিরে বিকশিত হয়েছে। ফলে পেরাস্ট শহরের অর্থনীতি অনেকটাই এই পর্যটন কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মন্টেনেগ্রোর পরিচিতি ও ব্র্যান্ডিংয়েও এই দ্বীপের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভিত্তি যদিও ধর্মীয় বিশ্বাস, কিন্তু কালের পরিক্রমায় Our Lady of the Rocks শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় দ্বীপ হয়ে থাকেনি। এটি আজ মন্টেনেগ্রোর ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামুদ্রিক ঐতিহ্য এবং জাতীয় পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। ভার্জিন মেরিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস এখনও স্থানীয় মানুষের জীবনের অংশ। একই সঙ্গে এই দ্বীপ দেশের পর্যটনশিল্পকে সমৃদ্ধ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক মূল্য এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এটি আজ মন্টেনেগ্রোর অন্যতম মূল্যবান জাতীয় সম্পদ।
প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় দ্বীপে কাটিয়ে আমরা আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। বাইরের প্রচণ্ড গরম পেছনে ফেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির শীতল হাওয়ায় আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মন্টেনেগ্রোর ঐতিহাসিক কোটর শহরের বিখ্যাত Old Town-এর উদ্দেশে আবারও যাত্রা শুরু হলো।
এইচআর/এএসএম