কখনো কখনো একটি গান তার সুরের সীমানা অতিক্রম করে সময়ের ভাষা হয়ে ওঠে। কোনো গান প্রেমের, অথচ একদিন তা হয়ে যায় প্রতিবাদের; কোনো গান ব্যক্তিগত আবেগের, অথচ হঠাৎ তা ধারণ করে নেয় বহু মানুষের সম্মিলিত অভিমান। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’—চার দশক আগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই গানটি ২০২৬ সালের শ্রাবণে যেন তেমনই এক নতুন অর্থে ফিরে এসেছে।
Advertisement
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে, তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছেন, পেছনে বাজছে জনপ্রিয় গানটি। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় সমালোচনা, কটাক্ষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং নৈতিকতার নামে সামাজিক বিচার। একটি ব্যক্তিগত ভিডিও কীভাবে জনসমালোচনার বিষয় হয়ে উঠল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। বরং সেখান থেকেই শুরু হয়েছে অন্য এক গল্প। বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গান ব্যবহার করে রিল তৈরি করতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যে গানটি একজন নারীর ব্যক্তিগত প্রকাশভঙ্গিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, সেটিই পরিণত হয় সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীকে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই প্রতিবাদ কোনো মিছিলের মাধ্যমে হয়নি, কোনো ব্যানার হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হয়নি, কোনো দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে হয়নি। মানুষ গানকে বেছে নিয়েছে। নিজেদের ছবি ও ভিডিওকে বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিবাদ এসেছে সেই একই মাধ্যম ব্যবহার করে, যেখান থেকে আক্রমণ শুরু হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই চরিত্র নতুন নয়। একসময় জনমত তৈরি হতো চায়ের দোকানে, রাজনৈতিক সভায়, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে। এখন জনমতের একটি বড় অংশ তৈরি হয় ফেসবুকের নিউজফিডে। একটি ছবি, একটি ভিডিও, একটি হ্যাশট্যাগ কিংবা একটি গান কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের অভিন্ন অনুভূতির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু তথ্য আদান-প্রদানের জায়গা নয়; এটি সম্মিলিত পরিচয়, সংহতি ও প্রতিবাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
Advertisement
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’—এই গান ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটিও হয়তো আমাদের জন্য তেমন একটি বৃষ্টির মুহূর্ত। এই বৃষ্টি যদি আমাদের সামাজিক অসহিষ্ণুতা ধুয়ে দিতে পারে, যদি অন্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা শেখাতে পারে, যদি নারীর পোশাক ও প্রকাশভঙ্গিকে বিচার করার প্রবণতা কমাতে পারে, তবে একটি রিলকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
বিউটি রানী পালের ঘটনাটি তাই নিছক একটি রিলের ঘটনা নয়। এর ভেতরে রয়েছে আমাদের সমাজের একটি গভীর অসুখ—অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশের প্রবণতা। আমরা প্রায়ই মনে করি, কেউ যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁর ওপর মন্তব্য করার অধিকারও যেন আমরা পেয়ে গেলাম। যেন তাঁর পোশাক, চেহারা, হাঁটার ভঙ্গি, হাসি, গান শোনা কিংবা নিজেকে প্রকাশের ধরন—সবকিছুর ওপর সমাজের একটি অদৃশ্য আদালত বসে গেছে।
এই আদালতের বিচারক কে? আমরা সবাই। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই আদালতে কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, কোনো শুনানি হয় না, অভিযুক্তের বক্তব্য শোনার প্রয়োজন হয় না। একটি ভিডিও দেখেই রায় হয়ে যায়। কয়েকটি মন্তব্যেই চরিত্র নির্ধারিত হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষকে সামাজিকভাবে অপমানিত করার আয়োজন সম্পন্ন হয়।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার নারীরা। একজন পুরুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওকে আমরা যেভাবে দেখি, একজন নারীর ভিডিওকে সেভাবে দেখি না। নারীর পোশাক, শরীর, চুল, হাসি, চলন—সবকিছুর ওপর সামাজিক নজরদারি যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি শিক্ষক হলে প্রত্যাশার বোঝা আরও বেড়ে যায়। যেন শিক্ষক হলেই তিনি মানুষ নন, তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতে পারে না, আনন্দ থাকতে পারে না, সৌন্দর্যবোধ থাকতে পারে না, গান ভালো লাগতে পারে না।
Advertisement
অথচ একজন শিক্ষকও একজন মানুষ। তাঁর পেশাগত দায়িত্ব আছে, অবশ্যই আছে। বিদ্যালয়ে তাঁর আচরণ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর নৈতিকতা—এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা অবশ্যই আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের পেশাগত দায়িত্ব আর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে এক করে ফেলা ন্যায়সংগত নয়।
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এই বিতর্কে মন্তব্য করে বলেছেন, গান গাওয়া অন্যায় নয় এবং ভিডিওটিতে অশ্লীলতা দেখেন না। জনপ্রিয় গানটির শিল্পী মেজবাহ রহমানও বলেছেন, বিষয়টি নমনীয়ভাবে দেখা উচিত এবং এ কারণে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সমীচীন নয়। এই বক্তব্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় পদে থাকা কেউ যখন সামাজিক উন্মাদনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যুক্তির কথা বলেন, তখন তা অনেক সময় প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করে। তবে প্রশ্ন হলো—এমন ঘটনায় প্রতিবার কি কোনো মন্ত্রীকে এসে বলতে হবে যে গান গাওয়া অন্যায় নয়? প্রতিবার কি কোনো শিল্পীকে বলতে হবে যে একটি ভিডিওতে নেতিবাচক কিছু নেই? আমাদের কি এতটাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে হবে যে স্বাভাবিক আনন্দের পক্ষেও রাষ্ট্রীয় ব্যাখ্যা প্রয়োজন হবে?
একজন নারী শাড়ি পরে বাতাসে হাঁটলেন। পেছনে একটি গান বাজল। এই ঘটনাকে আমরা কীভাবে দেখব, তা আসলে আমাদের নিজেদের সামাজিক মানসিকতার আয়না। আমরা কি একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখব, নাকি তাঁর পেশা, লিঙ্গ, পোশাক ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর ব্যক্তিগত আচরণের জন্য আলাদা আলাদা নৈতিক বিধি তৈরি করব?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যে শিক্ষিকাকে কটাক্ষ করা হয়েছিল, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন অন্য শিক্ষিকারা। তাঁরা নিজেদের ভিডিও তৈরি করেছেন। এটি কেবল সংহতি নয়; এটি এক ধরনের ডিজিটাল নাগরিক প্রতিরোধ। তাঁদের বক্তব্য যেন এমন—‘তুমি একজনকে অপমান করলে আমরা সবাই দৃশ্যমান হব।’
এই দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একাকিত্ব। একজন মানুষকে যখন হাজারো অচেনা মানুষ আক্রমণ করে, তখন তিনি নিজেকে একা মনে করেন। তাঁর পাশে কেউ নেই—এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়। কিন্তু যখন একই ধরনের হাজারো মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়ান, তখন আক্রমণের শক্তি কমে যায়। ব্যক্তিগত অপমান পরিণত হয় সম্মিলিত প্রতিরোধে।তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রতিবাদের মধ্যেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কটাক্ষের জবাব কটাক্ষ দিয়ে, অপমানের জবাব অপমান দিয়ে কিংবা এক ধরনের নৈতিক পুলিশিংয়ের জবাবে আরেক ধরনের নৈতিক পুলিশিং দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মতের ভিন্নতা থাকবে। কেউ কোনো ভিডিও পছন্দ নাও করতে পারেন। কেউ সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু সমালোচনা আর ব্যক্তিগত আক্রমণ এক নয়। মতামত আর হয়রানি এক নয়। প্রশ্ন তোলা আর চরিত্রহনন এক নয়।
বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিং নিয়ে গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও হয়রানির ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলা ভাষার অনলাইন পরিসরে সাইবার বুলিং শনাক্তকরণ নিয়ে গবেষণা দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন আক্রমণের ধরনও জটিল হয়ে উঠছে। তাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের শুধু ‘কে ঠিক, কে ভুল’—এই সরল প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। আমাদের আরও বড় প্রশ্ন করতে হবে—কেমন সমাজ আমরা তৈরি করছি? এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন মানুষ নিজের মতো করে হাসতে, গান শুনতে, ছবি তুলতে কিংবা ভিডিও বানাতে ভয় পাবেন? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের অমিল থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত মর্যাদার সীমারেখা অতিক্রম করা হবে না?
শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও জরুরি। আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে নৈতিকতা চাই, দায়িত্বশীলতা চাই, আদর্শ চাই। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষককে মানুষ হিসেবে দেখার দায়িত্বও আমাদের আছে। তাঁরা যন্ত্র নন। তাঁদেরও আনন্দ আছে, দুঃখ আছে, ব্যক্তিগত রুচি আছে, অবসর আছে, সৌন্দর্যবোধ আছে। একজন শিক্ষক গান শুনলে বা একটি রিল বানালে তাঁর শিক্ষকসত্তা বিলীন হয়ে যায় না। বরং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনই তাঁকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শৃঙ্খলা আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়। নৈতিকতা আর নৈতিক পুলিশিং এক জিনিস নয়। সামাজিক মূল্যবোধ আর ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপও এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যগুলো বুঝতে না পারলে আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করব, যেখানে সবাই অন্যের জীবন নিয়ে কথা বলবে, কিন্তু নিজের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন থাকবে।
শ্রাবণের মেঘ তাই কেবল আকাশে জমে না; মানুষের মনেও জমে। কখনো তা জমে অবদমিত রাগ হয়ে, কখনো অপমানের স্মৃতি হয়ে, কখনো সামাজিক ভয়ের ছায়া হয়ে। কিন্তু মেঘের একটি স্বভাব আছে—একসময় তা বৃষ্টি হয়ে নামে। সেই বৃষ্টি কখনো শীতল করে, কখনো নদী ভাসায়, কখনো জমে থাকা ধুলো ধুয়ে দেয়।
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’—এই গানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটিও হয়তো আমাদের জন্য তেমন একটি বৃষ্টির মুহূর্ত। এই বৃষ্টি যদি আমাদের সামাজিক অসহিষ্ণুতা ধুয়ে দিতে পারে, যদি অন্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা শেখাতে পারে, যদি নারীর পোশাক ও প্রকাশভঙ্গিকে বিচার করার প্রবণতা কমাতে পারে, তবে একটি রিলকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ অন্যের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের পাহারাদার? নাকি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে একজন নারী বাতাসে আঁচল উড়িয়ে হাঁটতে পারেন, একজন শিক্ষক গান শুনে আনন্দ পেতে পারেন, একজন নাগরিক নিজের মতো করে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন—আর আমরা তাঁকে অপমান না করে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি?
শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হোক। কিন্তু সেই মেঘ যেন অন্ধকারের নয়, বৃষ্টির বার্তা নিয়ে আসে। আমাদের ভেতরের সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, কটাক্ষ আর অকারণ বিচারবোধ ধুয়ে যাক। মানুষ যেন মানুষকে একটু বেশি মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার কত কঠোর নৈতিক বিধি আছে, তা নয়; বরং সে কতটা মানবিকভাবে অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে পারে, সেটিই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এএসএম