দেশজুড়ে

৮ বছর পর মামলা আদালতে উঠেছে, এবার খুনিদের বিচারের অপেক্ষা

‘দীর্ঘ ৮ বছর পর যখন মামলা আদালতে উঠেছে- আশা রাখছি আসল খুনিদের বিচার হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে বিনীত অনুরোধ, আমার নিরীহ স্বামীকে যারা নৃশংসভাবে খুন করেছেন- তাদের বিচার যেন জনসম্মুখে হয়। দেশ ও বিশ্ববাসী জানুক আমার স্বামী নিরপরাধ, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

Advertisement

কক্সবাজারের টেকনাফে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কাউন্সিলর ও টেকনাফ যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া হিসেবে রোববার (২৬ জুলাই) হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন। এটি জানার পর প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিক্রিয়ায় প্রয়াত একরামের স্ত্রী আয়েশা খানম এসব মন্তব্য করেছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আলোচিত এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করে প্রসিকিউশন।

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, নিহত একরামের স্ত্রী আয়েশা খানম আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ বছর পর যখন মামলাটি আদালতে উঠেছে, এবার খুনের পরিকল্পনাকারী ও জড়িতরা বিচারের মুখোমুখি হবেন বলে আশা করতে পারি। ঘটনায় সম্পৃক্তরা সর্বোচ্চ সাজার আওতায় আসবেন। একজন সহজসরল মানুষ তার হত্যার বিচার পাবেন। আমার মেয়েদেরও এমনটি আশা।

তিনি বলেন, ‘ফিল্মের মতো, ফোনের একপ্রান্তে বাবাকে গুলির শব্দ শোনার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে গোংড়ানোর আওয়াজ শোনা কতটা বেদনার তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে। সেই ট্রমা নিয়ে বাবা হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছে আমাদের দুই মেয়ে। দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার স্বামী ও তাদের বাবার হত্যার বিচার চাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায় নয়। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তিনি মামলাটি আমলে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

Advertisement

২০১৮ সালে সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে একই বছরের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ রোডের নোয়াখালীপাড়া এলাকায় র‍্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনবারের কাউন্সিলর একরামুল হক। ওই ঘটনার পর ‘ঠান্ডা মাথায়’ একরামুলকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তার স্ত্রী আয়েশা খানম।

ওই বছরের ৩১ মে কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি (একরামুলের স্ত্রী) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। সেইসঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের সময় সেলফোনে রেকর্ডকৃত কথোপকথনের কিছু রক্ত হিম করা অডিও ক্লিপ গণমাধ্যমকর্মীদের দিয়েছিলেন তিনি। যার মধ্যে একটি রেকর্ডে বন্দুকের ট্রিগার টানার শব্দ শোনা যায়। এরপর গুলির শব্দ ও তারপর একজন মানুষের গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যায়। যা নিহত একরামেরই শব্দ ছিল। এটি নেট দুনিয়ায় প্রচার পাওয়ার পর মানবিক সকলের হৃদয় ব্যাকুল করেছিল।

এদিকে একরাম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন জমার মাধ্যমে অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নেওয়ার পর গণমাধ্যমের কাছে এক মন্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিই টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মেরে ফেলার ছক কষেছিলেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই মামলার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ বিভিন্ন সারকামস্টেন্সিয়াল এভিডেন্সের (পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য) ভিত্তিতে সেখানে আমাদের সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি হিসেবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আবদুর রহমান বদি, সেখানকার একজন কুখ্যাত…আমরা সংসদ সদস্য বলতে লজ্জাবোধ করছি। উনি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তার মেটিকুলাস ডিজাইনেই, এই বদির পরিকল্পনায় এই ঘটনাটা ঘটেছিল।

Advertisement

চিফ প্রসিকিউটরের মতে, কারণ এই একরাম ছিল তার প্রতিপক্ষ এবং এটাও আপনাদেরকে একটু অবহিত করে রাখি- এটা পরবর্তীতে হয়তো সাক্ষ্য-প্রমাণে আসবে, আপনারা দেখবেন যে একরামকে হত্যা করার পর তার সম্পত্তি কিন্তু এই বদি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিল এবং নেপথ্যের নায়ক ছিল সেই আবদুর রহমান বদি।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের তরফে রোববার সকালে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এদিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এছাড়া অন্য মামলায় গ্রেফতার থাকা তিনজনকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের একজন টেকনাফের এক সময়ের এমপি আবদুর রহমান বদি।

প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের এসব বয়ান বিষয়ে আয়েশা খানম বলেন, আমি যা বলতে চেয়েও পারিনি সেসব কথাই বলেছেন প্রসিকিউটর। আমার বাবার কোটি টাকার সম্পদ দখলের পর পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক ও জনপ্রিয় কাউন্সিলর একরামকে পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাধররা।

একরাম হত্যা মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান।

আসামিদের নাম উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, এদের বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে তাদের সম্পৃক্ততা, তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাদের কাছে রিপোর্ট সাবমিট করে। সেই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আজকে তাদের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দিয়েছি এবং সেই ফরমাল চার্জের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মাননীয় ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন।

সেখানে বেশ কয়েকজন আসামি এরই মধ্যে গ্রেফতার আছে, তাদেরকে শোন অ্যারেস্ট করা হয়েছে এবং যারা পলাতক আছে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেওয়া হয়েছে। সেই মামলাটিও আগামী ২৫/৮/২৬ তারিখে আপনার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আপনারা জানেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার-তারা যে মতের মানুষই হোক না কেন, যখনই তাদের মতের বিরুদ্ধে আচরণ করত; তখনই তাদেরকে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে টার্গেট করে অপহরণ করা হত, পরবর্তীতে তাদেরকে কাউকে আয়নাঘরে বন্দি করা হত অথবা কাউকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হত।

এরকমই একটি ঘটনা হচ্ছে আমাদের তৎকালীন কাউন্সিলর একরাম হত্যা মামলা। যেখানে একরামের মোবাইল ফোনটা সুইচ অন ছিল এবং সেই সুইচ অন থাকা অবস্থায় তার মেয়েরা এবং তার স্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডের এই যে গুলির…মানে ফায়ারিংয়ের আওয়াজ, তার পরে একরামের যে কথোপকথন- এগুলা সব শুনতে পাচ্ছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামি রুহুল আমিন ও আশেকুর রহমান তারা সরাসরি গুলি করেন। আর মিফতাহ উদ্দিনসহ অন্যান্য র‍্যাব কর্মকর্তারা, যারা তখন ওই স্পটে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের তত্ত্বাবধানে, তাদের পরিকল্পনায় ওখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

শুধু তাই না, এই ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এবং শেখ হাসিনা এই ঘটনা যাতে আর বাড়াবাড়ি না হয়, এটা নিয়ে যাতে কোনো রকমের উচ্চবাচ্য না করে, সে কারণে একরামের স্ত্রীকে শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে বলেছিল যে, এটা নিয়ে যাতে আর বাড়াবাড়ি না করে, তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে র‌্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক। পরে র‌্যাবের বিজ্ঞপ্তিতে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ এবং ‘ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার’ আখ্যায়িত করে বলা হয়েছিল, একরামের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

একরামুলের ভাই এহসানুল হক বাহাদুর তখন বলেছিলেন, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের পরিচয় দিয়ে সাধারণ পোশাকের কিছু লোক ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার ভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। তারা জানায়, জমি বিক্রির ব্যাপারে একরামুলের সঙ্গে কথা বলতে চায় তারা। পরে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একরামুলের নিহত হওয়ার খবর পান। পরে একরামের মৃত্যুর সময়কার একটি অডিও প্রকাশ পেলে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগ ওঠে, র‌্যাব পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে।

একরামকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এএসএম