খেলাধুলা

গোলের নেশায় দারিদ্র্যকে হার মানাতে ছুটছে স্মৃতি কিসকো

ম্যাচ শুরু হতেই চোখ চলে গেল তার দিকে। সময় যত গড়িয়েছে, দৃষ্টি আটকে থেকেছে তার পায়ের কাছেই। রাজশাহীর ডি-বক্সে কিংবা তার আশপাশে বল পেলেই যেন আলাদা এক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছিল। পাশ থেকে কেউ বলে উঠলেন, ‘এ তো একেবারে ফক্স ইন দ্য বক্স।’ সত্যিই তাই। আদর্শ নাম্বার নাইনের মতোই সুযোগ পেলেই গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। নতুন কুঁড়ির বালিকা ফুটবলের ফাইনালে এমনই এক ‘ফক্স’-এর দেখা মিলল। রংপুর অঞ্চলের ৯ নম্বর জার্সিধারী সেই ফুটবলারের নাম স্মৃতি কিসকো।

Advertisement

গতকাল সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে রাজশাহী অঞ্চলকে ৪-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় রংপুর। দলের চার গোলের দুটি আসে স্মৃতি কিসকোর পা থেকে। পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতে নিয়েছেন তিনি। আসরজুড়ে একের পর এক গোল করে আলো কেড়েছেন এই নবম শ্রেণির ছাত্রী। মাঠে তাকে দেখে মনে হয়, জীবন বুঝি শুধুই হাসিমুখে দৌঁড়ে চলার গল্প। কিন্তু সবুজ ঘাসের বাইরের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

আরও পড়ুন আগামী মাসেই শুরু হচ্ছে ‘প্রাইম মিনিস্টার্স কাপ’ ফুটবল টুর্নামেন্ট

ছোট বয়সেই বাবাকে হারিয়েছেন স্মৃতি। সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন মায়ের কাঁধে। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেই কোনোভাবে সংসার চালান তিনি। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, শ্বশুরবাড়িতেই তার নতুন জীবন। তাই মাঠে গোল করে হাজারো মানুষের করতালি পাওয়া মেয়েটির বাড়ি ফিরলে অপেক্ষা করে সংগ্রামের এক অন্য গল্প। যে বয়সে অনেকের সবচেয়ে বড় চিন্তা স্কুলের পরীক্ষা, সেই বয়সেই স্মৃতিকে লড়তে হচ্ছে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। তবু দারিদ্র্য কিংবা কষ্ট তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি।

তবে মাঠে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করা কিসকো, মাইক্রোফোনের সামনে এসে হয়ে গেলেন একেবারে শান্ত। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাননি স্মৃতি। তবে কণ্ঠে ছিল পরিশ্রমের তৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘ভালো। চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ভালো খেলেছি। এখন ভালো লাগছে যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। রংপুর থেকে এতদূর এসেছি, চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, খুব ভালো লাগতেছে।’

Advertisement

ফুটবলের সঙ্গে তার পরিচয়ও হয়েছে খুব ছোটবেলা থেকেই। রংপুরের একাডেমিতেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। সেখানেই থাকা, খাওয়া, অনুশীলন সবকিছু। নতুন কুঁড়ি শুরু হওয়ার আগেও নিয়মিত অনুশীলন করতেন সেখানে। স্মৃতির ভাষায়, ‘শুরুটা আমার বাসার ওদিক দিয়ে। আমি একাডেমিতে থাকি। ওখানে প্র্যাকটিস করি, ওখানে থাকি, ওখানে সব করি। ওখানে প্র্যাকটিস ভালো হয়।’ নতুন কুঁড়ির আগেও সেই একাডেমিতেই প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সংসারে বাবার অনুপস্থিতি ছোটবেলাতেই কিসকোকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। মা অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তবুও পরিবারের সমর্থনের কথা বলতে গিয়ে হাসি ফুটে ওঠে স্মৃতির মুখে।

তিনি বলেন, ‘পরিবার থেকে অনেক ভালো সাপোর্ট দেয়। অনেক।’ এরপর যোগ করেন, ‘আমার বাবা নাই। মা কৃষি কাজ করে।’ পরিবারের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমার মা কৃষিকাজ করেই চালায়। আমরা তো দুই বোন। আমার বড় দিদি আছে, বিয়ে হয়েছে। এখন তো স্বামীর বাড়ি থাকে। আমার মা থাকে বাড়িতে আর আমি তো একাডেমিতে থাকি।’ বড় বোনও তাকে উৎসাহ দেন, ‘হ্যাঁ, সাপোর্ট দেয় আমার দিদি। আমার ভাই নাই। দিদি আর তার স্বামীর সাপোর্ট আমার জন্য বড় পাওয়া।’

বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন কিসকো। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার জারুল্লাপুর স্কুলের ছাত্রী তিনি। ফুটবলের পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। তার খেলার ধরন অনেকের নজর কেড়েছে। ডি-বক্সের ভেতরে সুযোগ বুঝে অবস্থান নেওয়া, গোলের গন্ধ পেলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। সব মিলিয়ে হয়ে উঠছেন আদর্শ একজন স্ট্রাইকার। এর পেছনে কৃতিত্ব দিচ্ছেন একাডেমির কোচদের। স্মৃতি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার প্র্যাকটিস হয় ওরকমই। আমাদের শিখায় ওরকমই কোচ। আমরা ওভাবে শিখছি, ওভাবে আমরা খেলছি।’

Advertisement

তবে শুধু দারিদ্র্য নয়, লড়তে হয়েছে সমাজের মানসিকতার সঙ্গেও। আশপাশের মানুষ প্রায়ই বলতেন মেয়েদের ফুটবল খেলা মানায় না। কিন্তু মা আর মেয়ে দুজনই সেই কথায় কান দেননি। স্মৃতি বলেন, ‘হ্যাঁ, বলে যে মেয়ে মানুষ ফুটবল খেলা যায় না, ওটা করা যায় না, এটা করা যায় না। আমার মাও শোনে না মানুষের কথা, আমিও শুনি নাই। না শুনে তো এখানে আসছি।’

এমনকি এত বড় সাফল্যের কথাও শুরুতে মাকে জানাতে পারেননি। পরে কোচের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে কল করেছেন। আক্ষেপ করেই বলছিলেন, ‘মোবাইল না থাকায় মায়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে পারি না। অনেকদিন পরপর কথা হয়। আজকেও মাকে শুরুতে কল দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিজের তো আর মোবাইল নেই!’ কথাগুলো বলতে বলতে যেন মায়ের কথা মনে পড়াতেই চোখটা ছলছল করে উঠলো কিসকোর।

আরও পড়ুন নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ফুটবল / বালক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন সিলেট, বালিকায় রংপুর

 একাডেমির আবাসিক জীবনই এখন কিসকোর ঠিকানা। বাড়ি থেকে দূরে থাকলেও সেখানে কোনো কিছুর অভাব অনুভব করেন না। কারণ কোচ মিলন মিয়া শুধু প্রশিক্ষক নন, অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেন। একাডেমির খরচের প্রসঙ্গে স্মৃতি বলেন, ‘একাডেমিতেই থাকি। আবাসিক ব্যবস্থা আছে। ওখানে আমাদের কোচ মিলন স্যার (মিলন মিয়া) খাওয়ায়। উনিই আমাদের সব দেখভাল করেন। ওনার কারণেই আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’

তবে নিজে ভালো খেলে, চ্যাম্পিয়ন হয়েও ফাইনালে না খেলতে পারা সতীর্থকে ভোলেননি কিসকো। মাথায় ৯ শেলাই নিয়েও খেলতে চেয়েছিলেন রংপুরের আরেক ফুটবলার অনন্যা। তবে মেডিকেল টিমের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকায় মাঠে নামা হয়নি। তাকে নিয়েই কিসকোর আক্ষেপ রয়েই গেছে। সতীর্থ অনন্যা থাকলে দল আরও ভালো খেলতে পারত বলে বিশ্বাস তার, ‘আরেকটু দরকার ছিল আমাদের ওই যে আমাদের একটা আপু অনন্যা, ও থাকলে আরও ভালো হইতো। ও না থাকায় আমাদের দল একটু দুর্বল ছিল। ও থাকলে আরও ভালো করতাম।’

এসকেডি/আইএন/এএসএম