খেলাধুলা

৯ সেলাই পেরিয়ে ইউরোপ ছোঁয়ার স্বপ্ন অনন্যার

পুরো মাথা মোটা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। একটাও চুল দেখা যায় না। সেমিফাইনালে মাথা ফেটে লেগেছে ৯টি সেলাই। তবু ফাইনালের দিন ঠিকই জার্সি গায়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন তিনি। খেলতে না পারলেও দলের পাশে থাকার ইচ্ছেটা ছিল প্রবল। কিন্তু মেডিকেল টিমের কড়া নিষেধাজ্ঞায় ডাগআউটেই বসে থাকতে হয়েছে। ম্যাচ শেষে তাই শিরোপার আনন্দের মাঝেও ছিল না খেলতে পারার আক্ষেপ।

Advertisement

শুধু অনন্যাই নন, অধিনায়ককে মাঠে না পেয়ে আক্ষেপ করেছেন সতীর্থরাও। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাসে কেউ তাকে ভুলে যায়নি। সবাই জানত, এই শিরোপার পেছনেও অনন্যার অবদান কম নয়।

গতকাল সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে রাজশাহী অঞ্চলকে ৪-০ গোলে হারিয়ে নতুন কুঁড়ি বালিকা ফুটবলের শিরোপা জিতে নেয় রংপুর অঞ্চল। পুরো ম্যাচটি ডাগআউটে বসেই দেখেছেন অধিনায়ক অনন্যা। মাঠে নামতে না পারলেও শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে যান সতীর্থদের কাছে, ভাগ করে নেন শিরোপার আনন্দ।

আরও পড়ুন গোলের নেশায় দারিদ্র্যকে হার মানাতে ছুটছে স্মৃতি কিসকো

তবে ম্যাচ খেলতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও দলের শিরোপা জয়ের আনন্দই যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। কথা বলতে গিয়ে বারবারই ফুটে উঠেছে সতীর্থদের প্রতি অনন্যার ভালোবাসা, দলের জন্য নিজের নিবেদন আর কোচের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

Advertisement

জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে ফাইনালের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে অনন্যা বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন হয়েছি এটা অনেক গর্বের বিষয়। প্রথমবারের মতন চ্যাম্পিয়ন এটা অনেক খুশির বিষয়। নতুন কুঁড়িতে প্রথমেই চ্যাম্পিয়ন। অনেক জার্নি করে আসছি, অনেক পরিশ্রম গেছে আমাদের। ইনজুরি হয়েছে, মাঠে খেলতে পারলে ভালো লাগত। টিম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এটাও অনেক খুশি। কীভাবে বলবো যে এত খুশি, প্রথমবারের চ্যাম্পিয়ন এটা অনেক খুশি।’

মাথায় নয়টি সেলাই নিয়েও হাসপাতালে না থেকে সোজা মাঠে চলে এসেছিলেন তিনি। খেলতে পারবেন না, এটা জেনেও কেন এমন সিদ্ধান্ত? প্রশ্ন শুনেই অনন্যা জানালেন, দলের পাশে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ‘টিমকে সাপোর্ট দেওয়া লাগবে। আমার রিপ্লেস প্লেয়ার নাই ওইরকম। ওই জন্যে সাহস করে আসলাম। মেয়েরা অনেক ভালো খেলছে। আমি চাইছিলাম আমি নামবো, অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম কিন্তু পারলাম না। টিম কমিটি আর ডাক্তার নামতে নিষেধ করলো ওইজন্যে নামলাম না।’

ফুটবলের সঙ্গে অনন্যার পরিচয় খুব ছোটবেলায়। টেলিভিশনে খেলা দেখতে দেখতেই ফুটবলের প্রেমে পড়েন। পরে জানতে পারেন রংপুরে অনুশীলনের সুযোগ আছে। সেই সুযোগই তাকে টেনে নিয়ে যায় একাডেমিতে।

Advertisement

তিনি বলেন, ‘প্রথমে টিভিতে দেখছিলাম খেলা। দেখার পর জানলাম আমাদের রংপুরে প্র্যাকটিস হয়। পরে ক্লাবে আসলাম।’

রংপুর সদরেই অনন্যার বাড়ি। পরিবারের গল্পটা অবশ্য সহজ নয়। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছেন। শুরুতে ফুটবল খেলতে মায়েরও আপত্তি ছিল। তবে মেয়ের স্বপ্ন আর সাফল্যের কাছে সেই আপত্তি বেশিদিন টেকেনি। অনন্যা বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছে। মা একটু বাধা দিয়েছিল।’

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পরিবার এখন নিশ্চয়ই আরও বেশি সমর্থন দেবে, এমন প্রশ্নে তার জবাব, ‘হ্যাঁ এখন সাপোর্ট দেয়। শুরুতে মা চাইতো না আমি ফুটবল খেলি। তবে নতুন কুঁড়ি আমাকে মায়ের কাছ থেকেও হ্যাঁ আদায় করে দিয়েছে। এখন মাও আমাক সাপোর্ট করছে, বাড়ির বাকি লোক, এলাকার সবাই খুব খুশি আমাকে নিয়ে।’

নতুন কুঁড়ির পুরো যাত্রাপথে অনন্যা সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিয়েছেন নিজের কোচকে। তার বিশ্বাস, কোচ না থাকলে এত দূর আসাই সম্ভব হতো না। অনন্যা বলেন, ‘আমাদের কোচ না থাকলে হয়তোবা এতদূর আসতে পারতাম না। কোচের জন্যেই এতদূর আসা। উনি অনেক পরিশ্রম করছে আমাদের নিয়ে। উনার গেম প্ল্যানিংয়েই আমরা এতদূর আসা।’

রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার লালপুকুরেঢ় স্কুল জারুল্লাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী অনন্যা। পুরো নাম মোসাম্মৎ তাসিনতিয়া হাসান অনন্যা। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও খেলাধুলায় তাকে নিয়মিত উৎসাহ দেন। তার ভাষায়, ‘স্কুলের স্যার-ম্যাডামরা খেলাকে অনেক সাপোর্ট করে। স্কুল থেকে অনেক সাপোর্ট দেয়।’

ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বপ্নটা পরিষ্কার। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার পাশাপাশি একদিন ইউরোপের কোনো ক্লাবে খেলার স্বপ্নও দেখেন তিনি। অনন্যা বলেন, ‘হ্যাঁ, জাতীয় দল বলতে আমাদের অনেক ফিলোসফি হচ্ছে যখন ভালো খেলবো তখনই ইউরোপের একটা ক্লাবে খেলার ইচ্ছা, অনেক শখ।’

নয়টি সেলাই, মাথাজুড়ে ব্যান্ডেজ আর মাঠের বাইরে বসে থাকা, এসব কিছুই অনন্যার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। ফাইনালের দিন তিনি খেলতে পারেননি, কিন্তু ডাগআউট থেকে দলের প্রতিটি মুহূর্তে ছিলেন। আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে যেন প্রমাণ করলেন কখনো কখনো মাঠে না নেমেও একজন অধিনায়ক পুরো দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকতে পারেন।

আরও পড়ুন নতুন কুঁড়ির শিশুদের নিউজ লিড করার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর

ট্রফিটা শেষ পর্যন্ত সতীর্থদের হাত ঘুরে উঠেছে অধিনায়ক অনন্যার হাতেই। দলটাকেও গেঁথেছিলেন এক সূতোয়। ফাইনালে তাকে না পেয়ে ম্যাচসেরা স্মৃতি কিসকোর আক্ষেপই সেটা প্রমাণ করে। কিসকো বলছিলেন, ‘আরেকটু দরকার ছিল আমাদের ওই যে আমাদের একটা আপু অনন্যা, ও থাকলে আরও ভালো হতো। ও না থাকায় আমাদের দল একটু দুর্বল ছিল। ও থাকলে আরও ভালো করতাম।’

নয়টি সেলাই তাকে ফাইনালে খেলতে দেয়নি, কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। সতীর্থদের চোখেও সেটা স্পষ্ট। ম্যাচসেরা স্মৃতি কিসকোও বলছিলেন, ‘আরেকটু দরকার ছিল আমাদের ওই যে আমাদের একটা আপু অনন্যা, ও থাকলে আরও ভালো হইতো। ও না থাকায় আমাদের দল একটু দুর্বল ছিল। ও থাকলে আরও ভালো করতাম।’

শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছেন অনন্যা। সংসারের বাস্তবতা, সমাজের বাধা, চোট কিছুই তাকে ফুটবল থেকে সরাতে পারেনি। এখন তার স্বপ্ন জাতীয় দলের জার্সি, তারপর ইউরোপের কোনো ক্লাবে খেলা। নতুন কুঁড়ির এই শিরোপা হয়তো সেই স্বপ্নযাত্রার প্রথম বড় অধ্যায় মাত্র।

এসকেডি/আইএন