মো. শাহরিয়ার মৃধা ঢাকায় ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কাজ করেন। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায়। তার বাড়ি লাগোয়া এক চিলতে জমি (৮ শতাংশ) কিনবেন। এজন্য রেজিস্ট্রেশনের জন্য এসেছেন গ্রামের বাড়ি।
Advertisement
দশমিনা উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে শুধু মঙ্গলবার দলিল হয়। জরুরি প্রয়োজনেও প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কারও কোনো উপায় থাকে না।
সে অনুযায়ী শাহরিয়ার মৃধা সোমবার রাতে গ্রামের বাড়ি দশমিনার মাছুয়াখালীতে আসেন। দলিলও আগে থেকেই মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। কথা ছিল বিক্রেতা একই গ্রামের নুরুল আলম ওইদিনই দাখিলা তুলে দলিল চূড়ান্ত করে রেজিস্ট্রেশন করবেন। কিন্তু দাখিলা পেতে বিকেল হয়ে যায়, সাব-রেজিস্ট্রার চলে যান, তিনি আর ওইদিন দলিল করতে পারেননি। এখন তাকে আবার এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। সেদিনও হবে কি না তা অনিশ্চিত।
একদিনের ছুটিতে এসেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দাখিলার কারণে শেষ মুহূর্তে আটকে গেলাম। একদিন দলিল হওয়ায় মঙ্গলবার দলিল লেখকদেরও প্রচণ্ড চাপ, তাড়াহুড়া করে তারাও পেরে ওঠেননি। এক সপ্তাহ পর আবার ছুটি পাবো কি না জানি না।-সেবাপ্রত্যাশী শাহরিয়ার মৃধা
Advertisement
সম্প্রতি শাহরিয়ার দশমিনা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি চাকরিতে ছুটি নেওয়া কঠিন। একদিনের ছুটিতে এসেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দাখিলার কারণে শেষ মুহূর্তে আটকে গেলাম। একদিন দলিল হওয়ায় মঙ্গলবার দলিল লেখকদেরও প্রচণ্ড চাপ, তাড়াহুড়া করে তারাও পেরে ওঠেননি। এক সপ্তাহ পর আবার ছুটি পাবো কি না জানি না।’
আরও পড়ুন আলী ইমাম মজুমদার / অনলাইন ভূমিসেবায় দিনে ১০-১২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হচ্ছেতিনি বলেন, ‘বহুদিন ধরে দশমিনায় সাব-রেজিস্ট্রার নেই। অন্য উপজেলা থেকে সাব-রেজিস্ট্রার এসে একদিন অফিস করেন। মানুষের ভোগান্তি রোধে নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রার দেওয়া উচিত।’
শুধু দশমিনা নয়, সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমির দলিল করতে গিয়ে নিয়মিত মানুষ এভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
৫২ জেলার ১২৯টি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার নেইনিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫২ জেলার ১২৯টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য। আশপাশের উপজেলা থেকে সাব-রেজিস্ট্রাররা এসে শূন্য থাকা উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন।
Advertisement
এসব উপজেলায় নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় জমির নিবন্ধনপ্রত্যাশী মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেকে দলিল ও দলিলের নকল তুলতে পারছেন না। সমস্যার কথা জানিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকরাও।
সাব-রেজিস্ট্রার একজন, কাজ করেন তিন উপজেলায়কোনো কোনো সাব-রেজিস্ট্রারকে একই সঙ্গে দু-তিনটি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। খালি থাকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তারা সাময়িক দায়িত্ব পালন করেন। এতে কোথাও কোথাও দলিল নিবন্ধনের সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত এ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরটিতে নেমেছে স্থবিরতা।
সেবাপ্রত্যাশীদের চাপ থাকায় কোথাও কোথাও অনেক রাত পর্যন্ত অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সাব-রেজিস্ট্রারদের কাজ করতে হচ্ছে।
পটুয়াখালীর বাউফল সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়/জাগো নিউজ
ভোলার লালমোহন থেকে সম্প্রতি অবসরে গেছেন সাব-রেজিস্ট্রার মো. মঞ্জুরুল ইসলাম। অবসরে যাওয়ার আগে মূল কর্মস্থল লালমোহনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দক্ষিণ আইচা, বোরহানউদ্দিন, মনপুরা ও শশীভূষণ অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও পালন করেন।
মঞ্জুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলাজুড়ে সাব-রেজিস্ট্রার সংকটে চরম নড়বড়ে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন বাকি দুজন কর্মকর্তার পক্ষে পুরো জেলার বিশাল কাজের চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।’
স্বস্তিতে নেই সাব-রেজিস্ট্রাররাও। তারা বলছেন, খালি থাকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করতে গিয়ে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কারণ, একজনকে একসঙ্গে দু-তিনটি অফিস দেখতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন ভূমি নিয়ে যত অভিযোগ জানান ‘১৬১২৩’ নম্বরেআইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অনেক দিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ বন্ধ। এর মধ্যে অনেকেই অবসরে গেছেন। আবার কেউ কেউ নিয়োগ পাওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ৫০১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের (সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়) মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার নেই ১২৯টিতে।
সাব-রেজিস্ট্রার পদটি নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির (নবম গ্রেড)। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এ পদে নিয়োগ দেয়। সাব-রেজিস্ট্রারের শূন্য পদের বিপরীতে পিএসসিতে প্রস্তাবও দেওয়া আছে।
রেজিস্ট্রারও নেই অনেক জেলায়শুধু তাই নয়, জেলার রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা ৬১টি জেলার মধ্যে ১৬টিতে জেলা রেজিস্ট্রার নেই। ফেনী, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, পাবনা, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, ঢাকা, নেত্রকোনা, যশোর, ঝালকাঠি, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও জয়পুরহাট জেলার জেলা রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য।
সংকট বেশি দক্ষিণাঞ্চলেদক্ষিণাঞ্চলে সাব-রেজিস্ট্রারের শূন্য পদের সংখ্যা বেশি। বরিশালের দশটি সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের মধ্যে চারটিতে সাব-রেজিস্ট্রার নেই। পটুয়াখালীর সাতটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চারটিতেই সাব-রেজিস্ট্রার নেই। দুমকি, গলাচিপা, দশমিনা ও বাউফল উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য।
সপ্তাহে রবি ও সোমবার সদরে, মঙ্গলবার দশমিনায়, বুধ ও বৃহস্পতিবার গলাচিপায় দায়িত্ব পালন করছি। মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে আমরা এটা মেনে নিচ্ছি। শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ ত্বরান্বিত করা উচিত।-পটুয়াখালী সদরের সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ফারুক
পটুয়াখালী সদরের সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ফারুক একই সঙ্গে গলাচিপা ও দশমিনার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সপ্তাহে রবি ও সোমবার সদরে, মঙ্গলবার দশমিনায়, বুধ ও বৃহস্পতিবার গলাচিপায় দায়িত্ব পালন করছি। মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে আমরা এটা মেনে নিচ্ছি। শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ ত্বরান্বিত করা উচিত।’
বাউফলের মমিনপুরের বাসিন্দা সায়েম হোসেন দলিলের নকল তুলতে দিয়েছেন এক মাসেরও বেশি সময় আগে। এখনো তিনি নকল হাতে পাননি। সায়ের বলেন, ‘দলিল করার সঙ্গে সঙ্গেই নকল তুলতে দিয়েছি, এখনো পাইনি। কয়েক দফা ঘুরে গেছি। বলে সাব-রেজিস্ট্রার নেই।’
আরও পড়ুন ডিজিটাল ভূমিসেবার নতুন যুগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীরপটুয়াখালীর জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ কামাল হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পটুয়াখালীতে সাব-রেজিস্ট্রারের তীব্র সংকট রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে যদি দু-তিনজন কর্মকর্তা দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের অনেক উপকার হবে। সাব-রেজিস্ট্রার পদটি একেবারে সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত।’
কর্মকর্তা সংকটের কারণে মানুষের ভোগান্তির একটি উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাউফলের সাব-রেজিস্ট্রার একদিন রাত ২টার দিকে ফোন দিয়েছেন। বললেন, স্যার, আমি উঠতে পারছি না, মানুষ আমাকে উঠতে দিচ্ছে না। আমিও তো মানুষ।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি জেলায় সাতটি অফিস থাকলেও কর্মকর্তা আছেন একজন। এটা বাস্তবে অসম্ভব। তখন পাশের জেলা থেকে কর্মকর্তাকে এনে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিতে হয়। এতে কর্মকর্তাদেরও অনেক কষ্ট হয়। মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করেই আমরা তাদের অনুরোধ করে দায়িত্ব পালন করাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু অফিসে দুই থেকে তিন বছর ধরেও কোনো সাব-রেজিস্ট্রার নেই। একজন মানুষ কতগুলো অফিস সামলাবেন? কোথাও সকাল থেকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এটা অমানসিক ও অমানবিক পরিশ্রম।’
ভোলার নয়টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মধ্যে সাতটিতেই সাব-রেজিস্ট্রারের পদ খালি। চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়নের মিলন হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের চরশশীভূষণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একদিন দলিল হয়, মাঝে মধ্যে তাও হয় না। আমি কয়েক সপ্তাহ ঘুরে তারপর দলিল করতে পেরেছি।’
দশমিনা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের সামনে বসে আছেন সেবাপ্রত্যাশীরা/জাগো নিউজ
ভোলার লালমোহন থেকে সম্প্রতি যাওয়া সাব-রেজিস্ট্রার মো. মঞ্জুরুল ইসলাম জেলার বর্তমান রেজিস্ট্রি কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তার অভাবে এখন দক্ষিণ আইছা, শশীভূষণ বা দুলারহাটের মতো এলাকাগুলোতে সপ্তাহে মাত্র একদিন রেজিস্ট্রি সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় ১৫ দিনে বা এক মাসে মাত্র একদিন সাব-রেজিস্ট্রার যাচ্ছেন, ফলে জনগণ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’
ভোলায় আমাদের নয়টি অফিসের মধ্যে ছয়টি অফিসেই সাব-রেজিস্ট্রার নেই। মাত্র দুজন সাব-রেজিস্ট্রার পালা করে বসেন। কোথাও একদিন দলিল হয়, কোথাও দুদিন। সদরের সাব-রেজিস্ট্রারকে তিনটি অফিসে দায়িত্ব পালন করতে হয়। মানুষের যেমন ভোগান্তি হয়, সাব-রেজিস্ট্রারদেরও ভোগান্তি।-ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ
ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভোলায় আমাদের নয়টি অফিসের মধ্যে ছয়টি অফিসেই সাব-রেজিস্ট্রার নেই। মাত্র দুজন সাব-রেজিস্ট্রার পালা করে বসেন। কোথাও একদিন দলিল হয়, কোথাও দুদিন। সদরের সাব-রেজিস্ট্রারকে তিনটি অফিসে দায়িত্ব পালন করতে হয়। মানুষের যেমন ভোগান্তি হয়, সাব-রেজিস্ট্রারদেরও ভোগান্তি। অফিসও ঠিকঠাক মতো চালানো যায় না।’
ভোলা জেলায় প্রতি মাসে গড়ে তিন হাজার দলিল হয়। আগে এ সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজারের মতো বলেও জানান জেলা রেজিস্ট্রার।
আরও পড়ুন অনুরোধ করছি সতর্কও করছি, যথাযথ ভূমিসেবা নিশ্চিত করুন: ভূমিমন্ত্রীএ বিষয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) শামীম রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভোলায় শুধু সাব-রেজিস্ট্রার নয়, প্রায় সব সরকারি দপ্তরেই জনবল সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।’
দেশজুড়ে ভোগান্তির অন্ত নেইসাব-রেজিস্ট্রার পদ শূন্য থাকায় নানান দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, দলিল লেখক, সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রাররা।
কিশোরগঞ্জ সদরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন সাব-রেজিস্ট্রার নেই। এ অফিসের দলিল লেখক কামরুল ইসলাম পাভেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘দলিল রেজিস্ট্রি করার আগে ও রেজিস্ট্রি করার সময় প্রত্যেকটি দিক খুব সূক্ষ্মভাবে দেখতে হয়। যেটার ওপর নির্ভর করে প্রত্যেকটা ব্যক্তির বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পদ। এখন এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত। কিন্তু সরকারের এতটা চিন্তা দেখছি না।’
কিশোরগঞ্জ সদরের সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দু-বছর ধরে কোনো স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৮০টি দলিল হয়। এখন স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার না থাকার কারণে অন্য অফিস থেকে সাব-রেজিস্ট্রার এসে আমাদের এখানে অফিস করেন। সপ্তাহে দুদিন বা তিনদিন অফিসের কার্যক্রম চালু থাকে।’
পটুয়াখালীর দশমিনা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস/জাগো নিউজ
এ দলিল লেখক বলেন, ‘গড়ে যদি প্রতিদিন ৬০টি দলিল হয়, সর্বনিম্ন ধরলাম ৬০টি, তো সপ্তাহে আসছে কয়টি? ৩০০ দলিল। এই ৩০০ দলিল আমরা স্মুথলি রেজিস্ট্রি করতে পারি যদি একজন স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার সপ্তাহে পাঁচদিন আমাদের এখানে অফিস করেন।’
অনেক সময় কিছু কিছু ইমারজেন্সি দলিল থাকে, তারা জরুরিভিত্তিতে বিক্রি করে দেশের বাইরে যাবে বা তার নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে যাবে। কিন্তু, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ে তারা দলিলটা করতে পারছেন না।-দলিল লেখক কামরুল ইসলাম পাভেল
কামরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘অনেক সময় কিছু কিছু ইমারজেন্সি দলিল থাকে, তারা জরুরিভিত্তিতে বিক্রি করে দেশের বাইরে যাবে বা তার নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে যাবে। কিন্তু, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ে তারা দলিলটা করতে পারছেন না।’
নির্ধারিত কোনো মান না থাকলেও যথাযথভাবে করতে হলে প্রতিদিন ২৫-৩০টি দলিলকে অনেকেই একটি যুক্তিসঙ্গত বা স্বাভাবিক বলে মনে করেন সাব-রেজিস্ট্রাররা। এর চেয়ে অনেক বেশি দলিল নিবন্ধন করতে হলে সময়ের চাপ বাড়ে এবং ত্রুটি বা অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন তেজগাঁওয়ে পরীক্ষামূলক ‘নাগরিক ভূমিসেবা কেন্দ্র’কিশোরগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘একজন সাব-রেজিস্ট্রারও তো মানুষ। একদিনে ১০০টি বা এর বেশি দলিল করাটাও একজন সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য কষ্টসাধ্য। কারণ দলিল বিষয়টা অনেকটা সেনসিটিভ, এটা সেবাগ্রহীতা, আমরা দলিল লেখক, সাব-রেজিস্ট্রার স্যার এবং অফিসের স্টাফ এটা সবাই জানেন।’
ওই কর্মচারী আরও জানান, কিশোরগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেকর্ড রুম থেকে জেলার ১৩টি উপজেলার দলিলের নকল সরবরাহ করা হয়। সম্পত্তির মালিকানা যাচাই, আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন ও বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার প্রয়োজনে এসব নকল জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন হলেও সাব-রেজিস্ট্রারের তীব্র কাজের চাপের কারণে সময়মতো তা দেওয়া সম্ভব হয় না।
‘প্রতিদিন ১০০টির বেশি দলিল নিবন্ধনের পাশাপাশি গড়ে অন্তত ৩০০টি নকলে স্বাক্ষর করতে হয়। সপ্তাহে প্রায় ১৫শ নকল জমা হলেও সীমিত সময়ের কারণে স্বাক্ষর করতে বিলম্ব হয়। এতে সেবাগ্রহীতাদের পাশাপাশি দলিল লেখকদেরও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে’ বলেন তিনি।
সিলেটের জৈন্তাপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একজন দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘জমি রেজিস্ট্রি কখন করে মানুষ? কখন জমি বিক্রি করে? মেয়ের বিয়ে কিংবা ছেলেকে দেশের বাইরে পাঠাবে- এসব জরুরি প্রয়োজনে বিক্রি করে। কিন্তু সময়মতো রেজিস্ট্রি করতে পারছে না।’
সিলেটের পাঁচ উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য জানিয়ে সিলেটের জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘তবে অন্য সাব-রেজিস্ট্রাররা অতিরিক্ত হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।’
এক জেলায় একজন সাব-রেজিস্ট্রার এমনও আছেন। কোথাও দলিল হয় একদিন। জনগণের দরকার প্রতিদিন। মানুষ কেমন ভোগান্তিতে পড়ছে এটা কল্পনাতীত! জনগণ ভোগান্তিতে পড়ছে, দলিল লেখকরা ভোগান্তিতে পড়ছে, সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে গেছে।-বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি এম এ রশিদ
মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে অন্য সাব-রেজিস্ট্রাররা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজগুলো চালিয়ে নিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে সপ্তাহে প্রতিদিন এভাবে কাজ চালানো সম্ভব নয় এবং সেভাবে দলিল নিবন্ধনও করা যায় না। এই শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানানো হয়েছে।’
বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি এম এ রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এক জেলায় একজন সাব-রেজিস্ট্রার এমনও আছেন। কোথাও দলিল হয় একদিন। জনগণের দরকার প্রতিদিন। মানুষ কেমন ভোগান্তিতে পড়ছে এটা কল্পনাতীত! জনগণ ভোগান্তিতে পড়ছে, দলিল লেখকরা ভোগান্তিতে পড়ছে, সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে গেছে।’
তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৩৫ থেকে ৪০ লাখের মতো দলিল নিবন্ধিত হয়। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার দলিল নিবন্ধন হয়। বছরে রাজস্ব আদায় হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো।
আরও পড়ুন জুন থেকে ভূমি সেবার সব দফতর এক ছাদের নিচেএম এ রশিদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ছাড়াও ডেপুটি গভর্নর দিয়ে চলবে। কিন্তু বাংলাদেশ সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে এই নিয়ম করে রাখছে যে, সাব-রেজিস্ট্রার একজন ছুটিতে গেলে আর এটার আর কোনো বিকল্প নেই। আমরা এটা নিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু কোনো সুরাহা পাইনি। আমরা এগুলো নিয়ে প্রেস ক্লাবে আবার সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলবো।’
কিশোরগঞ্জ সদরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমাদের বছরে ১১ থেকে ১৩ হাজারের মতো দলিল হতো। এখন এটা নেমে চলে আসছে ৯ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে।’
রেজিস্ট্রি কমায় সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
সংকটের সমাধান ‘ফাইলবন্দি’মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় নিবন্ধন অধিদপ্তর। আইন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পিএসসিতে পাঠানো হয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রায় ১২৯টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার নেই। মোট ৫০১টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বিপরীতে কর্মরত প্রায় ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার। ফলে একজন কর্মকর্তাকে দু-তিনটি, কোথাও কোথাও আরও বেশি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগের বিষয়টি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে হয়। আমরা অনেক আগেই মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠিয়েছি, মন্ত্রণালয়ও পিএসসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু বিসিএস নিয়মিত হয় না। আবার আমাদের পদগুলো নন-ক্যাডার হওয়ায় অনেকে যোগ দিলেও পরবর্তীসময়ে অন্য ক্যাডারে চলে যান।’
দশমিনা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের সামনে সেবাপ্রত্যাশীরা/জাগো নিউজ
শূন্য পদের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন নিয়োগ বন্ধ ছিল। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পিএসসি থেকেও পর্যাপ্ত কর্মকর্তা পাওয়া যায়নি। এছাড়া অনেকে অবসরে গেছেন, কেউ মারা গেছেন। আগামী দিনেও নিয়মিত অবসর হবে।’
প্রতিদিনই সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন হওয়ার কথা। কিন্তু একজন কর্মকর্তা যখন অতিরিক্ত দায়িত্বে অন্য অফিসে যান, তখন তার মূল অফিস কার্যত বন্ধ থাকে।-নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান
সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে উপ-মহাপরিদর্শক বলেন, ‘প্রতিদিনই সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন হওয়ার কথা। কিন্তু একজন কর্মকর্তা যখন অতিরিক্ত দায়িত্বে অন্য অফিসে যান, তখন তার মূল অফিস কার্যত বন্ধ থাকে।’
তিনি বলেন, ‘ভোলা জেলায় নয়টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থাকলেও কর্মকর্তা আছেন মাত্র দুজন। পটুয়াখালীতেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। কোথাও কোথাও সপ্তাহে একদিনও নিয়মিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
বিভাগীয় পর্যায়ের পদ নিয়েও সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ছয়টি বিভাগের জন্য ছয়জন ইন্সপেক্টর অব রেজিস্ট্রেশন অফিসার (আইআরও) থাকার কথা। বর্তমানে আছেন মাত্র দুজন। পদোন্নতির প্রক্রিয়া শেষ হলে শূন্য পদগুলো পূরণ হবে। এরপর জেলা রেজিস্ট্রার এবং সাব-রেজিস্ট্রার পর্যায়েও পদোন্নতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা রেজিস্ট্রারের অনেকগুলো পদও বর্তমানে শূন্য জানিয়ে বলেন, ‘এসব পদোন্নতির বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় দেখে, আমরা শুধু তথ্য ও চাহিদা পাঠাই।’
আরও পড়ুন ভূমি অফিসে যেসব সেবা পাবেনআইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা জাগো নিউজ বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অনেক উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য। এ সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগের পাশাপাশি বিশেষ সার্কুলারের মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নিতে পিএসসির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
এছাড়া বিসিএস থেকে নন-ক্যাডার হিসেবে যোগ্য প্রার্থীদেরও নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিসিএস প্রক্রিয়ায় সময় লাগে বলে দ্রুত সমাধানের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পিএসসি চেয়ারম্যানের বিরক্তি প্রকাশসাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিরক্তি প্রকাশ করেন পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম। তিনি বলেন, ‘এটা কি আপনার কনসার্ন? আপনি নিয়োগ দেবেন সেটা? আমি পরীক্ষা নেবো কবে, সেটা তো আমার ব্যাপার। আমার কাছে আসলে অগ্রাধিকার থাকবে না?’
এরপর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি নিউজ যখন করবেন, আমাদের পিআরওর (জনসংযোগ কর্মকর্তা) সঙ্গে কথা বলুন। এটা আমার কাছে জিজ্ঞাস করার বিষয় না।’
পরে এ বিষয়ে পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো বিভাগ নিয়োগ নিয়ে কাজ করতে হয়। কবে এ অধিযাচনটি (খালি পদের লোক নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়ে যে চিঠি পাঠানো হয়) পাঠানো হয়েছে, সেটি ধরে খোঁজ নিয়ে সবশেষ অবস্থাটা জানানো যাবে।’
যেসব উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য (তালিকা নিচের ছবিতে)
আরএমএম/এএসএ/ এমএফএ