দেশজুড়ে

বহুমুখী সংকটে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প

একসময় দেশের শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ছিল লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত। কৃষি, পরিবহন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ খাতের তৈরি যন্ত্রাংশের চাহিদা ছিল ব্যাপক। কাঁচামালের তীব্র সংকট আর আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাবসহ বহুমুখী সংকটে পাবনায় এখন প্রসারিত হচ্ছে না লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পটি।

Advertisement

পাবনার ঐতিহ্যবাহী হালকা প্রকৌশল বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা ‘কফিল উদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং’। কারখানাটিতে এক এক করে ঘুরছে ২৭টি সচল মেশিন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক সফল উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ। অথচ ভেতরের বাস্তবচিত্র একেবারেই ভিন্ন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি না থাকা, কাঁচামালের তীব্র সংকট আর আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাবে ব্যবসা প্রসারিত করতে পারছেন না কারখানাটির কর্ণধার গিয়াস উদ্দিন শিপলু। তিনি ‘কফিল উদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর তৃতীয় প্রজন্মের কর্ণধার।

গিয়াস উদ্দিন শিপলু বলেন, পারিবারিক সূত্রে গড়ে ওঠা এই কারখানার দায়িত্ব নিয়ে তিনি ব্যবসা বড় করার অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তার সেই পথচলা এখন থমকে আছে।

‘বৃহৎ বাজার ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগ না থাকা এই শিল্পের প্রধান সংকট হলো। শুধু পাবনা নয়, এ সংকট দেশজুড়ে। পাবনায় এই শিল্পে জড়িতদের বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে বিসিক কাজ করছে। এছাড়া তাদের প্রশিক্ষিত করাসহ সহজ শর্তে ঋণ পেতে বিভিন্ন কার্যক্রমে রয়েছে বিসিক।’

Advertisement

তিনি বলেন, পাবনা এখন দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল খাতের অন্যতম প্রধান হাব বা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। অথচ এখানকার কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তিগত কোনো সহায়তা নেই। এই সংকট কাটাতে পাবনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ‘মোল্ডিং সুবিধা’ বা বিশেষায়িত প্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই একটি সুবিধা চালু হলে পুরো অঞ্চলের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের চিত্র রাতারাতি বদলে যাবে।

শিপলুর মতো সমস্যায় ভূগছেন জেলার অন্যান্য উদ্যোক্তারাও। চড়া সুদের কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই ব্যবসার উন্নতির চেয়ে উল্টো বিপদে পড়ছেন।

পাবনার মনোহরপুর, কুঠিপাড়া, লস্করপুর, সিংগা, হেমায়েতপুর ও বিসিক শিল্পনগরী এলাকার কারখানাগুলোতে চোখ দিয়ে দেখেই হস্তশিল্পের মতো দক্ষতা অর্জন করেছেন অনেক কারিগর। মনোহরপুরের ‘বাবা ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর রবিউল ইসলাম ফরহাদের মতো উদ্যোক্তারাও জমানো টাকায় ব্যবসা শুরু করে কর্মসংস্থান তৈরি করলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে জাতীয় অটোমোবাইল খাতে প্রবেশ করতে পারছেন না।

আরও পড়ুন গাইবান্ধায় আড়াই বছর ধরে আটকে শত কোটি টাকার ৯ সেতুর কাজ

আক্ষেপ করে রবিউল ইসলাম ফরহাদ বলেন, দশ বছর আগে জমানো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে একটি মেশিন কিনেছিলাম। আজ ১০ জন শ্রমিক কাজ করছে। কিন্তু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামান্য সহায়তা না পাওয়ায় আমাদের তৈরি পণ্য জাতীয় অটোমোবাইল খাতে ঢুকতে পারছে না।

Advertisement

‘দশ বছর আগে জমানো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে একটি মেশিন কিনেছিলাম। আজ ১০ জন শ্রমিক কাজ করছে। কিন্তু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামান্য সহায়তা না পাওয়ায় আমাদের তৈরি পণ্য জাতীয় অটোমোবাইল খাতে ঢুকতে পারছে না।’

রবিউল ও শিপলু ছাড়াও পাবনার কুঠিপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, লস্করপুর, সিংগা ও হেমায়েতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কারখানা। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ঋণ ও প্রশিক্ষণ মিললেও ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের বহুমাত্রিক বেড়াজালে এই সম্ভাবনাময় খাতের বিকাশ আটকে গেছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তারা জানান, তারা গাড়ি কলকারখানার যন্ত্রাংশ ছাড়াও ওষুধ ও খাদ্য প্রস্তুত কারখানার অত্যাধুনিক মেশিনও তৈরি করছেন।

কারখানার মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদনের চাকা প্রায়ই বন্ধ থাকে। এর ওপর যোগ হয়েছে চড়া পরিবহন খরচ, কাঁচামাল সংকট ও সহজ শর্তে পুঁজির অভাব। অনেক কারিগর শুধু চোখ দিয়ে দেখেই কাজ শিখেছেন, ফলে আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়ে গেছে। এত সক্ষমতা থাকার পরও খাতটি এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।

তবে এই খাতের প্রসারে ঋণ প্রদান, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

আরও পড়ুন যেভাবে চলছে পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসা

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিআইটিএসি) ও স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের সহায়তায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন ক্লাস্টারে নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিপণন মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। গত দুই দশকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।

‘পাবনা এখন দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল খাতের অন্যতম প্রধান হাব বা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। অথচ এখানকার কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তিগত কোনো সহায়তা নেই। এই সংকট কাটাতে পাবনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ‘মোল্ডিং সুবিধা’ বা বিশেষায়িত প্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই একটি সুবিধা চালু হলে পুরো অঞ্চলের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের চিত্র রাতারাতি বদলে যাবে।’

এসএমই ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, দেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার, যা জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশজুড়ে ১৭৭টি এসএমই ক্লাস্টারে প্রায় ৭০ হাজার কারখানা রয়েছে। কৃষি, কলকারখানা ও যানবাহনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরির এই বাজারে পাবনার উদ্যোক্তারাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের (এসএমই) মহাব্যবস্থাপক নাজিম হাসান বলেন, এসব ক্লাস্টারের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই উত্তরাধিকারসূত্রে ব্যবসা পেয়ে থাকেন। ফলে প্রথাগত জ্ঞান থাকলেও তাদের আধুনিক কারিগরি দক্ষতা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। আমরা ২০০৭ সাল থেকে জরিপ চালিয়ে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। উদ্যোক্তা ও কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের সঠিক বিপণন নিশ্চিত করা গেলে আগামী ৫ বছরে এই ক্লাস্টারটি বড় শিল্পে রূপ নেবে।

তবে প্রান্তিক উদ্যোক্তারা বলছেন, ঋণ সহায়তা বা মেলা আয়োজনের মতো প্রচলিত উদ্যোগগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়, তবে তা যথেষ্ট নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে এবং কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তির জোগান নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বড় এই উৎপাদনশীল খাত অঙ্কুরেই থমকে থাকবে। এর জন্য বিশেষায়িত ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এবং প্রযুক্তি সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন জমে উঠেছে জাতীয় বৃক্ষমেলা, ১৫ দিনে পৌনে ৭ কোটি টাকার চারা বিক্রি

জেলায় ৩০০ টিরও বেশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) পাবনা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক শামীম হোসেন বলেন, বৃহৎ বাজার ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগ না থাকা এই শিল্পের প্রধান সংকট হলো। শুধু পাবনা নয়, এ সংকট দেশজুড়ে। পাবনায় এই শিল্পে জড়িতদের বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে বিসিক কাজ করছে। এছাড়া তাদের প্রশিক্ষিত করাসহ সহজ শর্তে ঋণ পেতে বিভিন্ন কার্যক্রমে রয়েছে বিসিক।

প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে ‘নোরাট’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের আধুনিক মেশিনারিজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হতো। এ ধরনের একটি প্রকল্প নিয়ে কারিগরদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এনএইচআর/এএসএম