ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন জাকির হোসেন। কিন্তু বাবা বারবার বলতেন, ‘স্কিল পরে, আগে দৌড়াও।’ ফুটবল মাঠে বল নিয়ে দ্রুত ছোটা থেকেই শুরু হয়েছিল তার যাত্রা। সেই ছেলেটিই এখন নতুন কুঁড়ির দ্রুততম অ্যাথলেট। সাতক্ষীরার হাসপাতালের এক নাইট গার্ডের ছেলে জাকির হোসেন এখন বাংলাদেশের সেরা স্প্রিন্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনী অনুষ্ঠানের শেষ আকর্ষণ ছিল ছেলে ও মেয়েদের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট। আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই দুই ইভেন্ট দেখতে কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভিআইপি কক্ষ ছেড়ে ট্র্যাকের পাশে চলে আসেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
Advertisement
এর আগে মাঠে চলছিল বালিকা ফুটবলের ফাইনাল। সেই ম্যাচ শেষ হতেই তিনি সামনে থেকে কিশোর-কিশোরীদের গতির লড়াই উপভোগ করেন। দৌড় শেষে দুই বিভাগের চ্যাম্পিয়ন মাবিয়া ও জাকির হোসেনকে কাছে ডেকে অভিনন্দন জানান, তাদের পিঠ চাপড়ে উৎসাহও দেন।
আরও পড়ুন ৯ সেলাই পেরিয়ে ইউরোপ ছোঁয়ার স্বপ্ন অনন্যারআগের দিন হিটে সবচেয়ে দ্রুত সময় করেছিলেন মাবিয়া ও জাকির। ফাইনালেও তাই ছিল তাদের দিকেই সবার নজর। প্রত্যাশার প্রতিদান দিয়ে দুইজনই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। মেয়েদের বিভাগে ঢাকার মাবিয়া হিটে ১৩.৮২ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন, ফাইনালে আরও দ্রুত দৌড়ে ১৩.৭৫ সেকেন্ডে সবার আগে ফিনিশ লাইন স্পর্শ করেন। সিলেটের তিশা আক্তার ১৪.২৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্বিতীয় এবং খুলনার অধরা ঐশী ১৪.৬২ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে তৃতীয় হন।
ছেলেদের বিভাগে আধিপত্য আরও স্পষ্ট ছিল সাতক্ষীরার জাকির হোসেনের। হিটে ১১.৫০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেরা হওয়ার পর ফাইনালে নিজের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করেন তিনি। মাত্র ১১.১৫ সেকেন্ডে ১০০ মিটার শেষ করেই ভিন্নধর্মী উদযাপনে মেতে ওঠেন জাকির। প্রথমেই সিজদায় লুটিয়ে পড়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, এরপর ছুটে যান কোচ ও সতীর্থদের কাছে।
Advertisement
এই ইভেন্টে জাকিরকে কার্যত কোনো চ্যালেঞ্জই জানাতে পারেননি বাকি সাত প্রতিযোগী। রংপুরের জিয়াদ হাসান ১১.২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্বিতীয় এবং রাজশাহীর সুমন শেখ ১১.৪০ সেকেন্ড সময় নিয়ে তৃতীয় হন।
তবে ট্র্যাকে সবার চেয়ে দ্রুত ছোটা জাকিরের গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্য জায়গা থেকে। সাতক্ষীরার হাসপাতালের এক নাইট গার্ড বাবার সেই ছোট্ট পরামর্শই আজ জাকির হোসেনকে এনে দিয়েছে দেশের সেরা হওয়ার স্বীকৃতি।
নতুন কুঁড়ির সবচেয়ে দ্রুতগতির দৌড়বিদ হওয়ার পরও জাকির হোসেনের চোখে ছিল বিনয়, মুখে ছিল কৃতজ্ঞতা। নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে চান না তিনি। বরং মনে করেন, এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তার কোচ, টিম ম্যানেজার, বাবা-মা এবং সৃষ্টিকর্তার।
জাকির বলেন, ‘এখন অনেক আনন্দ হচ্ছে যে এই পর্যায়ে এসে এই পজিশনে জিততে পারছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নিলাম, তাই অনেক খুশি। আমার পেছনে আমার কোচ হুমায়ুন কবির স্যার অনেক পরিশ্রম করেছেন। এছাড়া আমার টিম ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম স্যারও অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাদের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। পিতামাতার দোয়া সবসময় সঙ্গে থাকে। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে চাইতাম এরকম একটা অবস্থানে দাঁড়ানোর। আজ এই জায়গায় দাঁড়াতে পেরে নিজেকে অনেক গর্বিত মনে করছি।’
Advertisement
ফুটবল মাঠ থেকেই শুরু হয়েছিল জাকিরের খেলোয়াড় হয়ে ওঠার গল্প। তবে ফুটবলার নয়, তাকে অ্যাথলেট বানানোর সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন তার বাবাই। ছেলের গতি দেখে তিনিই বুঝে ফেলেছিলেন, এই ছেলের আসল শক্তি অন্য জায়গায়।
সেই শুরুর গল্প বলতে গিয়ে জাকির বলেন, ‘অ্যাথলেটিকসের শুরুটা হয় আমার আব্বুর কাছ থেকে। আমি ফুটবল খেলতাম। ফুটবল খেলার সময় বল কন্ট্রোল করার চেয়ে আমি দ্রুত দৌড়াতাম। তখন আমার আব্বু আমাকে বললেন-'তুই দৌড়া, রানিং কর। ফুটবল খেলার দরকার নেই।' ওই জায়গা থেকেই আব্বুর হাত ধরে আমার শুরু।’
আরও পড়ুন গোলের নেশায় দারিদ্র্যকে হার মানাতে ছুটছে স্মৃতি কিসকোজাকিরের পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা কখনোই ছিল না। কুষ্টিয়ার একটি হাসপাতালে নাইট গার্ড হিসেবে কাজ করেন তার বাবা। সেই স্বল্প আয়ের সংসার থেকেই উঠে এসেছেন তিনি। সংসার চালানোই যেখানে পরিবারের জন্য কঠিন, সেখানে অ্যাথলেটিকসের মতো ব্যয়বহুল একটি খেলায় টিকে থাকাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু বাবার বিশ্বাস, কোচদের পরিশ্রম আর নিজের অধ্যবসায়কে পুঁজি করেই একের পর এক ধাপ পেরিয়েছেন জাকির।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও নিজের প্রাপ্তিকে ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখেননি তিনি। বরং এই অর্জনের সব কৃতিত্ব তুলে দিয়েছেন বাবার হাতে। আবেগঘন কণ্ঠে জাকির বলেন, ‘প্রতিযোগিতা থেকে পাওয়া সব টাকা ও পুরস্কার আমি আমার আব্বুর হাতে তুলে দেব। আমার কাছে আমার আব্বুই সবকিছু।’
ট্র্যাকে তার দৌড়ের ছন্দ আর বিস্ফোরক গতি অনেকের নজর কেড়েছে। তবে জাকির নিজে জানেন, সামনে পথটা আরও কঠিন। নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণ আর সঠিক পরিচর্যা পেলে নিজের গতিকে আরও শাণিত করতে চান তিনি। স্বপ্ন একটাই-একদিন বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ট্র্যাকে দৌড়ে দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরা।
এসকেডি/এমএমআর