আন্তর্জাতিক

ইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে চীন, মজুত ফুরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের: নতুন বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি নতুন করে বদলে দিচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। একদিকে কয়েক মাসের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অস্ত্র ব্যবহারে মজুত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনে চীনের দিকে ঝুঁকেছে ইরান।

Advertisement

একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি বলে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও আগের মতো নির্ভরযোগ্য থাকছে না। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হয়েছে এক নতুন বাস্তবতা, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি ও রাজনৈতিক সমীকরণও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ

ইরানের বিরুদ্ধে টানা প্রায় ৪০ দিনের সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময় হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় এবং ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়।

Advertisement

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা শিল্পকে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ৮৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও এখন নতুন হিসাব কষতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন>হঠাৎ ইরানে মার্কিন হামলা বন্ধের কারণ কী?ইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইরানের ‘আকস্মিক হামলায়’ উত্তেজনা ফের চরমে

ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দ্রুত পূরণ সম্ভব নয়

Advertisement

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) বলছে, যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষকদের মতে, একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে এখনই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিলেও যুদ্ধের আগের মজুত পর্যায়ে ফিরতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া বা অন্য কোনো বড় সংঘাত দেখা দিলে এই সীমিত মজুত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের পথে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধের পর নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চীনের তৈরি শত শত কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) ইরানে পৌঁছাতে পারে।

সূত্রগুলোর দাবি, ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় ৩০০ থেকে ৪০০টি কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো নিচু দিয়ে উড়তে থাকা যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম।

যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহের খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

যুদ্ধ বদলে দিয়েছে ইরানের সামরিক কৌশল

সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই অভিজ্ঞতার পরই সহজে বহনযোগ্য, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানান্তর করা যায় এমন অস্ত্রের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।

জানা গেছে, হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে পাকিস্তান হয়ে এসব অস্ত্র ইরানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও পাকিস্তান এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ম্যানপ্যাডস

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থায়ী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। ছোট দল সহজেই এগুলো পরিচালনা করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে শত্রুপক্ষের হামলায় এগুলো ধ্বংস করা তুলনামূলক কঠিন।

যদিও কিউডব্লিউ-১২ সর্বাধুনিক নয়, তবুও ড্রোন এবং নিচু দিয়ে উড়তে থাকা লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষা দিতে পারে।

ইরানের অর্থনীতি এখনো ভেঙে পড়েনি

যুদ্ধ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ধসে পড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা স্বনির্ভর অর্থনীতি, কৃষি, উৎপাদনশিল্প, সীমান্ত বাণিজ্য এবং বিকল্প তেল রপ্তানি ব্যবস্থার কারণে দেশটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে।

তবে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষ। বর্তমানে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থনীতি সচল থাকলেও জনগণের জীবনযাত্রার মান দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে নেতানিয়াহুর?

ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্ক আগের মতো দৃঢ় নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ইরান যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুকে ঘিরে প্রশ্ন বাড়ছে।

সম্প্রতি ট্রাম্পও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোন দেশে কী অস্ত্র বিক্রি করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নেবে।

নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। একই সময়ে দুর্নীতির মামলার বিচারও চলছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে।

এ অবস্থায় ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে এমন বার্তা দিতে চাইছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনে আগের মতো রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর নেই তার। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছেন।

আরও পড়ুন>হঠাৎ ইরানে মার্কিন হামলা বন্ধের কারণ কী?ইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ইরানের ‘আকস্মিক হামলায়’ উত্তেজনা ফের চরমে

কূটনীতিই কী শেষ ভরসা?

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল তিন পক্ষই সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে হচ্ছে, ইরান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, আর ইসরায়েলে নেতানিয়াহুকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পক্ষের পক্ষেই দীর্ঘ সময় একই মাত্রার সংঘাত চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে না। তাই মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কমাতে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, সিএনএন, রয়টার্স

এমএসএম