শিশুর সুন্দর ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য পরম মমতার পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ। বাবা-মায়ের সুচিন্তিত ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের ওপর নির্ভর করে সন্তানের ভবিষ্যৎ চরিত্র ও সাফল্য।
Advertisement
ইসলামি জীবনদর্শনে শাসন বলতে কোনো নিষ্ঠুরতা বা দমন-পীড়নকে বোঝানো হয় না; বরং শাসন হলো প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার আলোকে সন্তানকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেই ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মের দিকে প্ররোচিত করে, তবে আমার রব যার ওপর রহম করেন সে ছাড়া। (সুরা ইউসুফ: ৫৩)
প্রাপ্তবয়স্কদের মতো দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা একটি শিশুর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই থাকে না। তাই কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় তা অনুধাবন করার জন্য তার দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি আদর্শ পরিবারেই শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরার দিকনির্দেশনা ও নিয়মকানুন থাকা আবশ্যক।
তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে শাসন বা নিয়ন্ত্রণের অর্থ কখনোই স্বৈরাচারী মানসিকতা নয়। দায়িত্বশীল বাবা-মায়ের কর্তব্য সন্তানের বয়স, অনুধাবন করার ক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নিয়মকানুন তৈরি করা, ক্ষেত্রবিশেষে নমনীয়তা দেখানো, সমঝোতার সুযোগ রাখা।
Advertisement
অতিস্বাধীনতা অনেক সময় কম বয়সে শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের অভাবে নৈতিক স্খলন ঘটার ঝুঁকি থাকে। নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে বড় হলে শিশু নিরাপদ থাকে।
শিশুরা স্বভাবতই সরলমনা হয় এবং সঙ্গীদের কথায় সহজেই প্রভাবিত হয়। পারিবারিক শাসন ও নিয়ন্ত্রণ না থাকলে শিশুর কুসঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পরিবার ও সমাজের ক্ষতির কারণ হওয়ারও আশংকা থাকে।
শিশুর সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করা শিশুরা পড়াশোনা ও মেধা বিকাশ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের দৌড়ে এগিয়ে থাকে। তারা মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে পারিবারিক শাসনহীন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা শিশুরা অনেক সময়ই বখে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সাফল্য ও উন্নতির মাধ্যমে নিজের যেমন উপকারে আসে না, সমাজের অন্যান্যদেরও উপকারে আসে না।
Advertisement
পরিবারে সুশাসনের অনুপস্থিতিকে শিশুরা অনেক সময় বাবা-মায়ের অবহেলা বা ভালোবাসার অভাব হিসেবে বিবেচনা করে। কঠোর হলেও শৃঙ্খলা মূলত সন্তানের প্রতি মা-বাবার গভীর মমতা ও উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ, যা সন্তানকে এক ধরনের সুদৃঢ় সুরক্ষাবোধ ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতি দেয়।
নিয়ন্ত্রণের মূল ক্ষেত্রসমূহবাবা-মায়ের দায়িত্ব সন্তানের জীবনের কয়েকটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ রাখা:
১. বাইরে যাতায়াতসন্তান কার সঙ্গে, কোথায় যাচ্ছে এবং কতটা সময় বাইরে কাটাচ্ছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের পূর্ণ তদারকি থাকা প্রয়োজন।
২. সঙ্গী ও বন্ধু নির্বাচনরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।’ সুসঙ্গ চরিত্রের উন্নতি ঘটায়, আর কুসঙ্গ শিশুকে বিপথগামী করে। তাই শিশুর বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। রাত কাটানো বা অবাধ মেলামেশার মতো বিষয়গুলোকে নিরুৎসাহিত করা উচিত।
৩. মার্জিত ভাষাভাষায় মানুষের রুচি প্রকাশ পায়। ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকের (রহ.) বলেছেন, ‘জিহ্বা হলো সকল ভালো ও মন্দের চাবিকাঠি। তাই সোনা-রূপা পাহারা দেওয়ার মতোই বিশ্বাসীর উচিত নিজের জিহ্বাকে রক্ষা করা।’ অশ্রাব্য ও গালিগালাজের পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত অসংবেদনশীল বাক্য ব্যবহারেও সন্তানকে নিষেধ করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব।
৪. সময়ের সঠিক ব্যবহারবিনোদন বা অলস সময় কাটানোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত। টিভি দেখা বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করে কম্পিউটার শেখা, ভালো বই পড়া কিংবা সৃজনশীল শখের প্রতি শিশুদের উৎসাহিত করা আবশ্যক।
৫. আচরণগত শিক্ষাবড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, মসজিদে বা আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে সৌজন্য বজায় রাখা এবং যে কোনো ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বন্ধে কড়া নজর রাখতে হবে। অন্যায় করলে মৃদু ও উপযুক্ত উপায়ে সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে সে তার সীমানা বুঝতে শেখে।
বাবা-মায়ের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ একনায়কতান্ত্রিক আচরণ এড়িয়ে চলুন‘আমি বলেছি তাই করতে হবে’—এমন দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে কেন একটি নিয়ম তৈরি করা হয়েছে, তা সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন। বই ও গল্পের মাধ্যমে তাদের মহান ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টান্ত দিন। ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা ও যুক্তির মাধ্যমে শাসন করুন।
নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুনসন্তানকে শাসন করার সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন। ঘরকে কখনোই সেনাক্যাম্প বানাবেন না। অতিরিক্ত শারীরিক প্রহার, খোঁটা দেওয়া বা দীর্ঘ বক্তৃতা কোনো ভালো ফল আনে না। এতে শিশু হতাশায় ভুগতে পারে।
ভুল সংশোধনের সুযোগ দিনসন্তান ভুল করলে তাকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দিন এবং নির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত শাস্তি শেষ হওয়ার পর পুনরায় তার সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। দীর্ঘস্থায়ী রাগ সন্তানের মনে ক্ষোভ ও বিষাদের সৃষ্টি করে।
সন্তানের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের মানসিকতা তৈরি করুনবাহ্যিক শাসনের চেয়ে সন্তানের ভেতরে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ গড়ে তোলা বেশি কার্যকর। যখন একটি শিশু নিজে থেকে কোনো নিয়মের নৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে শিখবে, তখন সে পিতা-মাতার অনুপস্থিতিতেও নিজেকে অন্যায় থেকে দূরে রাখবে।
শেষ কথাসন্তান বাবা-মায়ের কাছে মহান আল্লাহর আমানত। তার সঠিক প্রতিপালন করা, প্রয়োজনে শাসন করা, অযত্ন-অবহেলা না করা, নির্যাতন না করা বাবা-মায়ের কর্তব্য। সন্তানকে শাসনের উদ্দেশ্য কখনোই সন্তানের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা বা তাকে সংকুচিত করা হতে পারে না; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো তাকে প্রজ্ঞাবান, দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে সুদৃঢ় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। অন্ধ ক্ষোভ কিংবা লাগামহীন শিথিলতা দুটিই সন্তানের জীবনের জন্য ক্ষতিকর। তাই বাবা-মাকে শাসন ও ভালোবাসার মাঝে সুনিপুণ ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সূত্র: আল ইসলাম ডট অর্গ
ওএফএফ