আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের মধ্যেই কারবালার পথে লাখ লাখ তীর্থযাত্রী!

আরবাইন উৎসব হলো শিয়া মুসলমানদের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ। পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটি এই আরবাইন উৎসব। সহজ ভাষায় বললে, আরবাইন উৎসব হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র এবং শিয়া মুসলমানদের তৃতীয় ইমাম, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র মাজারের উদ্দেশে পদযাত্রা। কারবালায় শহিদ ইমাম হুসাইনের স্মরণে পালিত ৪০তম দিনের শোক, স্মরণ ও তীর্থযাত্রার ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

Advertisement

আরবাইন অর্থ কী?

আরবাইন (আরবি: الأربعين) শব্দের অর্থ চল্লিশ। ইসলামি চান্দ্র মাস মহররমের ১০ তারিখে হুসাইন ইবনে আলি কারবালার যুদ্ধে শহিদ হন। সেই ঘটনার ৪০ দিন পর অর্থাৎ সফর মাসের ২০ তারিখে আরবাইন পালন করা হয়।

প্রতিবছর প্রায় কোটি মানুষ এতে অংশ নেন যদিও সঠিক সংখ্যা বছর ভেদে পরিবর্তিত হয়। এই উৎসব ঘিরে অনেকেই ইরাকের নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করেন।

এই উৎসবটি বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও বিভিন্ন দেশের অন্যান্য মুসলমান এবং কিছু অমুসলিম দর্শনার্থীও এতে অংশ নেন। এটি ইমাম হুসাইন ইবনে আলি-এর শাহাদাতের ৪০তম দিনে পালন করা হয়।

Advertisement

এবারের আরবাইন উৎসবে কত মানুষ উপস্থিত হবে?

ইরানের ওপর মার্কিন হামলা জেরে মধ্যপ্রাচ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আপাতত বন্ধ রয়েছে তবে যে কোনো মুহুর্তে তা আবার শুরু হতে পারে। এমন যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই এবারের আরবাইন উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। তাই এবারের উৎসবে জনসামাগম কিছুটা কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরাকের হজ ও তীর্থযাত্রা বিষয়ক ইরানের প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রধান ধারণা করছেন, এ বছরের আরবাইন পদযাত্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইরানি তীর্থযাত্রী অংশ নিতে পারেন।

ইরাকের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা-কে সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহসেন ইসমাইল সাগারচি বলেন, ইরাকি ও ইরানি জনগণের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সংহতি এবারের বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি জানান, সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির ইরাক সফরের সময় দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তীর্থযাত্রীদের জন্য লজিস্টিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে।

Advertisement

ইরানের আরবাইন তীর্থযাত্রা বিষয়ক কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের প্রধান আলি আকবর পুরজামশিদিয়ান জানিয়েছেন, চলতি বছর আরবাইন তীর্থযাত্রায় অংশ নিতে এ পর্যন্ত ২৩ লাখেরও বেশি মানুষ বাধ্যতামূলক এই নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।

তিনি বলেন, সামাহ হলো আরবাইন কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে ইরাকগামী তীর্থযাত্রীদের যাত্রা ব্যবস্থাপনা করা হয়। প্রতিবছর আরবাইন উপলক্ষ্যে লাখো ইরানি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিয়া মুসলিম ইরাকের কারবালায় যান।

কবে, কোথায় অনুষ্ঠিত হবে?

আরবাইনের প্রধান অনুষ্ঠান ইমাম হুসাইনের মাজারে অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরে আগামী ৪ আগস্ট এই উৎসব পালিত হবে। আগামী ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য আরবাইন উপলক্ষ্যে ইরান বিমান চলাচল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রদেশ ইলাম এখন ইরাকগামী তীর্থযাত্রীদের বিমানযোগে পরিবহনের প্রস্তুতি ঘোষণা দিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা।

ইলাম প্রদেশের শহীদা বিমানবন্দরের পরিচালক মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জানান, আসা জেট এয়ারলাইন আগামী দুই সপ্তাহের জন্য মাশহাদ ও তেহরান রুটে তীর্থযাত্রী পরিবহনে তাদের বহরের বিমান ব্যবহার করবে।

এছাড়া, আরবাইন তীর্থযাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত ও ভ্রমণ সহজ করতে ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান শিপিং কোম্পানি খোররামশহর ও ইরাকের বসরার মধ্যে নতুন যাত্রীবাহী সমুদ্রপথ চালু করেছে।

খোররামশহর বন্দর ও সমুদ্র বিষয়ক বিভাগের মহাপরিচালক আলি আসকারি মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জানান, আরবাইন উপলক্ষ্যে ইরাকের বসরা শহরে যাত্রাকারী তীর্থযাত্রীদের ভ্রমণ সহজ করতে এই সেবা চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, খোররামশহর যাত্রী টার্মিনাল ইতোমধ্যে তীর্থযাত্রীদের সেবা দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। এই টার্মিনালে একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫০০ যাত্রী ধারণের সক্ষমতা রয়েছে।

ওয়ালফাজর শিপিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাইমুর মাইলিকোহান বলেন, এই নতুন সেবা চালুর মাধ্যমে তীর্থযাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

আরবাইন উৎসব ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা:

আরবাইন তীর্থযাত্রীদের সীমান্ত পারাপার সহজ করতে এবং যৌথ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান-ইরাকের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী। ইরাকের খানাকিন শহরে অনুষ্ঠিত এক যৌথ সীমান্ত বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশের সীমান্ত কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিয়াসাত সেপেহরি এবং ইরাকের তৃতীয় অঞ্চলের সীমান্ত কমান্ডার মেজর জেনারেল আবদ আল-সাদা নিরোজ ইয়াসিন অংশ নেন।

বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ইরান-ইরাক সীমান্ত সম্পর্ক আরও উন্নত করা এবং আরবাইন তীর্থযাত্রীদের সীমান্ত পারাপারের অবকাঠামোর সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। বৈঠকে সেপেহরি সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখা, ক্ষুদ্র আকাশযান (এমএভি) নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত এলাকায় নির্মাণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সময়মতো তথ্য আদান-প্রদান, সীমান্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে, ইরাকের সীমান্ত কমান্ডার নিরোজ ইয়াসিন দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠক শেষে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।

আরবাইনের বিশেষত্ব: মাওকিব ও মানবসেবা

ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ ও ন্যায়বিচারের আদর্শ স্মরণ করতে প্রতিবছর এই উৎসব আয়োজন করা হয়। তবে, অনেকেই এটিকে অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাই আরবাইনে অংশ নিতে বহু তীর্থযাত্রী পায়ে হেঁটে ইরাকের পবিত্র নগরী কারবালায় যান। অনেকেই ইরাকের নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করেন।

এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রার্থনা, জিয়ারত, ধর্মীয় আলোচনা এবং মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা। এ সময় নাজাফ থেকে কারবালার পথে পথে ‘মাওকিব’ নামে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবী শিবিরে তীর্থযাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। চলতি বছরে ইরান ইরাকের পবিত্র স্থানগুলোতে প্রায় ৩ হাজার সেবা কেন্দ্র বা ‘মাওকিব’ পরিচালনার মাধ্যমে আরবাইন যাত্রীদের সেবা দেওয়া হবে।

এর পাশাপাশি ‘মাওকিব’ সম্পর্কে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আরবাইন সদর দপ্তর জানিয়েছে, শালামচে ও চাজাবেহ সীমান্ত ক্রসিংয়ে এক হাজারের বেশি মাওকিব (তীর্থযাত্রীদের স্বেচ্ছাসেবী সেবা দেওয়ার জন্য স্থাপিত অস্থায়ী কেন্দ্র) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তীর্থযাত্রীদের থাকার জন্য ৩৫০টি উপযুক্ত স্থাপনা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে প্রতি রাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অবস্থান করতে পারবেন। প্রদেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মাওকিব পাঠানো হয়েছে।

খুজেস্তানের আরবাইন সদর দপ্তরের প্রধান মাহমুদ মুসাভি বুধবার (২৯ জুলাই) জানান, ইসলামি বর্ষের দ্বিতীয় মাস সফরের শুরু থেকেই মাওকিব স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। এ বছর সফর মাস শুরু হয়েছে ১৬ জুলাই।

সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি/ প্রেস টিভি/ ইরনা

কেএম