দেশজুড়ে

গ্যাস সংকটে স্থবির আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল, শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা

গ্যাসের অভাবে থমকে আছে উৎপাদনের শেষ ধাপ শিপমেন্ট বিলম্বে বাড়ছে রপ্তানি উদ্বেগ কাজ কমে অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র আশুলিয়ায় গত কয়েকদিনের তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ কারখানার বয়লার সচল রাখা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদনের শেষ ধাপ—ফিনিশিং, আয়রন, ড্রয়িং ও প্যাকেজিং—ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময় মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।

Advertisement

শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের নিম্নচাপ নতুন সমস্যা নয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংকটজনক। উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে ব্যয়, ঝুঁকিতে পড়ছে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি আয়ে।

উৎপাদনের শেষ ধাপেই সবচেয়ে বড় সংকট

আশুলিয়ার জামগড়া, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর, বেরুন, শিমুলতলা, পলাশবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, বাইপাইল, জিরানী ও আশপাশের শিল্প এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও গ্যাসনির্ভর ইউনিটগুলো কার্যত অচল হয়ে আছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকরা কাজের অপেক্ষায় বসে সময় পার করছেন। আবার অনেক কারখানা বিকল্প ব্যবস্থায় সীমিত পরিসরে কাজ চালানোর চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন কাটছে না গ্যাস সংকট, রান্নায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে বাড়তি খরচের বোঝা  

কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে বয়লারে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে কাপড় ধোয়া, শুকানো, প্রেসিং, ফিনিশিংসহ উৎপাদনের শেষ ধাপগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একটি পোশাক উৎপাদনের পুরো চক্র ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শেষ পর্যায়ের কাজ আটকে গেলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা ধীর হয়ে পড়ে।

Advertisement

তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে কারখানায় উপস্থিত হলেও অনেক সময় কাজ শুরু করা যায় না। গ্যাস না থাকায় মেশিন বন্ধ থাকছে, ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা যেমন কমছে, তেমনি অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।

শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা

প্রজন সোয়েটার কারখানার পরিচালক আহমেদ মোর্তুজা বলেন, সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়সীমা বা শিপমেন্ট ঘিরে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সুনাম অনেকাংশেই সময়মতো পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সময়সীমা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদনের প্রায় সব ধাপ সম্পন্ন হলেও শেষ পর্যায়ে এসে কাজ আটকে যাচ্ছে। বয়লার চালাতে না পারলে ফিনিশিং ও আয়রন করা সম্ভব নয়। ফলে পণ্য প্যাকিং করে বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না। এতে শিপমেন্ট পিছিয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন, বাসায়ও জ্বলছে না চুলা

আরেক কারখানা কর্মকর্তা রিপন সরকার বলেন, বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য চান। নির্ধারিত সময় পার হলে অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে হয়। কখনো কখনো ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড় হবে।

Advertisement

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশুলিয়া দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানকার শত শত কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদিত হয় এবং সেগুলো ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু একটি কারখানা নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়ে। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবলেও তা সব ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। উপরন্তু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

একাধিক শিল্প মালিকদের অভিযোগ, গ্যাসের সংকট নতুন নয়। বিভিন্ন সময় স্বল্পচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দিনের পর দিন পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে।

আরও পড়ুন আবাসিক ও শিল্পে চরম গ্যাস সংকট, স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি চরমে

তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এই শিল্প থেকেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় অংশ আসে। উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে।

অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা

এদিকে শ্রমিকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমে যেতে পারে কিংবা কোনো কোনো কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন সীমিত করতে পারে। যদিও অধিকাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবুও সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোহরাব হোসেন নামের শ্রমিক বলেন, সকাল থেকে কারখানায় আছি। কিন্তু গ্যাস না থাকায় কাজই শুরু করা যাচ্ছে না। বসে থাকতে হচ্ছে। কাজ না হলে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।

আরেক শ্রমিক রাজন বলেন, প্রতিদিনই একই অবস্থা। কখন গ্যাস আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজের গতি কমে যাওয়ায় সবাই দুশ্চিন্তায় আছি।

আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভগের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বুলবুল বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এ অবস্থায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। তাই শিল্প খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়, বরং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখারও অন্যতম শর্ত।

আরও পড়ুন আগামী সপ্তাহে গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনাল বিপণন অফিসের ম্যানেজার প্রকৌলশী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বলেন, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় এখনো জানা যায়নি।

এমএআরএন/কেএইচকে/জেআইএম