মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের উড়াল অংশ নির্মাণ কাজের মতো রাজধানীর প্রথম পাতাল মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের ডিপো নির্মাণের কাজ চীনের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। তবে ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক থেকে প্রস্তাবটি প্রত্যহার করে নেওয়া হয়েছে।
Advertisement
বুধবার (২৯ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে প্রস্তাবটি রাখা হয়। তবে আলোচনা থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। বৈঠকের আলোচ্যসূচি অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রস্তবটির অনুমোদন চাওয়ার কথা ছিলো। তবে ডিপিপিতে টাকা না থাকায় প্রস্তবটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
মেট্রোরেলের প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করার কারণ জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত এক সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, প্রস্তাবে কোনো ত্রুটি ছিল না। মূল বিষয় হলো, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের জন্য বর্তমানে ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান নেই। অর্থের ঘাটতির কারণেই প্রস্তাব দুটি আপাতত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
Advertisement
তা হলে কি প্রস্তাবটি পরে আবার উপস্থাপন করা হবে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত যেহেতু ডিপিপিতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, তাই প্রস্তাব দুটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অর্থের সংস্থান ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন প্রথম পাতাল রেলের ডিপো নির্মাণের কাজও পাচ্ছে চীনের প্রতিষ্ঠানজানা যায়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এই ডিপো নির্মাণের কাজ সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হচ্ছে ৪ হাজার ২৮৫ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৫৮ টাকা। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (লাইন-১)-এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার পাতাল মেট্রোরেল এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ হবে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল ব্যবস্থা।
Advertisement
ডিপো নির্মাণসংক্রান্ত এ প্যাকেজের আওতায় ওয়ার্কশপ, স্ট্যাবলিং শেড, পরিচালনা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, কারিগরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, সহায়ক উপকেন্দ্র, ট্র্যাকশন উপকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়। দরপত্র আহ্বান করা হলে ১৭টি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্যতা দলিল ক্রয় করে। তবে নির্ধারিত সময়ের চারটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্যতার দলিল দাখিল করে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। পরে তিনটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয় এবং কারিগরি মূল্যায়নে তিনটিই উত্তীর্ণ হয়।
আর্থিক দরপত্র মূল্যায়নে সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তাদের মূল দর ছিল ৩ হাজার ৩৫৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ভ্যাট, উৎসে আয়কর ও কাস্টমস শুল্ক যুক্ত হওয়ায় চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৮৫ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৫৮ টাকা। ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস শুল্ক বাদ দিলে সুপারিশ করা দর দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ কম, যা সরকারের জন্য ব্যয় সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এ প্যাকেজের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২৩০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে বর্তমান সুপারিশ করা চুক্তিমূল্য ওই বরাদ্দের তুলনায় ৩ হাজার ৫৪ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থ প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে সংস্থান করা হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্প সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশোধিত প্রস্তাবে এ প্যাকেজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া জাইকার ক্রয় নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাক-যোগ্যতা, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক মূল্যায়ন ও দর-কষাকষির প্রতিটি ধাপে জাইকার অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কোনো সদস্য ভিন্নমত দেননি।
গত ৬ জুন অনুষ্ঠিত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ৭২তম সভায় এ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পর বিষয়টি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এমএএস/এমএএইচ/