ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক প্রগতি সরণি। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে বিমানবন্দর, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের চলাচল। অথচ বছরজুড়ে এ সড়কে লেগে থাকে তীব্র যানজট। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে অসংখ্য কর্মঘণ্টা, এ পথে চলাচলে নগরবাসীর উঠেছে নাভিশ্বাসও।
Advertisement
বর্তমানে এ সড়কে যানজট আরও বাড়িয়ে তুলেছে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ইউটিলিটি হস্তান্তরের কাজ এবং একই এলাকায় ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি। এতে এখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সড়কটির স্বাভাবিক গতি। পুরো এলাকায় দেখা দিয়েছে এক ধরনের অচলাবস্থা। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এই সড়কে চলাচলকারী যাত্রী, চালক ও পথচারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, এমআরটি লাইন-১ এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দর থেকে কুড়িল হয়ে প্রগতি সরণি পর্যন্ত ইউটিলিটি হস্তান্তর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। বর্তমানে হোসেন মার্কেটের সামনে, উত্তর বাড্ডা, শাহজাদপুরের কনফিডেন্ট সেন্টারের সামনে, নতুনবাজার, যমুনা ফিউচার পার্কসহ সড়কের মোট ১২টি স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এর মধ্যে যমুনার সামনে দ্বিতীয় দফায় খোঁড়াখুঁড়ি করছে ঢাকা ওয়াসা।
আরও পড়ুন প্রগতি সরণির ৫ মিনিটের পথ এক ঘণ্টায়গণপরিবহন চলাচলকারী যাত্রীদের অভিযোগ, যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে প্রগতি সরণির ওই অংশে বছরখানেক আগে এমআরটি-১ এর ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ করা হয়েছিল। এখন আবার একই এলাকায় ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য নতুন করে সড়ক খোঁড়া হচ্ছে। এতে তাদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। পরিকল্পিত সমন্বয় থাকলে একাধিক সংস্থার কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তারা।
Advertisement
গত সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে রামপুরা থেকে কুড়িল পর্যন্ত সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। বিশেষত, হোসেন মার্কেটের সামনে থেকে দুই পাশের তিন লেন করে মোট ছয় লেনের সড়কে বর্তমানে প্রতিটি পাশে মাত্র একটি করে লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ফলে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
বাসের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে থাকতে শারীরিক-মানসিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। যানজটের কারণে পুরো দিনের পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু মানুষের কষ্ট কমানোর ব্যবস্থাও থাকা উচিত।—কামরুল ইসলাম
রামপুরা থেকে কুড়িল পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ। সাধারণ সময়ে এ পথ পাড়ি দিতে যেখানে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে, সেখানে এখন বাসে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। অফিসগামী, শিক্ষার্থী ও রোগী বহনকারী যানবাহন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে।
প্রতিদিন দক্ষিণ বাড্ডা থেকে বাসে চড়ে উত্তরায় অফিস করেন কামরুল ইসলাম। সোমবার বিকেলে অফিস শেষে তিনি উত্তরা থেকে রাইদা পরিবহনের বাসে বাড্ডা যাচ্ছিলেন। আলাপকালে কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিদিন অফিসে যেতে এখন অন্তত এক ঘণ্টা আগে বের হতে হচ্ছে। তারপরও সময়মতো পৌঁছানো যায় না।
Advertisement
‘বাসের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে থাকতে শারীরিক-মানসিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। যানজটের কারণে পুরো দিনের পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু মানুষের কষ্ট কমানোর ব্যবস্থাও থাকা উচিত’—বলছিলেন এক ভুক্তভোগী।
মিরপুর থেকে বাড্ডা লিংক রোড হয়ে ডেমরা যাতায়াত করে আলিফ পরিবহনের বাস। এই পরিবহনের বাসগুলোর ডেমরা যেতে লিংক রোড থেকে প্রগতি সরণি, হোসেন মার্কেট হয়ে প্রায় শাহজাদপুর ঘুরে আসতে হয়। আগে স্বাভাবিক সময়ে ওই জায়গা ঘুরে আসতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগতো। এখন ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের কমে হচ্ছে না। কখনো কখনো তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন রাজধানীতে যত্রতত্র দূরপাল্লার বাস কাউন্টার, তীব্র হচ্ছে যানজটআলিফ পরিবহনের চালক খোকন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রগতি সরণির ওই ইউটার্ন নিতে গিয়ে যানজটে যাত্রীদের সবাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। অনেকে বাড্ডা লিংক রোডে নেমে সড়ক পার হয়ে বিকল্প বাসে উঠে ডেমরার পথ ধরেন। এতে পরিবহনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার যানজটে বাস চালাতেও কষ্ট হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এক ট্রিপ শেষ করতেই আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। একই গাড়ি দিয়ে আগে যত ট্রিপ দেওয়া যেতো, এখন তার অর্ধেকও সম্ভব হচ্ছে না। এতে যাত্রীরাও কষ্ট পাচ্ছেন, আমরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
যানজটের পাশাপাশি পথচারীদের দুর্ভোগও কম নয়। নির্মাণকাজের জন্য সড়কের বিভাজক সরিয়ে সেখানে স্টিলের অস্থায়ী বেষ্টনী বসানো হয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় মানুষকে নির্ধারিত পারাপারের স্থান থেকে অনেক দূরে গিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-১ এর কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াসাকে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, গত ১০ মে কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী ১৫ অক্টোবর।—ঢাকা ওয়াসা
হোসেন মার্কেটের সামনে রাস্তা পার হতে অপেক্ষমাণ আমীর হোসেন নামের একজন পথচারী বলেন, ‘আগে সড়ক বিভাজকের নির্দিষ্ট জেব্রা ক্রসিং দিয়ে সহজে রাস্তা পার হতাম। এখন অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের নিয়ে চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে।’
‘সড়ক পার হওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ব্যারিকেডের ফাঁক দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে’—বলছিলেন আমীর হোসেন।
যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দ্বিতীয় দফায় খোঁড়াখুঁড়ি এ সড়কে জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রথম প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে এমআরটি লাইন-১ এর ইউটিলিটি হস্তান্তরের খোঁড়াখুঁড়ি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে সড়কের বিভিন্ন অংশে কাজ চলমান। এরই মধ্যে সড়কের একই স্থানে ঢাকা ওয়াসার গন্ধর্বপুর পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে জনভোগান্তি বেড়েছে।
আরও পড়ুন সাইকেল লেনেও পার্কিং-দোকান, চলছে বাস-ট্রাক ঘেঁষেসরেজমিনে দেখা যায়, যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ঢাকা ওয়াসার ‘গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার থেকে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের ৪৫০ মিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপনের কাজও চলছে। এ কাজের জন্য সড়কের চারটি লেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যানবাহন চলছে মাত্র দুটি লেনে। এ কারণে সড়কটিতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট।
প্রগতি সরণিতে যানবাহনের অনেক চাপ। এ সড়কে চট্টগ্রাম বিভাগে যাতায়াত করা হাজারো বাস, ট্রাক চলাচল করে। এ কারণে ওয়াসা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এখন রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কাজ চলে। এ কারণে কাজেরও গতি নেই।—হাবিবুর রহমান
গুলিস্তান থেকে প্রগতি সরণি হয়ে যাত্রী পরিবহন করে ভিক্টর পরিবহন বাস। এ পরিবহনের চালক আবু হানিফ বলেন, ‘আগে গাড়ি চালাইতাম তিন লেনে। এখন এক লেন দিয়ে এত গাড়ি চললে যানজট তো হবেই। কাজ চলুক, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানায়, এমআরটি লাইন-১ এর কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াসাকে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, গত ১০ মে কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী ১৫ অক্টোবর। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ওয়াসা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না জিও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।
যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে ওয়াসার এ কাজের তদারকি করেন প্রকল্পটির উপ-সহকারী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান।
জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমআরটি-১ এর সঙ্গে ওয়াসার ওই লাইনের কাজ একসঙ্গে করার সুযোগ ছিল না। এজন্য আগে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কাজ শেষ করা হয়েছে। এখন যমুনার সামনের সড়কের ওয়াসার কাজ আগামী ১০ দিনের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।’
ওয়াসার এ প্রকল্প কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রগতি সরণিতে যানবাহনের প্রচুর চাপ। এ সড়কে চট্টগ্রাম বিভাগে যাতায়াত করা হাজারো বাস, ট্রাক চলাচল করে। এ কারণে ওয়াসা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এখন রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কাজ চলে। এ কারণে কাজেরও গতি নেই। এতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজনও বিরক্ত। তারপরও জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করা হবে।’
এমএমএ/এমকেআর/ এমএফএ