খেলাধুলা

মেঠোপথ পেরিয়ে ট্র্যাকে ঝড়, কিশোরগঞ্জের মারিয়ার ডাবল গোল্ড

প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার দুর্গম পথ অতিক্রম, প্রতিকূল পরিবেশ এবং পরিবারের চরম দারিদ্র্য-কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। লাল ট্র্যাকে তীব্র গতি আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দিয়ে দেশের উদীয়মান ক্রীড়াবিদদের সবচেয়ে বড় আসর ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে’ একক আধিপত্য দেখালো ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী।

Advertisement

বলছিলাম কিশোরগঞ্জের কৃতী সন্তান মারিয়া আক্তার তাসফিয়ার কথা। জাতীয় পর্যায়ের এই অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় বালিকা বিভাগে ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে ডাবল চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের প্রতিভার অনন্য সাক্ষর রেখেছে সে। আঞ্চলিক বাছাইপর্ব পেরিয়ে ঢাকা অঞ্চলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করলেও মারিয়ার আসল পরিচয় সে কিশোরগঞ্জের মেয়ে। কঠোর পরিশ্রম আর সাধনার মাধ্যমে সে আজ নিজেকে দেশের অন্যতম সেরা উদীয়মান স্প্রিন্টার হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ট্র্যাকে টাইমিংয়ের ঝড়

প্রতিযোগিতার গতি নির্ধারণী দুটি ইভেন্টেই নিজের টাইমিংয়ের দারুণ উন্নতি দেখিয়ে স্বর্ণ জয় করে মারিয়া।

Advertisement

১০০ মিটার স্প্রিন্ট: হিটে ১৩.৮২ সেকেন্ড সময় নিয়ে ফাইনালে ওঠা মারিয়া ফাইনালে ট্র্যাকে ঝড় তোলে। মাত্র ১৩.৭৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১ম স্থান অর্জন করে।

দুটি ইভেন্টেই স্বর্ণ জয় করে মারিয়া

২০০ মিটার স্প্রিন্ট: ১০০ মিটারের সাফল্যের পরই ২০০ মিটারের ট্র্যাকেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে। ২৮.৯৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে জয় করে নেয় নিজের দ্বিতীয় স্বর্ণপদক। এই ইভেন্টে খুলনার অধরা ঐশী (২৯.১৬ সেকেন্ড) দ্বিতীয় ও ময়মনসিংহের রাফিয়া আক্তার (২৯.৮৫ সেকেন্ড) তৃতীয় হন।

মেঠোপথ পেরিয়ে স্বপ্নের চূড়ায়

Advertisement

মারিয়ার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সেহড়া পূর্ব পাড়া। গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. হিরন মিয়ার ৫ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার ছোট মেয়ে মারিয়া। স্থানীয় আলহাজ্ব ওয়াজেদুল ইসলাম খাঁন উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে।

গ্রামের মেঠোপথের প্রতিকূলতা কাটিয়ে মারিয়া করেছে অনুশীলন

অনুশীলনের জন্য মারিয়াকে প্রতিদিন বাড়ি থেকে জেলা সদরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হতো। বিশেষ করে বর্ষাকালে গ্রামের মেঠোপথের প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা ডিঙিয়ে নিয়মিত অনুশীলন চালানোটা ছিল বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। তবে কৃষক বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন এবং পরিবার ও স্থানীয় কোচের দিকনির্দেশনা তাকে থামতে দেয়নি।

সাফল্যে অশ্রুসজল বাবা

মেয়ের এমন অভাবনীয় সাফল্যের খবর শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি বাবা মো. হিরন মিয়া।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ একজন কৃষক। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন সংসারে ছোট মাইয়াডার খেলার খরচ চালানো কত যে কষ্টের আছিল, তা বলে বোঝাইতে পারুম না। বর্ষার দিনে কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে যখন ও প্র্যাকটিসে যাইতো, কষ্ট দেখে বুকটা ফেটে যাইতো। কিন্তু মেয়ের অদম্য ইচ্ছা দেইখা কোনোদিন না করি নাই। আজ যখন হুনলাম আমার মাইয়া দেশের সেরা অইছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মেডেল পাইছে, মনে হইতেছে আমার জীবনের সব কষ্ট সার্থক অইছে। আমি চাই আমার মাইয়া আরও বহুদূর যাক, দেশের নাম উজ্জ্বল করুক।’

বাবা হিরন মিয়ার (বাঁদিকে) সঙ্গে মারিয়া

মারিয়ার সাফল্যে গ্রামবাসী ও স্কুলেও আনন্দের জোয়ার

মারিয়ার এই অভাবনীয় অর্জনে কেবল তার পরিবারই নয়, আনন্দে ভাসছে পুরো গ্রাম ও তার বিদ্যালয়। এলাকার যুবক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমাদের এলাকার মারিয়া দৌড়ে দেশের সেরা হয়েছে, এতে আমরা অনেক আনন্দিত। একজন মেয়ে হয়েও সে সব বাধা ও কটু কথা পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। আমরা দোয়া করি সে যেন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে।’

বিদ্যালয়ের ছোট ভাই-বোনদের মাঝেও মারিয়াকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দারুণ উদ্দীপনা। মারিয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী প্রণয় বলছিল, ‘আমাদের স্কুলের বড় আপু দৌড়ে সারা দেশে প্রথম হয়েছে-এই খবরে আমরা সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। এখন বহু মানুষ মারিয়া আপুকে দেখতে আসছে, এতে আমাদের স্কুলের নামও চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।’

মারিয়ার অর্জনে আনন্দে ভাসছে পুরো গ্রাম

প্রতিবেশী নয়ন মিয়া মারিয়ার সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘মারিয়া আমাদের গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে, সে এখন আমাদের পুরো গ্রামের গর্ব। মারিয়ার এই সফলতার পেছনের কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। প্রতিনিয়ত কাদামাটি পেরিয়ে কষ্ট করে সে জেলা সদরে গিয়ে দৌড়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আজ তার সেই কষ্টের ফল মিলেছে।’

অলিম্পিক ট্র্যাকে দেখার স্বপ্ন কোচের

মারিয়াকে ট্র্যাকে একদম গুটিগুটি পায়ে গড়ার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই কোচ মো. আব্দুল জব্বার বলেন, ‘মারিয়ার এই পথচলাটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। প্রতিকূল পরিবেশ, সঠিক পুষ্টির অভাব এবং দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তি সত্ত্বেও অনুশীলনে ওর যে একাগ্রতা ছিল, তা সত্যি বিরল। প্রতিদিনের মেঠোপথের দূরত্ব ওর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হেরে গেছে। ১০০ মিটার ও ২০০ মিটারে ওর এই টাইমিং প্রমাণ করে ওর ভেতর জন্মগত প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ রয়েছে। তবে এটি তো কেবল শুরু! সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদি উন্নত কোচিং সাপোর্ট পেলে এই মারিয়াই একদিন এশিয়ান গেমস কিংবা অলিম্পিকের ট্র্যাকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরবে।’

প্রধানমন্ত্রীর স্নেহে আবেগাপ্লুত মারিয়া

বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের সমাপনী আয়োজনে ১০০ মিটার স্প্রিন্টের ফাইনাল উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী মারিয়াকে কাছে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে প্রশংসা করেন এবং বিজয়ীদের হাতে মেডেল তুলে দেন।

মারিয়াকে কাছে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী 

প্রধানমন্ত্রীর এই স্বীকৃতিতে আবেগাপ্লুত মারিয়া বলে, ‘অনেক ভালো লাগছে। আমি কখনো ভাবিনি এভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা ও কথা বলার সুযোগ পাবো। ওনার সামনে দৌড়ে ট্র্যাক শেষ করার পর যে সম্মান পেয়েছি, তাতে আমি অভিভূত।’

মাত্র ১৪ বছর বয়সেই দেশের মাটি কাঁপানো এই বিস্ময়বালিকার স্বপ্ন এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চ। নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে মারিয়া জানায়, ‘আমার স্বপ্ন একজন বড় অ্যাথলেট হওয়া, দেশ ও আমার মা-বাবার জন্য কিছু করা। একদিন এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিক গেমসের ট্র্যাকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে দৌড়ানোর স্বপ্ন দেখি।’

দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস

মারিয়ার এই ঐতিহাসিক জয়ে তার নিজ গ্রাম সেহড়াসহ পুরো কিশোরগঞ্জ জেলায় বইছে আনন্দের বন্যা। কিশোরগঞ্জের জেলা ক্রীড়া অফিসার মাহমুদা আক্তার জানান, মারিয়া মূলত কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে অভিজ্ঞ ট্রেনার জব্বার সাহেবের অধীনে অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় তার মেধা দেখে জাতীয় পর্যায়ের জন্য টানা দুই সপ্তাহের বিশেষ ও নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। স্টেডিয়ামে সুযোগ-সুবিধার কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মারিয়ার শারীরিক সামর্থ্য (স্ট্রেন্থ), দৌড়ের স্টেপ কারেকশন এবং এনার্জি লেভেল বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল।

জয়ের পর মারিয়া

তিনি আরও জানান, মারিয়া দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ক্রীড়া অফিস ও স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়মিত যাতায়াত খরচসহ অনুশীলনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছিল। মারিয়ার ভবিষ্যৎ ক্রীড়াজীবন নির্বিঘ্ন করতে সরকারি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ‘ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’র আসন্ন সেশনে তার ক্রীড়া বৃত্তির আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে তার জন্য আর্থিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কেআরএম/এমএমআর