নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মানুষ যখন কোনো গুনাহ করে, আল্লাহর কোনো নিষিদ্ধ পথে যায় বা কোনো একটা পাপের কাজ করে—ধরা যাক, মোবাইলে একটা হারাম জিনিস দেখে ফেললেন, একজন পুরুষ পরনারীর ছবি দেখলেন কিংবা মজা নিয়ে গুনাহের কাজ করলেন—এর ফলে অন্তরে একটি কাল দাগ পড়ে যায়। হাদিসে এসেছে, একটা গুনাহ করলে একটা দাগ পড়ে, আরেকটা গুনাহ করলে আরেকটা দাগ পড়ে। এভাবে দাগ পড়তে থাকে। একটা স্বচ্ছ আয়নার ওপরে অনেক ময়লা জমলে যেমন ওই আয়নায় নিজের চেহারা ভালোভাবে বোঝা যায় না, ঠিক একইভাবে একটা অন্তরে যখন অনেক গুনাহ জমে কলুষতায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন সেই অন্তর দিয়ে আর কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা হক কোনটা বাতিল, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা কিংবা কোনটা জান্নাতের পথ আর কোনটা জাহান্নামের পথ তা নিরূপণ করা যায় না।
Advertisement
অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখতে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সর্বোচ্চ সংগ্রাম করতে হবে। এরপরও যদি ভুলবশত গুনাহ হয়ে যায়, অর্থাৎ অন্তরে যে দাগ পড়ে গেছে, তা দূর করার উপায়ও শরিয়তে রয়েছে। গ্লাস পরিষ্কার করার জন্য যেমন গ্লাস ক্লিনার আছে, ঠিক একইভাবে অন্তর পরিষ্কার করার জন্য রয়েছে কলব বা অন্তর ক্লিনার, আর তার নাম হলো তওবা। বান্দা যখন তওবা করে এবং যথাযথভাবে তওবা করতে পারে, তখন তার অন্তরের সেই কাল দাগগুলো মুছে যায়।
সুতরাং নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে প্রথম পদক্ষেপ হলো, পাপ বা গুনাহর পথ থেকে ফিরে আসা। এ জন্য অনেক নফল নামাজ, প্রচুর নফল দান-সদকা, অতিরিক্ত তাসবিহ পাঠ কিংবা অবিরাম তেলাওয়াত না হলেও চলবে; কিন্তু গুনাহ ত্যাগ করা ছাড়া কোনোভাবেই চলবে না। চোখের গুনাহ কিংবা মুখ দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গিবত ও বেহুদা কথা বলার মতো যেসব বিষয় কোরআন ও হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে, সেগুলো বর্জন করার চেষ্টা করতে হবে। যদি মনের অজান্তে কোনো অন্যায় বা গুনাহ হয়ে যায় এবং তা টের পাওয়া যায় যেমন কাউকে উদ্দেশ্য করে অন্যায্য কথা বলা, তবে দেরি না করে সাথে সাথে রিমুভার দিয়ে তা রিমুভ করতে হবে, অর্থাৎ তওবা করতে হবে। আল্লাহর দরবারে বিনয়ের সাথে স্বীকার করতে হবে, ‘হে আল্লাহ, আমি অন্যায় করেছি, আর করব না।’
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব। যে অন্তর নিরাপদ, সুস্থ, স্বাভাবিক এবং যার ভেতরে দুনিয়ার মোহ, হিংসা, বিদ্বেষ বা কোনো প্রকার খারাপ কিছু নেই, সেই ফ্রেশ অন্তরটিই কেয়ামতের দিন মানুষের কাজে আসবে। এজন্য নিজেদের পরিশুদ্ধ করবার গুরুত্ব আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
Advertisement
সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমরা সবাই প্রায় নিজের চেয়ে অন্যকে নিয়ে বেশি ভাবি। অমুক কী করল, তমুক কী বলল, কার কী করা উচিত ছিল কিংবা কার কী সমস্যা আছে এসব নিয়ে আমরা ব্যস্ত থাকি। ফলে আমার নিজের ভেতরে কি সমস্যা আছে, তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ সাধারণত আমাদের হয়ে ওঠে না। মহান আল্লাহ তাআলা যখন আমাদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, তখন একটি পবিত্র ও কলুষমুক্ত মন দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কেয়ামতের দিন তিনি আবার সেই পরিচ্ছন্ন মনটাই ফেরত বুঝে নেবেন।
বান্দাকে আল্লাহ বলবেন, তোমাকে আমি একটি ফ্রেশ ও রোগমুক্ত অন্তর দিয়ে পাঠিয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার কাছে এসেছ এমন একটি অন্তর নিয়ে যেখানে শত শত মানুষের প্রতি শত্রুতা, বিদ্বেষ, অহংকার, লোভ, মোহ ও দুনিয়ার সমস্ত বাতিনি রোগে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা এই রোগাক্রান্ত অন্তর গ্রহণ করবেন না; তিনি যে পরিচ্ছন্ন অন্তর দিয়েছিলেন, সেটাই ফেরত চান। যদি তা দিতে হয়, তবে এখন থেকেই আত্মশুদ্ধির অভিযানে নামতে হবে এবং নিজেদের সংশোধনের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
ইমানদারদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো এবং নেককার, আল্লাহওয়ালা ও মুত্তাকি মানুষের সাহচর্যে থাকো। নেককারদের পরিবেশ মানুষকে নেককার করে, আর বদকারদের পরিবেশ মানুষকে বদকার বানায়। সৎ সঙ্গ মানুষকে যত দ্রুত পরিবর্তন করে, অন্য কোনো কিছু এত দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে না। এক বস্তা ভালো আলুর মধ্যে একটা পচা আলু রেখে দিলে যেমন সেই পচা আলুর সংস্পর্শে এসে বাকি আলুগুলোও পচতে শুরু করে, মানুষের সঙ্গও ঠিক তেমনি। এ জন্য দুনিয়ার মোহমুক্ত ও অহংকারহীন ভালো মানুষদের সাথে চললে নিজের ভেতরেও বিনয় ও নম্রতা আসবে। আত্মশুদ্ধির জন্য আল্লাহওয়ালা ও মুত্তাকী মানুষদের সাহচর্য অবলম্বন করা অন্তর পরিশুদ্ধ করতে দ্বিতীয় করণীয়।
তৃতীয় কাজ হলো, আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে দোয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা আতি নাফসি তাকওয়াহা ও জাক্কিহা আনতা খাইরু মান জাক্কাহা’। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে আপনি পবিত্র করে দিন, পরিশুদ্ধ করে দিন এবং নোংরামি ও কলুষতা থেকে একে পরিচ্ছন্ন রাখুন। নবীজি সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত এই দোয়া করতেন, আমাদেরও এই দোয়া নিয়মিত করতে হবে।
Advertisement
অন্তর পরিশুদ্ধ করতে এই ত্রিমুখী প্রচেষ্টা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, গুনাহ হয়ে গেলে তওবা করা এবং নেককারদের সাহচর্যের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে দোয়া করা আজ থেকেই শুরু করুন। নিজের ভেতরের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে লিখে ফেলুন; লোভ, অহংকার, মানুষকে তাচ্ছিল্য করা কিংবা অন্য কোনো বদরোগ আছে কি না। তারপর সেগুলো একটা একটা করে দূর করার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, হালাল উপার্জন, পর্দা করা কিংবা বাবা-মার কথা শোনার মতো বিষয়গুলো যেমন ফরজ; একইভাবে নিজেকে সংশোধন করা, অন্তরের পরিশুদ্ধির জন্য উদ্যোগী হওয়াও ফরজ। বরং এটা এমন এক ফরজ, যার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনের সুরা শামসে সাতটি আয়াতের মধ্যে টানা ১১ বার শপথ করেছেন। ১১ বার শপথ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। আর যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়। (সুরা শামস: ৯, ১০)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারল, যার আত্মশুদ্ধি হয়ে গেল, সেই ব্যক্তিই সফলকাম হলো এবং জান্নাতি হলো। আর যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারল না, যার মধ্যে অহংকার, দুনিয়ার মোহ, হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা রয়ে গেল, সে বাইরে যতই সুন্দর হোক, নিয়মিত নামাজ পড়ুক কিংবা দাড়ি রাখুক না কেন, তার আত্মা যদি অপবিত্র ও বাতেনি গুনাহে ভরা থাকে, তবে সে ক্ষতিগ্রস্ত ও জাহান্নামী।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ বা টুকরো রয়েছে; সেটি যদি ঠিক হয়ে যায়, তবে পুরো শরীরটাই ঠিক হয়ে যায়। আর যদি সেই অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যায়, তবে পুরো শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়, সেটি হলো মানুষের অন্তর বা কলব। নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, তাকওয়ার অবস্থান হলো অন্তরে। রাজধানী যদি ঠিক থাকে, তবে হাত, মুখ, চোখসহ সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার নির্দেশ অনুযায়ী সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। কিন্তু ভেতরে যখন অহংকার থাকে, তখন বাইরে বিনয়ের ভান করলেও আদতে অন্তর নোংরাই থেকে যায়।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল চ্যানেলে প্রকাশিত তার বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ