বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, এই প্রশ্নটি শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণের প্রশ্ন নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
Advertisement
বাংলাদেশ একটি মন্ত্রিপরিষদ শাসিত রাষ্ট্র। সংবিধান অনুযায়ী দেশের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে ন্যস্ত। বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামোতেও প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাই অনেকের কাছে মনে হতে পারে, রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক।
কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি শুধু ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠান, নৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থার ওপর। একজন রাষ্ট্রপতির হাতে হয়তো প্রতিদিনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, কিন্তু তার হাতে থাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার সুযোগ।
এই কারণেই রাষ্ট্রপতির নির্বাচন শুধু একজন মানুষ নির্বাচন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের মূল্যবোধ নির্বাচন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতিনিধি নন; তিনি হবেন পুরো বাংলাদেশের প্রতিনিধি। তার প্রথম পরিচয় হবে না রাজনৈতিক, বরং হবে নৈতিক।
Advertisement
প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত নয়, কে সবচেয়ে জনপ্রিয়? প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কে সবচেয়ে যোগ্য? প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়, কে কার কাছে গ্রহণযোগ্য? প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবেন?
আরও পড়ুন মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট: বিবেকের নীরবতা - তৃতীয় পর্বএকজন যোগ্য রাষ্ট্রপতির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো প্রশ্নাতীত সততা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, কর্মজীবন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস এমন হওয়া উচিত, যা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, একজন রাষ্ট্রপতির মধ্যে থাকতে হবে নৈতিক সাহস। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আসে, যখন নীরব থাকা সহজ, কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কঠিন। একজন রাষ্ট্রপতির মর্যাদা তখনই প্রকাশ পায়, যখন তিনি সুবিধার চেয়ে নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
তৃতীয়ত, তাকে হতে হবে সংবিধানের রক্ষক। সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়, কিন্তু রাষ্ট্র এবং সংবিধান স্থায়ী। একজন রাষ্ট্রপতির আনুগত্য কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি হওয়া উচিত।
Advertisement
চতুর্থত, তার মধ্যে থাকতে হবে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। একজন মানুষের ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসার পর তাকে সকল নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হতে হবে।
পঞ্চমত, তাকে হতে হবে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন একজন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন, যার উপস্থিতি মানুষকে বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে তার নেতৃত্বের ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। একজন মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন।
সপ্তমত, তাকে হতে হবে দূরদর্শী। একজন রাষ্ট্রপতি শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখবেন না, তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাংলাদেশের কথাও ভাববেন।
অষ্টমত, তার মধ্যে থাকতে হবে মানবিকতা। দুর্যোগ, সংকট বা জাতীয় দুর্ভোগের সময় জনগণ যেন তার মধ্যে একজন আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান নয়, একজন সহানুভূতিশীল অভিভাবককে দেখতে পায়।
এই মানদণ্ডে যখন বিভিন্ন সম্ভাব্য নাম আলোচনায় আসে, তখন প্রত্যেককে বিচার করা উচিত একই প্রশ্নের ভিত্তিতে: তিনি কি বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম?
এই আলোচনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তার নাম নিয়ে যেমন ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন সমালোচনা ও বিতর্ক। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এটি স্বাভাবিক। কোনো বড় ব্যক্তিত্বই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন।তবে একজন নাগরিক হিসেবে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দেশের নামকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ পরিচিতি দিয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করেননি, বরং বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
তার ক্ষুদ্রঋণ ধারণা এবং সামাজিক ব্যবসার দর্শন বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন চিন্তায় নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তার কাজ নিয়ে বিভিন্ন মত থাকতে পারে, সমালোচনাও থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা বা সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই দেশের প্রতি আস্থা ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের জন্যও এমন একটি সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল, বিশ্বের সামনে দেশটির স্থিতিশীলতা, সম্ভাবনা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরা। এই ক্ষেত্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক পরিচিতি, বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আধুনিক বিশ্বে একটি দেশের শক্তি শুধু অর্থনীতি, জনসংখ্যা বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও। যে দেশের নেতৃত্বকে বিশ্বস্ত মনে করা হয়, সেই দেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জ্ঞান বিনিময় এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পায়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ড. ইউনূসের একটি বড় মেরিট হলো, তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে একটি ইতিবাচক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশ শুধু একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; বাংলাদেশ উদ্ভাবন, সামাজিক উদ্যোগ এবং মানবিক চিন্তার ক্ষেত্রেও বিশ্বে অবদান রাখতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক পরিচিতি যথেষ্ট নয়। একজন রাষ্ট্রপতিকে একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে, সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং সব শ্রেণির মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।
এই প্রশ্ন শুধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি সম্ভাব্য প্রার্থীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ রাষ্ট্রপতি কোনো পুরস্কার নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পদও নয়। এটি একটি জাতির আস্থার প্রতীক।
আমার ব্যক্তিগত মতামত খুব পরিষ্কার। আমি কোনো ব্যক্তি বা কোনো দলের রাষ্ট্রপতি দেখতে চাই না। আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেখতে চাই। আমি এমন একজন মানুষকে দেখতে চাই, যার কাছে ক্ষমতার চেয়ে সংবিধান বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়, ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ বড়। আমি এমন একজন রাষ্ট্রপতি দেখতে চাই, যিনি সরকারের প্রতিনিধি নন, বিরোধী দলের প্রতিপক্ষও নন, বরং বাংলাদেশের সকল মানুষের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।
যার নাম শুনলে মানুষ প্রথমে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় মনে করবে না, বরং মনে করবে সততা, প্রজ্ঞা, মর্যাদা এবং আস্থার কথা। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ তৈরি করার। এমন একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা দেখাতে পারি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়, এটি জনগণের বিশ্বাসের জন্য।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখবে না কে কোন দলের সমর্থন পেয়েছিলেন। ইতিহাস মনে রাখবে, কে রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন, কে বিভাজনের সময় ঐক্যের কথা বলেছিলেন, কে ক্ষমতার কাছে নয়, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন।কারণ একজন রাষ্ট্রপতির প্রকৃত শক্তি তার হাতে থাকা ক্ষমতায় নয়, তার চরিত্রে। তার পদে নয়, তার নৈতিক উচ্চতায়।
আর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি শুধু রাষ্ট্রপতি হবেন না, তিনি হবেন বাংলাদেশের বিবেকের প্রতীক। আমি কোনো ব্যক্তি বা দলের রাষ্ট্রপতি চাই না; আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি চাই।
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখকসাবেক পরিচালক, ফাইজার সুইডেন
এমআরএম