চন্দন চৌধুরী
Advertisement
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সুবিশাল পলিমাটিতে এমন কিছু কবির পলি পড়ে, যাঁদের কাব্যভাষা প্রথাগত ছক কিংবা আটপৌরে ভাবনার প্রাচীর ভেঙে এক স্বতন্ত্র অবয়ব গড়ে তোলে। কবি মামুন রশীদ সেই ধারারই এক অনন্য শব্দশিল্পী। তার কবিতা এক জটিল অনুভবের গভীর গোলকধাঁধা, যেখানে পাঠককে পরম তৃষ্ণা ও নৈশব্দ্য নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। তার কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন দৃশ্যকল্প, গভীর প্রতীক এবং স্মৃতির স্তরবিন্যাসে নির্মিত এক অন্তর্জাগতিক ভুবন।
এই কবিমনস্কতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে শুরুতেই যে সত্যটি উন্মোচিত হয়—প্রেম এক মহাজাগতিক অভিজ্ঞতা, যা মানুষের অস্তিত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে স্মৃতি, বিচ্ছেদ, ভাষা, ইতিহাস, মৃত্যু, সময় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট তার কাব্যে বারবার ফিরে আসা মূল সুর বা মোটিফ হিসেবে আবির্ভুত। ফলে এই কবিতাগুলো পাঠককে শাশ্বত এক ভাবনার জগতে পৌঁছে দেয়, নিজের ভেতরে মুখ ফিরিয়ে তাকানোর এক গভীর পথ তৈরি করে।
মামুন রশীদের কবিতারীতি পাঠ করলে প্রতীয়মান হয়, তিনি বাহ্যিক দৃশ্যের চেয়ে অগোচর অনুভূতিকে বহুগুণ বেশি মূল্য দেন। তার কবিতার গঠনশৈলীতে বাক্যের ধরন কখনো ভাঙা, কখনো আপাতদৃষ্টে অসম্পূর্ণ কিংবা বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, সেই বিচ্ছিন্নতার অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে অর্থের এক বহুমাত্রিক ফল্গুধারা। আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যে অনন্য নির্যাস—প্রতীকী ভাষা, বহুমাত্রিকতা, আন্তঃপাঠিকতা, সময়ের রৈখিকতা ভাঙন এবং বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তবের নিপুণ বুনন—তার এক সার্থক ও সুনিপুণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার কাব্যে।
Advertisement
মামুন রশীদের কাব্যে প্রেম মেকি আবেগ কিংবা চটুল অনুরাগ ছাড়িয়ে তা সৃষ্টি এবং মানবীয় অস্তিত্বের এক আদিম মৌলিক শক্তি। ‘বিভ্রম’-এ কবি যখন লেখেন, ‘পুরো জগৎটাই প্রেমের ফাঁদপাতা ভুবন’; তখন এক অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরি হয়। এই একটি পঙ্ক্তি যেন সমগ্র কাব্যের কেন্দ্রগত দর্শনকে বুকে ধারণ করে। পৃথিবীকে অনুধাবন করার এবং মহাজাগতিক অন্ধকারকে সহ্য করার একমাত্র মাধ্যম যেন এই প্রেম। কিন্তু কবির প্রেমের ক্যানভাসের গহীনে লেপ্টে আছে গভীর বিভ্রম, অনিশ্চয়তা ও তীব্র বেদনাবোধ। কবিতাটিতে কাঠঠোকরা, বৃক্ষ, উড়ন্ত বেলুন, দূরবর্তী চাঁদ এবং ঐতিহাসিক চরিত্র ‘জুলেখা’—সবকিছু এসে মেশে একই প্রতীকের গভীর মোহনায়। কবি একটি দৃশ্য তৈরি করেন, কিন্তু পাঠককে তার ধরাবাঁধা কোনো অর্থ বলে দেন না। এই অর্থহীনতা বা ব্যাখ্যাহীনতাই মূলত আধুনিক কবিতার মূল শক্তি, যা পাঠককে নিজের মতো করে অর্থ অনুধাবনের স্বাধীনতা দেয়।
বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে যখন তিনি লেখেন, ‘মধ্যরাতে কানখাড়া করে জানালার গ্রিল থেকে দূরের চাঁদটার দিকে তাকালে...’; এখানে দূর জানালার চাঁদ হয়ে ওঠে মানুষের অবচেতন স্মৃতি, দূরবর্তী ব্যাকুলতা এবং এক অসীম আকাঙ্ক্ষার চিহ্ন। পাশাপাশি ‘জুলেখার সখীরা’র আগমন ঘটে কোরআন ও বাইবেলে বর্ণিত উপাখ্যানের সেতু ধরে, যা কবিতাটিকে একটি গভীর আন্তঃপাঠিক রূপ প্রদান করে। কবির লেখনীতে ঐতিহ্য বা ধর্মীয় ইতিহাস সরাসরি কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আবদ্ধ না থেকে তা এক শাশ্বত মানবিক অনুভূতির নতুন ব্যাকরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মামুন রশীদের ‘বর্ণমালা’ কবিতায় ভাষার যে উপস্থাপন, তা একান্তই নিজস্ব ও প্রথাভাঙা। ভাষা এখানে কবির চেতনায় বর্ণমালা নিজেই এক রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা। ‘বর্ণমালা, প্রেমে না অপ্রেমে তাকিয়েছিলাম, বুঝিনি।’ এই অনন্য সম্বোধনটি কবি ও বর্ণমালার সম্পর্কের গভীরতাকে স্পষ্ট করে তোলে। এখানে প্রতিটি হরফ বা অক্ষর যেন কবির পরম প্রেমিকা, মাতৃভূমি কিংবা স্বয়ং ইতিহাস।কবিতার পরবর্তী স্তরে কবি যখন লেখেন—‘রক্তাক্ত যে যাত্রার ভেতর দিয়ে তুমি চিরজাগরুক...’ তখন পাঠকের মনে অনায়াসে ভেসে ওঠে বাংলা ভাষার রক্তঝরা অতীত, বায়ান্নর আত্মত্যাগ এবং একটি জাতির পরিচয়ের সংগ্রাম। কিন্তু কবি কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের আশ্রয়ে যান না; অত্যন্ত নিপুণভাবে ভাষার ভেতরের যে নীরব কান্না ও পরম গৌরব—তাকে কাব্যিক আবেশে রূপান্তরিত করেন। ফলে বর্ণমালার প্রতি কবির ব্যক্তিগত আবেগ শেষ পর্যন্ত গোটা বাঙালি সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের এক অমলিন ইশতেহার হয়ে ওঠে।
একইভাবে, তার প্রায় প্রতিটি কবিতার কেন্দ্রবিন্দুজুড়ে বিরাজ করে স্মৃতির অদৃশ্য উপস্থিতি। ‘আমাকে তোমার মনে পড়ার কথা’ কবিতায় স্মৃতি বর্তমান সময়কে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ করা এক পরাক্রমশালী শক্তি। ‘স্মৃতিকে যতই দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে ফেলো...’ কবি এখানে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন স্মৃতির অবিনশ্বরতার কথা। মানুষ চাইলে নিজের বর্তমানকে বদলাতে পারে, কিন্তু স্মৃতির গহীন শিকড়কে কখনোই উপড়ে ফেলতে পারে না। সচেতনভাবে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও স্মৃতি নতুন কোনো বেশে, নতুন কোনো তীব্রতায় ফিরে আসে। এই কবিতায় ব্যবহৃত ‘পুকুরপাড়’ (যা শৈশব ও হারানো সময়ের ব্যাকুলতাকে নির্দেশ করে), ‘উড়ন্ত ফড়িং’ (ক্ষণস্থায়ী কিন্তু উজ্জ্বল স্মৃতিচিহ্ন) কিংবা ‘ভিজে তালু’ (স্পর্শকাতর অনুভূতির আর্দ্রতা)—এসব অনুভূতির গহীনে জমে থাকা এক একটি স্মৃতিতরঙ্গ।কবিতার একপর্যায়ে কবি আত্মজিজ্ঞাসার সুর চড়িয়ে প্রশ্ন করেন—‘এভাবে কি কেউ পালাতে পারে?’ এই হাহাকারভরা প্রশ্নটি সমগ্র মানবজাতিকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সভ্যতার যত আধুনিকতাই আসুক না কেন, মানুষ নিজের অতীত ও স্মৃতি থেকে কখনো পূর্ণ মুক্তি পেতে পারে না।
Advertisement
‘বৃষ্টি’ কবিতাটি আধুনিক পরাবাস্তববাদী কাব্যরীতির এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। দৃশ্যকল্পের অস্বাভাবিকতা ও মেটাফোরের বুনন কবিতাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একটি সুটকেসের বন্দিদশা থেকে দুটো ফর্সা হাত বের হয়ে এসে বাতাসে সাদা কাগজ ছুড়ে দিচ্ছে, বাস্তব জগতের দৃষ্টিকোণ থেকে এ দৃশ্য অসম্ভব। কিন্তু আধুনিক কবিতার চরম সত্য নিহিত থাকে রূপকের গভীরে, অনুভূতির অবিকৃত সততায়। এখানে ‘সুটকেস’ হলো বয়ে চলা স্মৃতির ভার, ‘সাদা কাগজ’ অপূর্ণ জীবন ও অনুচ্চারিত কথা, ‘শকুন’ অবক্ষয় ও অন্তরের ধ্বংসস্তূপ এবং ‘বজ্রবিদ্যুৎ’ আকস্মিক আত্মোপলব্ধির প্রতীক। কবির এই রূপকগুলো মানবমনের গহীনে জমতে থাকা ভাঙন ও মানসিক অস্থিরতার প্রতীক। বৃষ্টি এখানে কখনো সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে দেওয়ার এক মাধ্যম, আবার কখনো ধ্বংস ও নতুন জাগরণের এক পরম পরাবাস্তব রূপক।
অন্যদিকে, ‘তুমি’ কবিতাটি আকারে বেশ সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভাবগত গভীরতা অতলস্পর্শী। কবিতার সূচনাতেই কবি এক মোহাচ্ছন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন: ‘শব্দেরও এমন নির্জনতা থাকে?’ বাংলা আধুনিক কবিতার ধারায় এই প্রশ্নটি নির্জনতা ও কাব্যিক স্তব্ধতার এক পরম সুন্দর অনুভূতির বিস্তার ঘটায়। এখানে ‘তুমি’ হলো আলো, শান্তি কিংবা পরম আশার এক বিমূর্ত চিহ্ন। সমুদ্রের তলদেশ থেকে শামুকের জেগে ওঠা কিংবা অন্ধকারের কোলঘেঁষে আলোর সন্ধান করা—এসব রূপকের মাধ্যমে কবি মানুষের ভেতরের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে কবির ব্যাকুল প্রার্থনা, ‘নির্জনতা ভর না করে।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের চরম সত্য। মানুষ আসলে জীবনের ভয়াবহ একাকিত্ব থেকে বাঁচতেই ভালোবাসার আশ্রয়ে ছুটতে চায়।
‘মুক্ত’ কবিতাটি একাধারে রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ, অন্যদিকে গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শনে উদ্বেলিত। আধুনিক সভ্যতায় মানুষ আসলে কতটুকু মুক্ত—সেই প্রশ্নকেই কবি এখানে প্রধান করে তুলেছেন। ‘পাখি বলতেই মুক্ত... এ নিয়ম খাটে না, জন্ম যার খাঁচায়।’ এই দুটো পঙ্ক্তির চরণে কবি এক নিষ্ঠুর সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। আমরা জন্মসূত্রেই যে মানসিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক অবকাঠামোর ভেতরে বড় হই, সেই অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করে ফেলে। খাঁচায় জন্মানো পাখি যেমন উড়তে ভুলে যায় এবং খাঁচাকেই নিজের পরম পৃথিবী ভেবে নেয়, তেমনি মানুষও তার রাষ্ট্রীয় শাসন, পারিবারিক দেওয়াল বা নিজস্ব অভ্যস্ত জীবনযাত্রাকেই ‘স্বাধীনতা’ বলে ভুল করে।
আরও পড়ুন উদয় রহমানের গল্প: অতিলৌকিকতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্বঅন্যতম সংবেদনশীল কবিতা ‘রাফখাতা’। অত্যন্ত করুণ ও আবেদনময় এক বাক্যে কবিতাটির সূচনা ঘটে: ‘আমি তোর রাফখাতা?’ এই একটিমাত্র জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে মানুষ তার অবহেলিত ও উপেক্ষিত অস্তিত্বের করুণ চিত্র তুলে ধরে। মানবসমাজে রাফখাতা কখনোই যত্ন করে তোলা থাকে না; সেখানে হিসাবের ভুলগুলো আঁকিবুঁকি করা হয়, কাটাকাটি হয়, প্রয়োজনের দিন শেষে সেটির আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। কবি নিজেকে যখন এই ‘রাফখাতা’র সাথে তুলনা করেন, তখন তা হয়ে ওঠে আধুনিক পুঁজিবাদী ও স্বার্থপর সমাজে প্রান্তিক মানুষের চরম অবমূল্যায়নের এক মরমী রূপক। যারা প্রতিনিয়ত অন্যের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু দিনশেষে কোনো স্বীকৃতি পায় না; তাদেরই সমবেত নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস এই কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে।
কবি মামুন রশীদ সমকালীন বাংলা কবিতায় এক গভীর ও নিবিষ্ট অন্বেষণকারী। প্রথাগত আবেগের জোয়ারে না ভেসে তিনি ভাষাকে শাণিত করেছেন, দৃশ্যকল্পকে করেছেন পরাবাস্তব এবং অনুভূতির গভীরে বুনে দিয়েছেন দার্শনিক জিজ্ঞাসা। তার কবিতার প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি, ভাষা কিংবা একাকিত্বের অনুভূতিগুলো পাঠককে তার নিজের ভেতরের নির্জন আয়নায় মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই গভীরতা, বহুমাত্রিকতা এবং নির্জন কাব্যভাষাই মামুন রশীদকে বর্তমান বাংলা কাব্যসাহিত্যের এক অনন্য ও অনিবার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২.মামুন রশীদের কবিতায় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবেশ করলে অনুধাবন করা যায়, কবির কাব্যজগৎ শুধু ব্যক্তিগত আবেগ কিংবা ক্ষণিক অনুভূতির বন্দিশালায় সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাবনার ক্যানভাসজুড়ে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে ইতিহাস, মানব সভ্যতা, নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক ক্ষমতার নিখুঁত কাঠামো এবং মানুষের অন্তর্জাগতিক স্বাধীনতার এক গভীর মৌলিক প্রশ্ন। তার কবিতায় বাস্তবতা কখনোই সরল রৈখিক উপায়ে বা সরাসরি উপস্থিত না হয়ে প্রতীক, সুনিপুণ রূপক, পরাবাস্তব চিত্রকল্প এবং পৌরাণিক সংকেতের সুক্ষ্ম বুননে নতুন এক কাব্যাভিপ্রায় তৈরি করে।
তার অন্যতম রূপকঘন ও ধারালো সৃষ্টি ‘চিড়িয়াখানা’। প্রথম পাঠে একে আপাতদৃষ্টিতে কোনো পরাবাস্তব কল্পকাহিনি মনে হলেও, গভীর পর্যবেক্ষণে উন্মোচিত হয় এটি মূলত আধুনিক মানব সভ্যতার ভণ্ডামি ও ক্ষমতার বিন্যাসের ওপর নির্মিত এক তীব্র ও শাণিত ব্যঙ্গচিত্র। বাস্তব জগতে মানুষ পশুকে খাঁচাবন্দি করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উন্মাদনায় মেতে ওঠে; কিন্তু কবি সুচতুরভাবে এই প্রচলিত ক্ষমতার সমীকরণকে উল্টে দিয়েছেন। ‘ধূর্ত শেয়াল রূপকথার গল্পের মতো বিভিন্ন খাঁচায় এক এক করে প্রদর্শন করে মানবসম্প্রদায়।’ এই অসাধারণ উল্টো দৃশ্যকল্পটি তথাকথিত সভ্য মানুষের জাত্যভিমান ও অহংকারকে সমূলে চূর্ণ করে দেয়। মানুষ নিজেকে পৃথিবীর রাজাধিরাজ মনে করলেও, মূল প্রকৃতির কাছে তার এই ঔদ্ধত্য কতটা তুচ্ছ; কবি সেই কঠিন সততায় আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করান। একই সঙ্গে যখন পঙ্ক্তিতে উঠে আসে: ‘পাঁচ মুদ্রার বিনিময়ে দর্শনার্থী...’ তখন এই প্রদর্শনীর অন্তরালে উন্মোচিত হয় আধুনিক পুঁজিবাদ ও গ্রাসকারী ভোগবাদের কদর্য রূপ। যেখানে মানবতা, অস্তিত্ব ও প্রেম... সবকিছুকেই অর্থনীতি মাত্র কয়েটি মুদ্রার বিনিময়ে বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। কবিতার শেষপ্রান্তে কবি যখন লেখেন, ‘উদ্বোধনী দিনে বিশেষ সুযোগে ফ্রি দর্শক ছিলাম আমি’, তখন সেই ‘আমি’ আর কবির একক অবয়বে আটকে থাকেন না। পাঠক নিজেও আত্মবিস্মৃত হয়ে সেই নির্মম চিড়িয়াখানার নির্জন খাঁচার সামনে এক নিঃশব্দ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত হন।
অন্যদিকে, ‘চিড়িয়াখানা ও মুনতাকা হকের কবিতা’ রচনাটি আধুনিক বাংলা কবিতার পরাবাস্তব ধারার অনবদ্য সংযোজন। এখানে কল্পনা ও নির্দয় বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাত স্পষ্ট। কবিতার সূচনায় বাঘটি কাগজের তৈরি অবয়ব মনে হলেও, ক্রমেই তা রক্তমাংসের সত্যিকারের হিংস্রতায় রূপ নেয়। অথচ শৈশবের নিষ্পাপ চোখ দিয়ে দেখলে সেই ভয়ংকর বাঘটিকেই খেলনার মতো নিরীহ ও স্পর্শযোগ্য বলে বোধ হয়। কবি মানুষের ভেতরের এই দ্বৈত মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশুর নিষ্পাপ বিশ্বাস এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রূঢ় বাস্তবতাবোধ ও ভয়—এই দুটি বিপরীত অনুভূতির পাশাপাশি অবস্থান প্রমাণ করে যে, সত্য কখনো স্থির বা একমুখী হতে পারে না। বাস্তবতা মূলত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয় এবং শৈশবের অলৌকিক স্বপ্নময়তা আর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের কঠোর সত্য একই পৃথিবীর আলো-ছায়ায় পর পর দাঁড়িয়ে থাকে। এই ব্যক্তিগত অনুভূতি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গণ্ডি পেরিয়ে কবি যখন ইতিহাস ও ভূগোলের সীমানায় পা রাখেন, তখন তার চেতনা হয়ে ওঠে বৈশ্বিক।
মামুন রশীদের কবিতায় ইতিহাস এক প্রবাহমান বেদনাবোধ। ‘বামিয়ানের প্রবহমান শিলাগুলি ভেঙে...’ বামিয়ানের শত বছরের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের যে চরম বর্বরতা, কবি তাকে শুধু অতীতের এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেননি। সেই একই কাব্যিক ক্যানভাসে তিনি পাশাপাশি তুলে এনেছেন সুদূর ফিলিস্তিনের নির্যাতিত তরুণী এবং লোকপুরাণের শীলাদেবীর বিষাদময় আত্মহত্যার স্মৃতি। আপাতদৃষ্টে এই ভৌগোলিক চিত্রগুলোর মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ সূত্র না থাকলেও, কবি দেখিয়েছেন যে পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও আর্তনাদ অন্য প্রান্তের সংবেদনশীল মানুষের অন্তরে সমানভাবে প্রতিধ্বনি তৈরি করে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই; ইতিহাস হয়ে উঠেছে সমগ্র মানবজাতির যৌথ ও বৈশ্বিক স্মৃতির এক অবিনশ্বর অংশ।
কবির ভাবনায় রূপকের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় স্মৃতির ভূগোল। ‘২৩.০৮.২০১৩’ কবিতায় পুরীর বিশাল সমুদ্র শুধু একটি ভৌগোলিক জলাশয় বা পর্যটনকেন্দ্র নয়। ‘পুরীর সমুদ্র দেখিনি, দেখেছো তুমি...’ কবি নিজে চোখের সামনে সেই জলরাশি প্রত্যক্ষ না করলেও, পরম প্রিয়জনের অনুভূতির আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে সেই অদেখা সমুদ্র তার নিজস্ব অন্তর্জগতে স্থান করে নিয়েছে। এখানে ভালোবাসার এক গভীর ক্ষমতা প্রকট হয়ে ওঠে; প্রেম কীভাবে এক অচেনা স্থানকে পরম আপন ও জীবন্ত করে তোলে। পরবর্তীতে কবি যখন রূপক সাজিয়ে বলেন, ‘বুকের মধ্যে বয়ে চলা যে সর্বশক্তিমান সমুদ্র’, তখন তিনি স্পষ্ট করে দেন যে বাইরের দৃশ্যমান অসীম সমুদ্রের চেয়েও মানুষের হৃদয়ে বহমান অনুভূতির সমুদ্র বহুগুণে বিশাল ও গভীর। এই কাব্যভাষায় রবীন্দ্র চেতনার অন্তর্জাগতিক বিস্তার কিংবা জীবনানন্দের নিঃসঙ্গ স্মৃতিলোকের ছায়া থাকলেও, মামুন রশীদের পরিবেশনভঙ্গি ও শব্দচয়ন একেবারেই নিজস্ব ও সতেজ।
স্মৃতি ও বিচ্ছেদের কাব্যিক ভাবনায় কবি প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন ‘২৭.০৮.২০১৩’ কবিতায়। যেখানে কবি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডোডোপাখির মহাজাগতিক রূপককে উপস্থাপন করেন। ‘হারিয়ে যাওয়া ডোডোপাখির জন্য ইতিহাসের পাঠশালা থাকলেও পুরনো প্রেমিকার জন্য নেই...’ এটি মানব সভ্যতার এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ওপর আঘাত। আধুনিক বিজ্ঞান ও ইতিহাস পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতিকে যত্ন করে সংরক্ষণ করে, নথিবদ্ধ করে; কিন্তু যে মানুষটি হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে একদিন কাছে এসেছিল, সেই প্রেম বা সম্পর্ক হারিয়ে গেলে তা ধরে রাখার কোনো সামাজিক বা ঐতিহাসিক পাঠশালা থাকে না। এই ক্ষুরধার তুলনার ভেতরে লুকানো রয়েছে অব্যক্ত হাহাকার ও নিখাদ বেদনাবোধ।
ভালোবাসাকে তিনি কখনো কোনো সংকীর্ণ সামাজিক বা আইনি ফ্রেমে আটকে রাখেননি। ‘২২.০৭.২০১৩’ কবিতায় জীবনের জটিল সমীকরণগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লেখেন, ‘স্ত্রী, পরস্ত্রী, প্রেমিকা অথবা প্রবাসিনী বউ’। বাহ্যিক সম্পর্কের নাম বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, মানুষের হৃদয়ে প্রবাহিত প্রেমের ব্যাকুলতা ও পরম আকাঙ্ক্ষার সমুদ্রটি একই। প্রেম এখানে মানুষের অস্তিত্বের এক চিরন্তন ও মৌলিক অভিজ্ঞতা, যা স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি লাভ করে।
সময়ের ক্ষয়িষ্ণুতার সাথে স্মৃতির আত্মিক সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর ও দার্শনিক রূপ দেখা যায় ‘সমুদ্র রাখে না কিছুই’ কবিতায়। কবিতার প্রারম্ভেই কবি আমাদের চেনা ধারণাকে ধাক্কা দিয়ে লেখেন: ‘সমুদ্র রাখে না কোন স্মৃতি...’ প্রথম পাঠে মনে হয় সমুদ্র বুঝি চিরকালের স্মৃতিহীন এক মহাশূন্যতা। কিন্তু পরক্ষণেই কবি দর্শনের দুয়ার উন্মুক্ত করে যুক্ত করেন, ‘হাজারো ফটোগ্রাফ গেঁথে দেয় মানুষের বুকে’। সময় বা প্রকৃতিরূপী সমুদ্র নিজে কোনো স্মৃতি জমিয়ে রাখে না; স্মৃতি আসলে ধারণ করে মানুষের জাগ্রত হৃদয়। সময় অতিবাহিত হয় নিঃশব্দে, কিন্তু মানুষই সময়ের বুক চিরে অনুভূতির আলোকচিত্র তৈরি করে।
এই শাশ্বত দার্শনিক স্মৃতির পাশাপাশি ‘একটু একটু করে’ কবিতায় ফুটে উঠেছে অত্যন্ত সহজিয়া ভাষায় মানুষের চিরন্তন ও কোমল এক মৌলিক স্পন্দন—স্মরণীয় হওয়ার আকুলতা। কবি কোনো সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ বা ইতিহাসের মহৎ খ্যাতি চান না; সাধারণ দৈনন্দিনতার ভেতর বাঁচতে চান। চায়ের কাপের ধোঁয়া ওঠা উত্তাপ, অলস আড্ডা, পুরোনো দিনের অমলিন আলো-ছায়া... এসব সাধারণ মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরেই মানুষ ভুলে যাওয়ার মহাকালীন নিয়মকে প্রতিরোধ করতে চায়। এই ভাবনারই বিস্তার ঘটেছে ‘কিছুই ফেলনা নয়’ কবিতায়। কবি স্মৃতির এক অপূর্ব জাদুকরী প্রত্নতত্ত্ব উন্মোচন করেছেন—‘স্মৃতির মন্দিরে কিছুই ফেলনা নয়।’ শৈশবের রং-বেরঙের মার্বেল, সুতোয় বাঁধা লাটাই, আকাশে ওড়া ঘুড়ি কিংবা চঞ্চল ঘাসফড়িং... এদের কোনো আর্থিক মূল্য না থাকলেও অনুভূতির মন্দিরে এদের স্থান অমূল্য। বস্তু এখানে গৌণ, অনুভূতির সান্নিধ্যই মুখ্য। প্রতিটি মানুষই যেন তার চেতনার গহীনে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বহন করে চলেছে, যা তাকে উত্তর-আধুনিক কাব্যরীতির অত্যন্ত কাছাকাছি এনে দাঁড় করায়।
মামুন রশীদের সমগ্র কাব্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে তার ভাষার তিনটি প্রধান আত্মিক বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:প্রথমত, তার ভাষা এক অনন্য দৃশ্যনির্ভর ভাষা। তিনি পাঠককের জন্য ক্যানভাসে সুনির্দিষ্ট ছবি এঁকে দেন। পুকুরপাড়ের আর্দ্রতা, ঘাসফড়িংয়ের ডানার কাঁপন, শামুকের ধীরগতি, সমুদ্রের গর্জন, নিরিবিলি রেলস্টেশন, পলাশের লাল তীব্রতা কিংবা রাজহাঁসের সাঁতার কাটা... এসব দৃশ্যপট দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর কাব্যকলা।দ্বিতীয়ত, তার প্রতীকের বহুমাত্রিক ও বহুমুখী রূপায়ণ। তার কবিতায় একটি প্রতীক কখনো একটি মাত্র অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, ‘সমুদ্র’ একই সাথে অন্বেষণ করে গভীর প্রেম, বেদনার স্মৃতি, সময়ের প্রবাহ এবং অসীমতাকে। ‘পাখি’ যেমন একদিকে স্বাধীনতার সংকেত দেয়, তেমনি তা হারিয়ে যাওয়া অতীত কিংবা মানুষের মুক্ত আত্মার রূপক। আর ‘খাঁচা’ শুধু লোহার তৈরি কোনো অবকাঠামো নয়; তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিপীড়ন, সামাজিক সংস্কারের প্রাচীর, মানুষের নশ্বর শরীর কিংবা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বন্দিত্বকে নির্দেশ করে।তৃতীয়ত, পরাবাস্তবতার সার্থক ও নিখুঁত প্রয়োগ। বাস্তব দৃশ্যপটের আড়ালে অসম্ভব ঘটনাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তিনি হাজির করেন। সুটকেসের বন্দিদশা থেকে আকস্মিক হাত বেরিয়ে আসা, বাঘের মানুষের ভাষায় কিংবা চিন্তায় সাড়া দেওয়া, কিংবা মানুষকে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের সামনে খাঁচায় প্রদর্শন করা... এসব আপাত-অবাস্তব দৃশ্য কাব্যের ভেতরের অনুভূতির পরম সত্যকে তীব্রতর করে তোলে।
মামুন রশীদের প্রতিটি পদচিহ্নে আঁকা রয়েছে ইতিহাস, মানব সভ্যতা, শাসন ক্ষমতা, পুঁজিবাদী ভোগবাদ, মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্মৃতির সুগভীর অস্তিত্বতত্ত্ব। তার প্রতীক ও মেটাফোরগুলো পাঠকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্রোতে মিশে গিয়ে গভীর ও বহুমাত্রিক অর্থের জন্ম দেয়। মানুষের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সংকট, হারিয়ে ফেলা সম্পর্ক, স্মৃতির অবিনশ্বরতা এবং আধুনিক সভ্যতার গভীর অন্তর্দহনকে একসাথে ধারণ করে তার কবিতা সমকালীন বাংলা সাহিত্যজগতে এক অনন্য ও শাশ্বত পাঠের আহ্বান জানিয়ে যায়।
চলবে...
আরও পড়ুন ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী / ‘সুফিসংগীত লোকায়ত সমাজ-সংস্কৃতির অনবদ্য দলিল’এসইউ