ঢাকার জাতীয় বৃক্ষমেলার ভেতরে একটি অংশে গ্রামের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি পাবেন। যেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ভুলে থাকবেন শহরের যানজট, কংক্রিট আর ধুলোর বিরক্তির কথা।
Advertisement
জাতীয় বৃক্ষ মেলা- ২০২৬ ঢাকার আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে এই ছোট্ট গ্রামের অবয়বে বনকুটির গড়েছেন রকিবুল আমিন। এ উদ্যোক্তা প্রকৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার এক নিরলস স্বপ্নবাজ।
আরও পড়ুন দীপ্ত লুচি কি টবে চাষ করা যায়? জানুন উপায়তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ-যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই তিনি প্রকৃতির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
গত মাসেই এ প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’ এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রকিবুল আমিন।
Advertisement
মেলায় কথা হয় এ উদ্যাক্তার সঙ্গে। কুষ্টিয়ার এক সবুজ পরিবেশে বেড়ে ওঠা রকিবুলের শৈশব কেটেছে গাছপালা আর ফুলের বাগানের মধ্যে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই নিজের বাড়ির আঙিনায় গোলাপসহ নানা ফুলের বাগান করেছিলেন। সেই বাগান দেখতে আশপাশের মানুষও আসতেন। গাছের সঙ্গে সম্পর্কটা তখন শখের ছিল, পরে তা হয়ে ওঠে জীবনের দর্শন।
২০০১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর যেন নতুন এক বাস্তবতা তাকে নাড়িয়ে দেয়। চারদিকে উঁচু ভবন, কংক্রিটের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক। গাছের সংখ্যা কমছে, খোলা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা মাটিতে খেলে না, পাতার গন্ধ চেনে না।
রকিবুল বলেন, বড় হয়ে দেখি শহরে মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। সবুজ বলে কিছু নেই। এই অভাবটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল। তখনই মনে হয়েছিল, মানুষের ঘরে যদি প্রকৃতির স্পর্শ ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরও কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে।
এসব চিন্তায় রকিবুল গড়ে তোলেন তার প্রতিষ্ঠান ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক ও ব্যক্তিগত বাড়িতে সবুজায়নের কাজ করছে। এরই মধ্যে শতাধিক ছোট-বড় ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তার প্রতিষ্ঠান।
Advertisement
রকিবুলের কাছে গাছ কেবল শোভাবর্ধনের উপকরণ নয়। তার কাছে এটি মানুষের সুস্থতারও অংশ। তিনি বলেন, সবুজটা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখার অভ্যাসও হারিয়ে ফেলছে। আমি চাই প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন অন্তত একবার গাছের সঙ্গে সময় কাটাক। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, মানুষের মনও ভালো রাখে। সবুজ দেখলে চোখের ক্লান্তি দূর হয়, মন শান্ত হয়।
এই ভাবনা থেকেই তিনি এখন ‘জিরো সয়েল’ ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তার মতে, কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা কিংবা অন্য কোনো উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এতে যেমন শহর সবুজ হবে, তেমনি তাপপ্রবাহ কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
রকিবুল এখন ‘গার্ডেন মিশন’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন। তার লক্ষ্য, নগর সবুজায়নকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। পাশাপাশি পলিথিনের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন জনপ্রিয় করতেও কাজ করতে চান।
তিনি বলেন, আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছের জন্য আলাদা করে খুঁজতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি অফিসে অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে।
অন্যদিকে মেলায় কথা হয়, রাকিবুলের বাগানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী ও মিরপুরের বাসিন্দা তানভীর আহমেদের সঙ্গেও। তিনি বলেন, ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এই জায়গায় এসে মনে হলো যেন নিমেষেই ঢাকা শহর ছেড়ে নিজের গ্রামের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছি। চারপাশের ধুলোবালি আর গাড়ির শব্দের মধ্যে এই সবুজ কোণটুকু সত্যি অসাধারণ লাগছে!
তিনি বলেন, গাছের পাতায় একটু হাত বোলাতেই মনটা শান্ত হয়ে গেলো। ইট-কাঠের শহরে আমাদের চোখ দুটো যে একটু সবুজের কত তৃষ্ণার্ত ছিল, এখানে না এলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। শহরের প্রতিটা ছাদ আর বারান্দা যদি এমন করে সাজানো যেত, তবে ঢাকাটা সত্যিই প্রাণ ফিরে পেত।এনএইচ/এমআরএম