অলোক আচার্য
Advertisement
রামায়ণ হিন্দুশাস্ত্রের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হলেও এই বিবেচনার বাইরে বিশ্লেষণ করলে রামায়ণ একটি বিশাল মহাকাব্য। ছন্দের পর ছন্দের গাঁথুনি দিয়ে রচিত হয়েছে ঐতিহাসিক প্রমাণপত্র। সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ধর্মীয় আবহে রামায়ণ পরবর্তী কাব্যচেতনার ধারক। প্রাচীন ভারতের প্রথম এবং আদি মহাকাব্য রামায়ণ। রামায়ণের পথ ধরেই পরে আরও মহাকাব্য রচিত হয়। সংস্কৃত ইতিহাসে রামায়ণের মতো এত ঐতিহাসিক এবং পূর্ণ রসের সাহিত্য খুব বেশি রচিত হয়নি। ফলে রামায়ণের সাহিত্যিক ওজনটা অনেক বেশি। সাহিত্যবোদ্ধা এবং ঐতিহাসিকদের সে রকমই মত। রামায়ণে প্রেম আছে, দায়িত্ববোধ আছে, স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান আর দ্বন্দ্ব আছে, আত্মত্যাগ আছে, জোর করে পাওয়ার প্রচেষ্টা আছে।
রামায়ণের মতো সাহিত্য খুঁজলে পরে আরও শতাধিক গ্রন্থ পাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে রামায়ণই এসব গ্রন্থের পথদ্রষ্টা। গ্রন্থটি ২৪ হাজার শ্লোক, ৭টি কাণ্ড ও ৫০০ সর্গে বিভক্ত। বিষ্ণুর অবতার শ্রী রামচন্দ্র এবং দেবী লক্ষ্মীর অবতার দেবী সীতাকে ঘিরে পুরো রামায়ণ আবর্তিত হলেও রামায়ণ হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, হিংসা-বিদ্বেষ, হিংস্রতা এবং সর্বোপরি একটি সামগ্রিক কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। যার অপরিসীম সাহিত্যমূল্য আছে।
এবার রামায়ণের সামগ্রিক চরিত্রগুলো একবার বিশ্লেষণ করা যাক। শ্রী রাম রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র। রঘু বংশের রাজা দশরথের বড় পুত্র রাম। তাঁরা চার ভাই; যথাক্রমে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন। রামের স্ত্রী সীতা যিনি মহারাজ জনকের কন্যা। কিষ্কিন্ধ্যার সেনাপতি হনুমান; যে রামের জন্যই জীবনের সমগ্র সময় কাটিয়েছেন। এ ছাড়া রামের বিপরীত চরিত্র হলো রাবণ। সেখানে রাবণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রিয় পুত্র ইন্দ্রজিৎ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আছে রাবণের ভাই বিভীষণ ও কুম্ভকর্ণ। রামায়ণের একেবারে শুরুতে ধর্মীয় আবহটুকু বাদ দিলে রামের পিতার দেওয়া কথা রাখতে বনে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন সন্তান হিসেবে বাবার প্রতি সন্তানের প্রথম কর্তব্যটুকুর এই আখ্যান ইতিহাসে বিরল। এই রামকে বনে পাঠানোর পেছনে যে ইতিহাস, সেটি খুব কমন। এটা শুধু রামায়ণেই নয়, ঐতিহাসিকভাবে বহু রাজপরিবারে এটাই হয়েছে।
Advertisement
রাজা দশরথের স্ত্রী কৌকেয়ীও চাননি রাম রাজা হোক। তিনি চেয়েছিলেন তার পেটের সন্তান ভরত রাজা হবেন। একটি ড্রামাটিক সিচুয়েশন তৈরি হয়েছিল; যেখানে দশরথ রাজা হিসেবে ছিলেন অসহায়। আর রামায়ণে মূল কাহিনি শুরু হয় সেই বন থেকে। এখানে মূল কাহিনির সূচনা করেন রাবণের অতি আদরের বোন শূর্পণখা। শূর্পণখার ঘটনাটি রোমান্টিসিজম হলেও এটি হিংসাত্মক। যদিও জোরপূর্বক কাউকে নিজের করার কাহিনি বা ঘটনা কেবল রামায়ণেই ঘটেনি, ইতিহাসে এর উদাহরণ বহু। শূর্পণখার নাক কাটার পরপরই রাবণের সাথে রামের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাবণ সীতার রূপে মুগ্ধ হয়ে যায় এবং সীতাকে অপহরণ করে বসে। এটিও ছিল জোরপূর্বক কাউকে নিজের করার ব্যর্থ প্রয়াস।
রাবণও ব্যর্থ হয়েছিল। রাম-সীতা ও বিপরীতে রাবণ এই ত্রিচরিত্রের সাথে ঘটনাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং রামায়ণের কাহিনি এখানেই গতি লাভ করে। পাঠক এই অংশ থেকে আরও বেশি রামায়ণের ভেতরে প্রবেশ করে। আমাদের গল্প বা সিনেমায় যেটা হয়। সেটা বাস্তবেই ঘটেছিল। রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে রাম বানর রাজ্য কিষ্কিন্ধ্যায় যায় এবং রাবণের লঙ্কায় পৌঁছায়। আমরা মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যকে মহাকাব্যের স্বীকৃতি দিই সেটির শুরু এখানেই। এখানেই রাবণের প্রিয় এবং অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ও বীর যার মধ্যে পিতার প্রতি শ্রদ্ধার কোনো কমতি ছিল না। সেই থেকে মেঘনাদের বীরত্ব গাঁথা তৈরি হয়েছে। অথচ মেঘনাদের সাথে রাম-লক্ষ্মণের যুদ্ধ রামায়ণেই খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। সেই অংশ নিয়েইে তৈরি হয়েছে মহাকাব্য। তাহলে পুরো রামায়ণ ঘিরে কতটি মহাকাব্য তৈরি হতে পারে, তা গবেষণার বিষয়।
শূর্পণখার রামের প্রতি যে আকর্ষণ ছিল, সেটি ছিল আসলে কামভাব। যা থেকে তৈরি হয় হিংসা এবং দ্বন্দ্ব। যা হয়েও ছিল। আর রাম-সীতার মধ্যে যে প্রেম ছিল, আস্থা ও বিশ্বাস ছিল; সেটি বস্তুত ব্যাখ্যার বাইরে। যে ভালোবাসার শক্তি অনন্ত, সেই ধরনের প্রেম। আমরা যা খুুঁজে পাই শেক্সপিয়রের রোমিও-জুলিয়েটে অথবা শরৎচন্দ্রের দেবদাস-পার্বতীর মাঝে। যেখানে শরীর ছিল গৌণ, মন ছিল মুখ্য। রাম-সীতার দুই পুত্র যথাক্রমে লব ও কুশও রামায়ণের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। যাঁরা তাঁদের মায়ের সাথে বাবার অর্থাৎ শ্রী রামচন্দ্রের মিলনে মুখ্য নিয়ামক ছিলেন। রামায়ণের একেকটি চরিত্র থেকে পরবর্তীতে আরও বহু চরিত্রের অনুরূপ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন উদয় রহমানের গল্প: অতিলৌকিকতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্বরামচন্দ্রের ভূমিকা যখন স্বামী; তখন তিনি মহা শক্তিধর রাবণকে পরাজিত করতে লঙ্কায় গেছেন। সাথে শুধু বানর সৈন্য নিয়ে। এই সাহস উপাখ্যান পরবর্তীতে বহু রাজার গল্পে আমরা পাই। বিজয়ের কথাও জানি। রামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের পর যখন সীতার সাথে মিলন ঘটে; তখন প্রজাদের সীতার সতিত্বের প্রতি অনাস্থা দূর করতে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। এরপর ফের মিলন। তারপর বিচ্ছেদ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে গভীর রাগ-অনুরাগ বিরাজিত ছিল, বিভিন্ন সময় তাই প্রস্ফূটিত হয়েছিল শব্দ আকারে। সীতাকে না পাওয়ার হাহাকার পরবর্তীতে দেবদাসের বুকের শব্দ বা রোমিওর প্রেম বেদনা। রামায়ণ তাই কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থই নয় বরং এটি একটি সম্পূর্ণ সাহিত্য।
Advertisement
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।
এসইউ